দীর্ঘ নির্বাসনের পর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত একটি বিষয়। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তারেক রহমান দ্রুত দেশে ফিরতে বাধ্য হন। তিনি জনতার কাছ থেকে যে রাজকীয় অভ্যর্থনা পেয়েছেন, তা বিএনপির কর্মীদের আরও উজ্জীবিত করেছে।
জাতি উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে ছিল তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তের দিকে। বিমানবন্দরের দাপ্তরিক কাজ শেষ করে তিনি যখন খালি পায়ে দেশের মাটি স্পর্শ করলেন, তখন জাতি তাঁর প্রশান্ত মুখাবয়ব প্রত্যক্ষ করে। সজল দৃষ্টিতে সবাই তাঁকে অভিবাদন জানাল।
বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক নেতার বাসে করে অভ্যর্থনাস্থলে পৌঁছানো এবং মমতাময়ী মুমূর্ষু মাকে দেখার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে যান এবং পরে দলীয় ও সাধারণ নাগরিকদের ভিড়ে তারেক রহমানের বাসের কচ্ছপগতি যুগপৎ আবেগ ও উচ্ছ্বাসের দ্যোতনা তৈরি করে। সপ্তাহান্তে মা খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল পুরো দেশকে শোকে নিমজ্জিত করে তোলে। কিন্তু তারেক রহমানের স্থির, আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভরযোগ্য বক্তব্য সাধারণ মানুষকে অভিভূত করে।
মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তিনি আবেগ ধরে রাখেন। কেবল পাথর চাপা দেওয়া কান্নার আড়ালে মমতাময়ী মায়ের জন্য তাঁর পবিত্র কোরআন পাঠের দৃশ্য মানুষকে আপ্লুত করে। সামাজিক যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আবেগঘন দৃশ্য এবং লাখ লাখ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোড়ন তোলে। প্রবাসী বাঙালি ও ডায়াস্পোরার মধ্যেও একটুকরো বাংলাদেশের শোক স্পর্শ করে।
তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফেরার যে চিত্র মানুষ দেখেছে, তা ছিল আবেগের। তাঁকে বরণ করতে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। এই অভ্যর্থনা খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের বিস্ফোরণও বলা যেতে পারে। বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁদের নেত্রীর প্রয়াণে তারেকের মধ্যে খুঁজতে থাকেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াকে। এটিকে রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার রাজনীতি বলা যেতে পারে। তবে রাজনৈতিক পরিবারের ইতিহাসে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের উত্তরাধিকার অনেকটাই মাঠের রাজনীতি ও কর্মীদের সঙ্গে একাত্মবোধের ভিন্নমাত্রা দিয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে তারেক রহমানের প্রচার তাৎপর্যপূর্ণভাবে নতুন ধারা জন্ম দিয়েছে। একটি মঞ্চ, নেতাকর্মীদের বন্দনা, স্লোগান আর নেতার বক্তব্যকে কাঠফাটা রোদ কিংবা শীতের মধ্যেও দাঁড়িয়ে থেকে শুধু শোনার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তা তারেক রহমান পাল্টে দিয়েছেন। মঞ্চ থেকে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কালচার আর দেখা যায় না। বরং জনতার সঙ্গে নিরন্তর মিথস্ক্রিয়া করে নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তার সমাধানের প্রতিশ্রুতি এবার আমরা লক্ষ করি। উদাহরণস্বরূপ কড়াইল বস্তিসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত ব্যক্তিদের সমস্যার কথা তিনি সরাসরি শুনতে চেয়েছেন। অভিজাত গুলশান এলাকার বাসিন্দাদের পাশে এই দরিদ্র লোকালয়কে গড়ে তোলা তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কড়াইলে বহুতল ফ্ল্যাট তৈরি করা এবং ভাসানচরে সরকারি জমি অধিগ্রহণ করা এরশাদ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু তা আজও সমাধান হয়নি।
তারেক রহমান নিজ নির্বাচনী এলাকায় বস্তিবাসীদের নিয়ে কী পরিকল্পনা ও তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে—তা শুনেছেন এবং অংশগ্রহণমূলক সংলাপ তৈরি করেছেন। এটি কোনো কর্মী বা নেতার একক কথা নয়, বরং নারী, পুরুষ ও ছাত্র-ছাত্রীদের বহুস্বর তিনি শুনতে চেয়েছেন। এটি একধরনের পলিফোনিক ডায়ালগ। এই ধারা আমরা লক্ষ করি প্রতিটি জনসভা, সেমিনার এবং বিভিন্ন বৈঠকে।
আমার ভালো লেগেছে এই নির্বাচনী প্রচারণায় বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্পর্কে গিবত না গাওয়া, বিগত শেখ হাসিনা সরকার সম্পর্কে বিষেদাগার না করা—যা তিনি বারবার বিভিন্ন জনসভায় বর্জনের কথা বলেছেন।
তারেক রহমানের দল বিএনপির রাজনৈতিক ইশতেহার গতানুগতিক নয়। নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, খাল খনন, মৃতপ্রায় শিল্প পুনরুজ্জীবনসহ নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্থানীয় ভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক সম্পদ আহরণ এবং তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি রয়েছে বিশাল দক্ষ ও অদক্ষ বেকারদের জন্য বহির্বিশ্বে বহুবিধ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। এর অনুষঙ্গী হিসেবে তারেক রহমান দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারীকে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগাতে চান বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সবশেষে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ নানা সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির কথা মানুষকে আশাবাদী করেছে। এই দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, কিন্তু সেগুলো পূরণ হয়েছে সামান্যই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের। তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সর্বদা জনগণের পাশে থাকবেন, তাঁদের সমস্যার কথা শুনবেন এবং তিনি তার দেখভাল করবেন। এই আশা-জাগানিয়া প্রতিশ্রুতি সংসদ সদস্যদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিকল্প নেই। সরকার গঠন করতে পারলে সংসদ এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নতুনভাবে বাংলাদেশকে পাব আমরা।
দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণ ভোট দিতে যাচ্ছেন ১২ ফেব্রুয়ারি । ট্রেনে, বাসে, লঞ্চবোঝাই হয়ে ঈদের আনন্দের মতো মানুষ ছুটছেন ভোট দেওয়ার জন্য। এটি বোধহয় নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ইতিহাসে মেলা ভার। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংগঠনকে তাঁর পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব দিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেছেন এবং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তারেক রহমানের সশরীর নেতৃত্ব।
বিএনপি সম্ভবত একটি বড় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। বিএনপির জন্য শুভকামনা।
লেখক: গবেষণা অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক বাফেলো, নিউইয়র্ক