জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভোটে ব্যবধান গড়ে দেবেন তরুণেরা

স্ট্রিম গ্রাফিক

রাত পোহালেই ভোট। দীর্ঘদিন পর ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ হতে যাওয়া এ নির্বাচনের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ভোটারই তরুণ। তাঁরাই ব্যবধান গড়ে দেবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ জন্য প্রার্থীদের প্রচারণা থেকে শুরু করে ইশতেহার—সবখানেই তরুণদের টানার প্রবণতা দেখা গেছে। তাঁদের নিয়ে কর্মসূচিও ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর।

গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়। তবে এরও আগে থেকে তরুণ ভোটারদের সমর্থন টানতে কৌশলী প্রচার চালিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো।

দলগুলোর ইশতেহার ও প্রচারণায় তরুণদের কর্মসংস্থানে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দেশে-বিদেশে চাকরি, উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটানোর কথাও বলেছে দলগুলো। এমনকি, বেকারভাতা দেওয়ার মতো ‘চটকদার’ প্রতিশ্রুতিও আছে।

দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫। যুব নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বয়সীরা তরুণ। সে হিসাবে সাড়ে চার কোটির বেশি ভোটারের বয়স ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ।

আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে তিনটি নির্বাচনে কারচুপি, ভোট ডাকাতি, রাতে ভোট দেওয়াসহ নানা অভিযোগ ছিল। ভোটাররা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন, এমন আলোচনা ছিল। এসব নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কারণে তরুণ ভোটারদের অধিকাংশই নিজেদের প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন।

চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে ২০২৪ সালের জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। যা সেই সময় নাম পেয়েছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। পরে সেটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া এ অভ্যুত্থানের পরও চাকরির অনিশ্চয়তা যায়নি। তরুণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকেই মূল বিবেচ্য হিসেবে দেখছেন তাঁরা।

প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন এমন অন্তত ১০ তরুণের স্ট্রিম। তাঁদের সবারই চাওয়া প্রায় একই রকম—চাকরির বাজারে নিশ্চয়তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা।

গাজীপুরের মাওনা এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা মীর আল জুবায়ের (২৮) স্ট্রিমকে বলেন, ব্যবসা করতে গিয়ে যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন না হন, সেই নিশ্চয়তা চান তিনি।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শাহিনুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষার শতভাগ স্বচ্ছতা চাই। সবাই যেন তার যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পায়, সে দিকটি নিশ্চিত করতে হবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণ জনগোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে কাজ করবে না। বড় একটি অংশ তীব্র বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হওয়া নিয়ে হতাশ। ভোটের মাঠে তাদের উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে অনেক আসনের জয়-পরাজয়ের সমীকরণ।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি স্ট্রিমকে বলেন, তরুণদের ভোট অনেক। তবে এই ভোট একক কোন বাক্সে যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

রাজনৈতিক দলগুলো তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী কৌশল নিয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেকারত্ব দূরীকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণদের মন জয়ের চেষ্টা ছিল তাদের।

দলগুলোর ‘কৌশল’-প্রতিশ্রুতি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন ভোটার এবং জেন-জি প্রজন্মের সমর্থন আদায়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে।

যেমন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি জেলায় তরুণদের নিয়ে ‘ইয়ুথ পলিসি টক’ করেছেন। সেখানে তারেক রহমান সরাসরি তরুণদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বিএনপির তিনটি অঙ্গ সংগঠন—জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল যৌথভাবে তরুণদের জন্য মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরবর্তীতে তারা ‘তারুণ্যের ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার ও ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ আয়োজন করে।

এ ছাড়া বিএনপির ইশতেহার ও প্রচারণায় তরুণদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে বেকার ভাতা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ইন্টার্নশিপ ও পার্ট-টাইম চাকরি, উদ্যোক্তা তহবিল, ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে জোর এবং শিক্ষা ঋণের মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। ক্ষমতায় গিয়ে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং বিদেশে ৫ বছরে ১ কোটি জনশক্তি রপ্তানির কথাও বলেছে তারা।

জামায়াতে ইসলামীর তরুণদের টানতে ভোটের প্রচারণা শুরুর আগেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ছাত্র-যুব সমাবেশ করেছে। গেল বছরের ডিসেম্বরে জামায়াত বিজয় দিবস উপলক্ষে ‘ইয়ুথ ম্যারাথন’ আয়োজন করে। ইশতেহারে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি, স্টার্টআপ সহায়তা, ফ্রিল্যান্সারদের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত।

অন্যদিকে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের পুরোদস্তুর তরুণদের দল হিসেবে দাবি করছে। তাদের কর্মসূচিতে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ ও ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ স্লোগান দেখা গেছে।

এনসিপির ইশতেহারের নামই দিয়েছে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’। এতে ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা এবং ‘ইয়ুথ সিভিক কাউন্সিল’ গঠনের মতো প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ভোটের আগে তৃণমূলে ‘রাইজিং’ কর্মসূচি করেছে দলটি। ইশতেহারে এনসিপিও ৫ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘গ্রাজুয়েট টিচিং ফেলোশিপ’ চালু ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার কথা বলেছে দলটি।

যদিও রাজনৈতিক দলের এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ১৯৯১ সালের ভোটেও তরুণরা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। এখন তরুণরা ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতিতে যে আস্থা রাখতে তা কিন্তু নয়। কারণ তারা বুঝতে পারে যে এটি শুধু দেওয়ার জন্যই। প্রতিশ্রুতির চেয়ে তাই তারা দলগুলোর আচরণের দিকটি বেশি বিবেচনা করবে।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, তরুণদের উদ্দেশ্য করে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ক্ষমতায় গিয়ে রাজনৈতিক দল বাস্তবায়ন করে কি-না তা দেখার বিষয়, এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইশতেহারে তারা এসব পরিকল্পনা কিভাবে বাস্তবায়ন করবে সেই রাস্তাটা বলে দিলে ভালো হতো। এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবভিত্তিক, সেটাও চিন্তার বিষয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত