ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলাদেশে একটা অদ্ভুত উত্তাপ তৈরি হয়। বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে তখন ঠোকাঠুকির শব্দ, কাঠমিস্ত্রির হাতুড়ি, রঙের গন্ধ আর নতুন বইয়ের সেই অপার্থিব সুবাস। অমর একুশে বইমেলা শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠা। কিন্তু এই পৃষ্ঠার ভেতরে আরেকটি পৃষ্ঠা আছে, যেটি কমই পড়া হয়। সেটি হলো অর্থনীতির পৃষ্ঠা।এবার বইমেলা শুরু হচ্ছে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে। চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত।
বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশে বই বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে বলে প্রকাশকরা জানাচ্ছেন। এই সংখ্যাটি শুধু একটি শিল্পের সংকট নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক সংকটেরও আভাস। একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২টি দেশের মধ্যে ৯৭তম। দেশে প্রকাশিত ৯৫ শতাংশ বইয়ের প্রথম মুদ্রণ ৩০০ কপি বা তারও কম, আর এর মধ্যে ৭০ শতাংশ বই সেই কপিও বিক্রি হয় না।
মেলার অর্থনীতির চাকা কীভাবে ঘোরে, সেটা একটু গভীরে গেলেই বোঝা যায়। একটি বই তৈরি হতে কতজনের হাত লাগে, সেটা অনেকে ভাবেন না। লেখক লেখেন, কম্পোজিটর টাইপ করেন, প্রচ্ছদশিল্পী রঙ মেশান, বানান সংশোধক প্রতিটি শব্দ যাচাই করেন, ছাপাখানার কারিগররা রাত জাগেন, বাঁধাইকারীরা প্রতিটি পাতা সেলাই করেন। তারপর সেই বই পরিবহন হয় মেলায়, স্টল তৈরি করেন মিস্ত্রিরা, সাজান শিল্পীরা, বিক্রি করেন তরুণ কর্মীরা। পুরো শৃঙ্খলটির প্রতিটি মণিতে মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। পুরান ঢাকার বাংলাবাজার থেকে কাঁটাবন, নীলক্ষেত থেকে আরামবাগ, মেলার দুই মাস আগে থেকেই এই পুরো এলাকা জেগে ওঠে এক বিশেষ গতিতে। ছাপাখানার শ্রমিকরা নিয়মিত বেতনের ওপর ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বাড়তি আয় করেন এই সময়ে।
২০২৪ সালের বইমেলায় ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। আগের বছর হয়েছিল ৪৭ কোটি। আরও আগে, ২০১৬ সালে, টার্গেট ছিল ৪৫ কোটি, বিক্রি হয়েছিল ৮০ কোটির বেশি। ২০২৩ সালের মেলায় এই সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে কোনো কোনো হিসাব বলছে। এই সংখ্যাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বইমেলা আসলে ছোট কোনো আয়োজন নয়। অনেকের কাছে এটি হয়তো উৎসব, কিন্তু অর্থনীতির হিসেবে এটি একটি বড় চালিকাশক্তি। এর সঙ্গে যোগ হয় বিজ্ঞাপনের কোটি কোটি টাকা, লেখকদের রয়্যালটি, প্রচ্ছদশিল্পীদের সম্মানী, স্টল নির্মাণের কারিগরদের মজুরি এবং মেলাঘিরে গড়ে ওঠা ছোট ছোট খাবারের দোকান থেকে শুরু করে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের দৈনন্দিন আয়।
তবে মনে রাখতে হবে, অমর একুশে বইমেলা শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়। এটি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাসজুড়ে মেলা এবং ২১ ফেব্রুয়ারিতে তার কেন্দ্রে পৌঁছানো, এই বিন্যাসটি শুধু ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ফসল নয়, এর পেছনে একটি জাতীয় আবেগ আছে। সেই আবেগ থেকে মেলাকে সরিয়ে নেওয়া মানে কি মেলার চরিত্রটিই বদলে দেওয়া? ২০২৬ সালে পহেলা ফেব্রুয়ারি মেলা না হওয়ায় একটি প্রতীকী বইমেলার আয়োজন হয়েছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত পাঠক তানিয়া আক্তার বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকে ১ ফেব্রুয়ারির জন্য অপেক্ষা করে থাকেন, এবার সেটা না হওয়ায় শূন্যতা অনুভব করেছেন। এই শূন্যতাটি পরিমাপ করা কঠিন, কিন্তু এর একটি সাংস্কৃতিক ওজন আছে যেটাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
প্রকাশকেরা জানাচ্ছেন, একটি ৩২ বাই ৮ ফুটের স্টলের ভাড়া বাংলা একাডেমিকে দিতে হয় প্রায় ৮৪ হাজার টাকা (এবছর স্টল ভাড়া মওকুফ করা হয়েছে)। স্টল সাজাতে খরচ হয় দুই থেকে তিন লাখ টাকা। বিক্রয়কর্মীদের মাসিক সম্মানী, খাওয়া, চা-নাস্তার খরচ মিলিয়ে একটি মাঝারি স্টল পরিচালনায় লাগে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা। এত বিনিয়োগের পরও যদি মেলায় ক্রেতা না আসেন, তাহলে সেই প্রকাশকের পুঁজি ফেরত আসে না। ঐতিহ্যের মতো বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান যেখানে ২৩০টির বেশি বই নিয়ে আসে এবং প্রতিটি বই ছাপতে গড়ে এক লাখ টাকার বেশি লাগে, সেখানে মোট বিনিয়োগের অঙ্ক কোটি ছাড়িয়ে যায়। সেই বিনিয়োগ যদি ক্রেতার অভাবে ডুবে যায়, তাহলে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে কীভাবে?
তাই প্রকাশকেরা সরকারি বই ক্রয় নীতিতে সংস্কার চাইছেন। প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি সরকারিভাবে কেনার ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বই কেনায় প্রণোদনা চাইছেন তাঁরা। উন্নত দেশে লাইব্রেরির জন্য সরকারিভাবে হাজার হাজার কপি বই কিনে লেখক ও প্রকাশকদের একটি স্থিতিশীল বাজার নিশ্চিত করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে প্রকাশনা খাত মোট আভ্যন্তরীণ আয়ের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ অবদান রাখে। এই খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা সাড়ে সাত লাখ। বাংলাদেশে সেই তুলনা টানা দুঃসাহসিক হবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক থেকে যায়।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, বইমেলার অর্থনীতি কখনোই সম ছিল না। বড় প্রকাশকের বিশাল প্যাভিলিয়ন আর ছোট প্রকাশকের সংকুচিত স্টলের মধ্যে যে বৈষম্য আছে, সেটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। নামী লেখকের বই বেস্টসেলার হয়, নতুন লেখক নিজের বই হাতে নিয়ে পথচারীদের থামাচ্ছেন আর কেউ ফিরেও তাকাচ্ছেন না। প্রচ্ছদশিল্পী থেকে বানান সংশোধক, সবক্ষেত্রে নামের ভিত্তিতে সম্মানীর ফারাক আকাশপাতাল।
এই সমস্যার কথা না বললে বইমেলার অর্থনীতির পূর্ণ ছবি তৈরি হয় না। বড় আর ছোট প্রকাশকের ফারাকটা নতুন কিছু নয়। বছর বছর একই চিত্র দেখা যায়। তবু এই সব সংকট ও বৈষম্যের মধ্যেও বইমেলা প্রতি বছর ফিরে আসে এবং মানুষ আসে। ২০২৪ সালে মেলায় দর্শনার্থী এসেছিলেন ৬০ লাখ। প্রত্যেক দর্শনার্থী গড়ে ১০০ টাকার বই কিনেছেন। সংখ্যাটা হয়তো বেশি মনে হবে না, কিন্তু ৬০ লাখ মানুষ একটি মাসে একটি জায়গায় বই কিনতে আসেন, এই ঘটনাটা নিজেই অনন্য। পৃথিবীতে বাংলাদেশের মতো পুরো একটি মাস ধরে বইমেলা চলে, এমন নজির আর কোথাও নেই।
বইমেলাকে কেন্দ্র করে কর্পোরেট স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপনের বাজার আরও প্রসারিত করার সুযোগ আছে। দেশের বড় বড় ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল কোম্পানিগুলো যদি বইমেলায় পৃষ্ঠপোষকতায় আসে এবং পাঠকদের জন্য বিশেষ ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাক সুবিধা দেয়, তাহলে ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে এবং বিজ্ঞাপন থেকে আলাদা একটি অর্থনৈতিক স্রোত তৈরি হবে।
বইমেলার অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে কিছু বাস্তব পদক্ষেপের কথা ভাবতেই হবে। মেলা প্রাঙ্গণের বাইরে ফুটপাতজুড়ে যে অস্থায়ী দোকানগুলো বসে, সেখানে বিক্রি হয় হরেক রকমের পণ্য, হাতের কাজ, মাটির জিনিস, ছোট খাবারের পসরা। এই বিক্রেতারা বইমেলার অর্থনীতির অংশ, যদিও তাদের হিসাব কোনো সরকারি নথিতে ওঠে না। তাদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা করা গেলে বইমেলার আশপাশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আরও সংগঠিত হবে। পুরান ঢাকার বাংলাবাজার আর নীলক্ষেতের ছাপাখানাগুলো বইমেলাকেন্দ্রিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড, কিন্তু বছরের বাকি দশ মাস এই প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকে। যদি সারা বছর ধরে সরকারি বই ক্রয়, স্কুল-কলেজের লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করার কার্যক্রম এবং প্রাতিষ্ঠানিক বই ক্রয়ের একটি নিয়মিত নীতি চালু করা যায়, তাহলে এই পুরো শিল্পটি বছরভর সচল থাকবে, শুধু ফেব্রুয়ারির জন্য অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে না।
মোবাইলের যুগে বইকে শুধু কাগজের মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ আর নেই। পাঠকের একটি বড় অংশ এখন ই-বুক আর পিডিএফে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম। এই অভ্যাসকে শত্রু না ভেবে সুযোগ হিসেবে দেখলে নতুন একটি রাজস্ব খাত তৈরি হতে পারে। বইমেলা উপলক্ষে একটি বিশেষ ডিজিটাল বই পোর্টাল চালু করা যেতে পারে যেখানে প্রকাশকরা তাদের বই নির্দিষ্ট মূল্যে অনলাইনে বিক্রি করবেন। এই পোর্টালে বিজ্ঞাপন স্থান বিক্রি করেও আলাদা রাজস্ব আসতে পারে। অ্যামাজনের কিন্ডেল বা অডেবলের মতো একটি দেশীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে লেখক, প্রকাশক এবং রাষ্ট্র, তিনটি পক্ষই লাভবান হবে। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাংলাদেশে এখন ১২ কোটির বেশি, এই বিশাল বাজারকে বইয়ের দিকে ফেরানোর কৌশল যদি ঠিকঠাক নেওয়া যায়, তাহলে বইমেলার অর্থনীতি শুধু একটি মাসের মধ্যে আটকে থাকবে না, সারা বছর ধরে প্রবাহমান থাকবে।
এর পাশাপাশি বইমেলাকে কেন্দ্র করে কর্পোরেট স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপনের বাজার আরও প্রসারিত করার সুযোগ আছে। দেশের বড় বড় ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল কোম্পানিগুলো যদি বইমেলায় পৃষ্ঠপোষকতায় আসে এবং পাঠকদের জন্য বিশেষ ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাক সুবিধা দেয়, তাহলে ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে এবং বিজ্ঞাপন থেকে আলাদা একটি অর্থনৈতিক স্রোত তৈরি হবে। শুধু দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন নয়, ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে লেখক পরিচিতিমূলক প্রচারণা চালিয়ে নতুন পাঠক তৈরির কাজটিও এখন অনেকটাই সাশ্রয়ী এবং কার্যকর। অন্যদিকে বইমেলাকে একটি পর্যটনমুখী অনুষ্ঠানে পরিণত করার সম্ভাবনা আছে। বিদেশি পাঠক ও প্রকাশকদের আনতে পারলে রপ্তানি আয়ের একটি নতুন দরজা খুলে যাবে। দেশের লেখকদের বই ইংরেজিতে অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর যে সুযোগ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে, বইমেলা সেই কাজের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
বইমেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। মেলার দৈর্ঘ্য কি একমাস রাখা জরুরি? ডিজিটাল বই ও অডিও বইয়ের দিকে কি এগোনোর সময় হয়নি? সারা দেশে জেলা শহরেও একযোগে বইমেলা হলে পাঠকের সংখ্যা বাড়বে কিনা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এককথায় দেওয়া যাবে না, তবে এগুলো নিয়ে আলোচনা না করলে বইমেলা কেবল একটি প্রথায় পরিণত হবে, প্রাণবন্ত উৎসবে নয়।
এখন সময় এসেছে একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়নের, যেখানে মহামারি, ধর্মীয় উৎসব বা অন্য যেকোনো জাতীয় পরিস্থিতিতে কীভাবে মেলার সময়সূচি নির্ধারণ হবে তার একটি স্বচ্ছ কাঠামো থাকবে। সেই কাঠামো তৈরি হতে হবে প্রকাশক, লেখক, পাঠক এবং সরকার, সব পক্ষকে একসঙ্গে বসিয়ে। একুশের চেতনা যদি আমাদের কিছু শিখিয়ে থাকে, সেটা হলো অধিকার আদায় হয় এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে, একে অপরকে ঠেলে সরিয়ে নয়।
- শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক