রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পলায়নের পর এই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ হিসেবে ৪টি মূল বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে ভোটাররা আগামীর বাংলাদেশ গড়বেন।
সবার মনে একটাই প্রশ্ন, ক্ষমতার চাবিকাঠি কার হাতে যাবে? ৩০০ আসনের সংসদে সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৫১টি আসন। যখন নির্বাচনে কোনো দলই এককভাবে এই সংখ্যা ছুঁতে পারে না, তখনই সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও জোটের সমীকরণ। নির্বাচনের এই টানটান উত্তেজনার মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ঝুলন্ত সংসদ আসলে কী, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণটা কী তবে?
প্রশ্ন: সরকার গড়তে কতটি আসন প্রয়োজন?
সংসদীয় গণতন্ত্রে সবকিছুই আসলে সংখ্যার খেলা। নির্বাচনে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে এবং সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গরিষ্ঠ অংশ যে দলের হয়ে কাজ করবে সেই দলই সরকার গঠনের অধিকার পাবে। আমাদের সংসদে মোট নির্বাচিত আসন ৩০০টি। নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো দলকে সরকার গঠন করতে হলে এই ৩০০ আসনের অর্ধেকের চেয়ে অন্তত একটি আসন বেশি পেতে হয়, একে বলা হয় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। অর্থাৎ কমপক্ষে ১৫১টি আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল একটি দল এককভাবে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পাবে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, কেবল বাংলাদেশ নয় সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকা বিশ্বের সব দেশেই এই একই নিয়ম। যুক্তরাজ্যে ৬৫০টি আসনের মধ্যে ৩২৬টিতে এবং ভারতের ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২টিতে জিতলেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি কোনো দলই এই কাঙ্ক্ষিত সংখ্যা স্পর্শ করতে না পারে? তখনই সৃষ্টি হয় এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, যাকে আমরা বলি ‘ঝুলন্ত সংসদ’।
প্রশ্ন: ঝুলন্ত সংসদ বা ‘হাং পার্লামেন্ট’ আসলে কী?
সাধারণ নির্বাচনের পর যখন দেখা যায়, কোনো একক দল বা জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি তখন সেই পরিস্থিতিকে ঝুলন্ত সংসদ (হাং পার্লামেন্ট) বলা হয়। এই অবস্থায় সংসদে কারও একক আধিপত্য থাকে না এবং ক্ষমতার ভারসাম্য দুলতে থাকে। তখন বড় দলগুলোকে বাধ্য হয়েই সরকার গঠনের জন্য অন্য ছোট দলের সমর্থন চাইতে হয়।
বিশ্ব জুড়ে এমন ঘটনার ভুরি ভুরি নজির আছে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে ২০১০ এবং ২০১৭ সালের নির্বাচনে সেখানে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে কনজারভেটিভ পার্টিকে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করে ক্ষমতায় যেতে হয়েছিল। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ১৯৯৬ বা ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে মিত্র দলগুলোর ওপর ভর করেই সরকার গড়তে হয়েছে। বাংলাদেশেও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বা ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ কেউই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেনি। তাদেরও অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন হয়েছিল।
প্রশ্ন: কোয়ালিশন বা জোট সরকার কীভাবে গঠন হয়?
ঝুলন্ত পার্লামেন্ট সমস্যার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর সমাধান হলো জোট বা কোয়ালিশন সরকার। যখন কোনো একটি দল একা ১৫১টি আসন পায় না, তখন তারা সমমনা বা সুবিধাজনক অন্য দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাটি পূর্ণ করে। একেই বলে কোয়ালিশন সরকার। এ ধরনের সরকার ব্যবস্থায় ছোট দলগুলোও ক্ষমতার
অংশ
হয় এবং বড় দলের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলার সুযোগ পায়।
কোয়ালিশন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সর্বদা শরিকদের তুষ্ট রাখার চাপ। সরকার টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরিকদের মতামত নিতে হয়। অনেক সময় শরিক দল সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে সরকারের পতনও ঘটতে পারে। পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকারের পতনের উদাহরণ এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক, যেখানে শরিক দল সমর্থন প্রত্যাহার করায় তাঁর গদি টলে গিয়েছিল।
প্রশ্ন: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতার লাগাম টানবে গণভোট?
সরকার গঠনের জন্য ১৫১টি আসন যথেষ্ট হলেও কোনো দল যদি ২০০টি বা তার বেশি আসন অর্থাৎ মোট আসনের দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তবে তারা সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতাও অর্জন করে। এটি একটি সরকারকে চরম ক্ষমতাশালী করে তোলে। যেকোনো বড় আইন পরিবর্তন বা নীতি নির্ধারণে তখন তাদের আর কোনো বাধার মুখে পড়তে হয় না। তবে সংস্কারের জন্য এবারের গণভোটে এই ক্ষমতার লাগাম টানার প্রস্তাব রয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে বাংলাদেশ পাবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। নির্বাচিত এমপিরা থাকবেন নিম্নকক্ষে। আর নতুন করে ১০০ সদস্যের একটি ‘উচ্চকক্ষ’ বা সিনেট গঠিত হবে। এই উচ্চকক্ষ তৈরি হবে ‘সংখ্যানুপাতিক’ বা পিআর পদ্ধতিতে। অর্থাৎ নির্বাচনে দলগুলো যে অনুপাতে ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তাদের প্রতিনিধি উচ্চকক্ষে জায়গা পাবে। এখন সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট থাকলেই সংবিধান বদলানো যায়। কিন্তু ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে এই প্রক্রিয়া আরও কঠিন ও জবাবদিহিমূলক হবে। তখন সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও লাগবে। আর সংবিধানের মৌলিক কিছু অনুচ্ছেদ বা প্রস্তাবনা পরিবর্তন করতে হলে জনগণের সরাসরি মতামত বা গণভোটের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ চাইলেই আর সংবিধানের মূল স্তম্ভে হাত দেওয়া যাবে না।
আগামীকালের নির্বাচন এবং গণভোট কেবল সংখ্যাতত্ত্বের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। ভোটাররা ঠিক করবেন তারা একক কোনো দলকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেবেন নাকি আলোচনার ভিত্তিতে চলা কোনো কোয়ালিশন সরকারকে বেছে নেবেন। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে—স্থিতিশীলতার দিকে, নাকি অনিশ্চিত সমীকরণের গোলকধাঁধায়।