leadT1ad

‘ভোট এলে প্রার্থীরা বড় বড় কথা বলেন, পরে তারাই মাদক ব্যবসায়ীদের পাশে বসান’

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ঝিনাইদহ

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৫৫
ঝিনাইদহে ভোটের মাঠে প্রধান আলোচনার বিষয় ‘মাদক ও চোরাচালান’ ইস্যু। ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝিনাইদহ-৩ (মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর) আসনে নির্বাচনী হাওয়া এখন তুঙ্গে। তবে এই জনপদে উন্নয়নের ডামাডোলের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ‘মাদক ও চোরাচালান’ ইস্যু। ভারত সীমান্তবর্তী এই আসনে ভোটারদের মন জয়ে প্রার্থীরা এখন সভা-সমাবেশ আর ইশতেহারে মাদক নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করছেন। তবে সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন—এই ঘোষণা কি কেবলই ভোট টানার কৌশল, নাকি এর পেছনে রয়েছে সত্যিকারের সদিচ্ছা?

স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, মহেশপুর সীমান্তের বাঘাডাঙ্গা, মাটিলা পলিয়ানপুর, যাদবপুর, জুলুলী, লেবুতলা, শ্যামকুড় ও রায়পুর এলাকাগুলো চোরাচালানের প্রধান পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব রুট দিয়ে ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা, কোকেন ও বিদেশি মদ দেশে প্রবেশ করছে। এছাড়া স্বর্ণের বার, আগ্নেয়াস্ত্র, গরু এবং ভারতীয় ওষুধ পাচারেও এই এলাকাগুলো ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে চালান ধরা পড়লেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা নেপথ্যের গডফাদাররা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

মহেশপুর ব্যাটালিয়ন (৫৮ বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে পরিচালিত অভিযানে ১১ হাজার ৫৩০ বোতল মদ, প্রায় সাড়ে ৬ কেজি হেরোইন, ৫৩ হাজার ৪৭৪ পিস ইয়াবা, ১৪ হাজার ৩৮১ বোতল ফেনসিডিল, ১১৭ কেজি গাঁজা এবং ৫ কেজি কোকেনসহ মোট ৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৬ হাজার টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৩৮ কোটি ২৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার মালামাল আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ কেজি স্বর্ণ ও ৯টি পিস্তল রয়েছে।

কোটচাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার প্রবীণ ভোটার সুবীর বসু আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভোট এলে প্রার্থীরা বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তারাই মাদক ব্যবসায়ীদের নিজের পাশে বসান। নেতাদের ইশারা ছাড়া মাদক ব্যবসা চলা সম্ভব না।’

তরুণ ভোটার তুষার হোসেনের দাবি, ‘আমরা এমন প্রার্থী চাই যিনি মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপস করবেন না এবং যাদের অতীত রেকর্ড পরিষ্কার।’

সাংস্কৃতিক সংগঠক পথিক শহিদুল বলেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। শুধু লাঠি বা বন্দুক দিয়ে হবে না, তরুণদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিকল্প স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং পাচারকারীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।’

নির্বাচনী ময়দানে থাকা হেভিওয়েট প্রার্থীরা মাদক ও চোরাচালান রোধকে তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরছেন।

জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘মাদক বন্ধে কেবল বলপ্রয়োগ নয়, আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আমি নির্বাচিত হলে সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা কুটির শিল্পের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করব। কোটচাঁদপুর ও কালীগঞ্জকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার বন্ধে আধুনিক স্ক্যানার এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার প্রস্তাব সংসদে তুলব।’

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেহেদী হাসান রনি বলেন, ‘জনগণ আমাকে নির্বাচিত করলে প্রথম কাজ হবে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। অপরাধী চক্রকে কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হবে না। সীমান্ত সুরক্ষা বাজেট বাড়ানো এবং বিজিবিকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার দাবি তুলব সংসদে। অভাবের তাড়নায় কেউ যেন চোরাচালানে না জড়ায়, সেজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।’

ঝিনাইদহ-৩ আসনে এবার ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রার্থীদের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মধ্যে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীর প্রতিশ্রুতিতে ভোটাররা আস্থা রাখেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত