খাল কেবল পানিই বয়ে নেয় না, বরং তার স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলে ইতিহাস, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এবং একটি জাতির আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন। বাংলার কৃষিনির্ভর জনপদে খাল মানে জীবিকা ও সম্ভাবনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সত্তরের দশকে যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, তা ছিল গ্রামবাংলার ভাগ্য বদলের এক দূরদর্শী প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সারা দেশে ব্যাপক খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ তখনও খাদ্যঘাটতি, বেকারত্ব, দুর্বল সেচব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মতো নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। এসব সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে কৃষিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গবেষকদের মতে, এই উদ্যোগ পরবর্তীতে ‘জিয়া মডেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে, যা গ্রামীণ উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেন খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং কৃষকদের জন্য সেচব্যবস্থা উন্নত করা। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদী ও সাগরে চলে যেত, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে পানির তীব্র সংকট দেখা দিত। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জিয়াউর রহমান সম্ভবত উপলব্ধি করেন যে, যদি বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা যায় এবং সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। এ কারণে তিনি প্রাকৃতিক জলাধার তৈরির লক্ষ্যে দেশজুড়ে খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা এবং পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন, জিয়াউর রহমানের খাল খননের লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের মডেল তৈরি করা।
পাশাপাশি গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, স্থানীয় জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত হওয়ায় খাল খননের কাজে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকরা খাদ্য সহায়তা পেতেন, যা সেই সময়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত সহায়ক ছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান তার ‘দ্য বাংলাদেশ রেভলিউশন অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, জিয়াউর রহমান কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য সেচ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল দ্বিগুণ ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা।
খাল খনন কর্মসূচিতে জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীতএছাড়া খালগুলোতে পানি সংরক্ষণ হওয়ায় মাছ উৎপাদন বাড়ত এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ হতো। একই সঙ্গে বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি ধারণ করে বন্যার ক্ষতি কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। জলপথের মাধ্যমে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা।
প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাঁর ‘বাংলাদেশ: ইরা অব শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ে বলেছেন, ‘খাল খনন ছিল জিয়ার ‘‘১৯ দফা কর্মসূচি’’র একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা গ্রামীণ অবকাঠামো বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছিল।’
কীভাবে এই কর্মসূচি শুরু
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানরে হাত ধরে শুরু হয়েছিল খাল খনন কর্মসূচি। তিনি যশোরের উলাশীর খাল থেকে শুরু করেছিলেন এই কর্মসূচি। উলাশী খাল খনন ছিল সে সময়কার একটি পাইলট প্রকল্প। এটি ছিল উলাশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি খাল। স্থানীয়রা একে শ্রদ্ধাভরে ‘জিয়া খাল’ নামে ডাকেন।
সরকারি পরিকল্পনা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রশাসন স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ শুরু করে। গ্রামীণ জনগণ, যুবসমাজ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে এতে অংশ নেন। এই উদ্যোগে সামাজিক অংশগ্রহণের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়, যেখানে অনেক এলাকায় মানুষ নিজ উদ্যোগে দলবদ্ধভাবে খাল খননের কাজে অংশগ্রহণ করতেন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে শত শত প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়। এই সময়ে ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়েছিল। কোনো কোনো সূত্রে বলা হয়েছে, প্রায় দেড় হাজারের বেশি খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করা হয়, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬ হাজার কিলোমিটার। এই কর্মসূচির ফলে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে এবং ১৯৮০–এর দশকের শুরুতে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়।
জিয়াউর রহমানের খাল খননের সরাসরি প্রভাব পড়েছিল কৃষিতে। রিসার্চগেটের একটি দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে, খাল খনন কর্মসূচির ফলে ১৯৮০ সালে খাদ্য উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
ডিটিআইসির তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচি গ্রামীণ স্বনির্ভরতা বাড়াতে সহায়ক ছিল। এতে বিভিন্ন এলাকার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল এবং কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ দৃঢ় করে।
তবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যায়। যদি এটি অব্যাহত থাকত, তবে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারত বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এবার তারেক রহমানের হাত ধরে খাল খনন
বিএনপি এবার তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনর্বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী, হাজার হাজার খাল ও তাদের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।
২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘দেশব্যাপী নদী–নালা–খাল, জলাধার ও পুনঃখনন’ কর্মসূচির ওপর অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে কোন সংস্থা কত কিলোমিটার খাল খনন করবে, তার একটা রূপরেখা হাজির করা হয়।
বৈঠকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, চলমান প্রকল্পের অধীন ৭ হাজার ৪০২ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। নতুন প্রকল্প নিয়ে খনন করা হবে ১২ হাজার ৫৯৮ কিলোমিটার খাল। খাল শুধু খননযন্ত্র বা এক্সক্যাভেটর দিয়ে নয়, স্থানীয় মানুষের মাধ্যমে খননের সিদ্ধান্তও আছে, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে।
আজ সোমবার (১৬ মার্চ) দেশের ৫৪ জেলায় একযোগে শুরু হয়েছে খাল খনন কর্মসূচি। সকালে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খাল খননের মাধ্যমে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দফায় আগামী ছয় মাসে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার নদী-নালা ও খাল-বিল খনন করা হবে। পর্যায়ক্রমে পাঁচ বছরের মধ্যে সারা দেশে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা ও খাল-বিল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।