জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রাখাইন যুদ্ধ: বাংলাদেশের অর্থনীতির নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ হচ্ছে

লেখা:
লেখা:
মো. হিমেল রহমান

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে চলমান যুদ্ধের আঁচ বাংলাদেশের গায়ে কতটা লাগছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা। প্রথমত, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আরাকান আর্মির বাংলাদেশি-বংশোদ্ভূত তিন সদস্যকে মুদ্রা পাচারের সময় আটক করে। দ্বিতীয়ত, এর কয়েকদিন আগেই নাফ নদীতে অবস্থিত শাহ পরীর দ্বীপের কাছ থেকে পাঁচজন বাংলাদেশিকে অপহরণ করে আরাকান আর্মি।

এ দুটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাখাইন যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক অপরাধের সামান্য উদাহরণ মাত্র। মুদ্রা পাচার এবং মুক্তিপণের জন্য অপহরণের মতো ঘটনাগুলো নিয়মিত ঘটছে। আর তা প্রমাণ করে, মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা নিয়ে এখনো যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না।

সীমান্তের নতুন বাস্তবতা

মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর থেকেই রাখাইন প্রদেশে সশস্ত্র সংঘাত দেখা যায়। তবে এর বর্তমান পর্যায়টি শুরু হয় ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর। আরাকান আর্মি আরও দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে ‘অপারেশন ১০২৭’ শুরু করার পর থেকে এই সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা রাখাইন প্রদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ভূখণ্ড এবং চিন প্রদেশের পালেতওয়া টাউনশিপ দখল করে নেয়, যার মধ্যে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পুরো ২৭১ কিলোমিটার এলাকাই অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বর্তমানে আরাকান আর্মি ও তার রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অফ আরাকান (ইউএলএ) কার্যত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে এক নতুন প্রতিবেশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একইসঙ্গে তারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্যের ওপর প্রায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যে ধস

রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ঢাকা ও নাইপিদোর মধ্যবর্তী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধ্বস নেমেছে। আরাকান আর্মি নাফ নদীতে নৌযান চলাচলের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এছাড়া, মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশে আসা পণ্যবাহী জাহাজ আটক করে তারা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত কর চাপাচ্ছে।

পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ২০২৩ সালের নভেম্বরের আগে টেকনাফ স্থলবন্দরে মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০টি পণ্যবাহী জাহাজ আসতো। কিন্তু আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দখল করার পর থেকে এখন সেখানে মাসে মাত্র তিন থেকে পাঁচটি জাহাজ আসে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে প্রায় ১৫.৫ বিলিয়ন টাকার পণ্য আমদানি করেছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৬২ শতাংশ কমে মাত্র ৮ বিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে। একইভাবে, মিয়ানমারে বাংলাদেশের রপ্তানিও ৭৬ শতাংশ কমে গেছে। বাণিজ্য কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে বলে জানা যায়, এবং এই ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

বিষয়টি শুধু রাজস্ব হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ তার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মিয়ানমারের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। চাল, হিমায়িত মাছ, আদা, রসুন, পিঁয়াজ, নারিকেলের মতো অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সেখান থেকে আমদানি করা হয়।

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ হয়েও বাংলাদেশকে প্রতি বছর খাদ্য ঘাটতি মেটাতে চাল আমদানি করতে হয়, যার একটি বড় অংশ আসত মিয়ানমার থেকে। রাখাইন যুদ্ধ এই নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করেছে।

ছায়া অর্থনীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার

আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য কমে যাওয়ার শূন্যস্থান পূরণ করছে অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে রয়েছে কালোবাজারি, মাদক ও মানব পাচার এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধ।

মিয়ানমার সশস্ত্রবাহিনী আরাকান আর্মিকে দুর্বল করতে ‘ফোর কাটস’ কৌশল নিয়েছে, অর্থাৎ তাদের খাদ্য, অর্থ, তথ্য ও সদস্য সংগ্রহের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। এর ফলে আরাকান আর্মি এখন খাদ্য, সিমেন্ট, সার, তেল ও ঔষধের মতো জরুরি পণ্য বাংলাদেশের কালোবাজার থেকে সংগ্রহ করছে। বিপুল পরিমাণ পণ্য প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশ সরকার বিপুল অঙ্কের শুল্ক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, রাখাইন থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে মাদকের ভয়ঙ্কর স্রোত। ইয়াবা ও হেরোইনের মতো মাদক পাচারে আরাকান আর্মির জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এই মাদকের প্রায় ৮০ শতাংশই উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং দরিদ্র রোহিঙ্গাদের এর বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সম্প্রতি কক্সবাজারে বিজিবি প্রায় ১০ লক্ষ ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে, যা এই সঙ্কটের গভীরতাকে তুলে ধরে।

এই মাদকের কারণে দেশের প্রায় ৮৩ লক্ষ মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েছে, যা দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন ও সহিংস অপরাধ বাড়াচ্ছে। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্র ও পরিবারগুলোকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। শুধু মাদক পাচারের কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮১ মিলিয়ন ডলার, এবং এর পরোক্ষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেশি।

শরণার্থীর বোঝা ও নিরাপত্তা সংকট

এর পাশাপাশি, রাখাইনের সংঘাতের কারণে নতুন করে প্রায় দেড় লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, যা আগে থেকে উপস্থিত ১৪ লক্ষ রোহিঙ্গার বোঝাকে আরও ভারী করেছে। আরাকান আর্মি টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাচারে সহায়তা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ, একটি মানবিক সঙ্কটকে ব্যবহার করে তারা লাভবান হচ্ছে, আর তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তার দায় বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

সবশেষে, নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে শত শত বাংলাদেশি জেলেকে তাদের নৌকাসহ অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে আরাকান আর্মি। এর মাধ্যমে তারা নদী ও সাগরকে একরকম ‘রাখাইন হ্রদে’ পরিণত করার চেষ্টা করছে। এটি কেবল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক অধিকারের ওপরই আঘাত নয়, বরং গরিব জেলে পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

রাখাইন যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, তেমনই সীমান্তের ওপারে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়েছে মাদক, মানব পাচার ও মুক্তিপণভিত্তিক এক ভয়ঙ্কর ছায়া অর্থনীতি।

এই যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের ওপর যে বিপুল অর্থনৈতিক বোঝা চাপছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো করা হয়নি। সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে এই সঙ্কট আরও গভীর হবে এবং বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুদিত)

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক।

সম্পর্কিত