জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

খাল খনন কর্মসূচি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১৭: ৫০
স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশব্যাপী পরিচালিত খাল খনন কর্মসূচিতে প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে মানুষের কায়িক শ্রমকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া হবে। তাঁর এই বক্তব্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ‘শ্রমনির্ভর’ পদ্ধতির পুরোনো কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর একটি ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মূলত চার দশক আগের এক ঐতিহাসিক কর্মসূচির আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণ ঘটতে যাচ্ছে।

জিয়াউর রহমানের ‘সবুজ বিপ্লবের’ স্মৃতি

১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে প্রথম পরিকল্পিতভাবে খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি নিজেই কোদাল হাতে মাটি কেটে এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সে সময় প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন ও পুনঃখননের ফলে দেশে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়, যা একই সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেই ঐতিহ্যবাহী মডেলকেই সমসাময়িক বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে চাইছেন।

বাংলাদেশ মূলত নদী ও খালবেষ্টিত দেশ হলেও অব্যবস্থাপনা ও দখলের কারণে আমাদের সেচব্যবস্থা এখন সংকটের মুখে। বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে ১৪ হাজার ৬২০ কিলোমিটার খাল খনন করা হলেও তার মধ্যে ৯ হাজার ৩৭০ কিলোমিটারই বর্তমানে ভরাট হয়ে গেছে। সচল আছে মাত্র ৫ হাজার ২৫০ কিলোমিটার। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ মার্চ ২০২৬)

এই বিপুল পরিমাণ খাল ভরাট হওয়ায় জলাবদ্ধতা ও কৃষিতে সেচ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে খাল পুনঃখনন এখন পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের এক বিশাল ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাল খনন: কতটা কর্মসংস্থান হতে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, যন্ত্রের পরিবর্তে শ্রমনির্ভর পদ্ধতিতে কাজ করালে বিপুল পরিমাণ অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ তাঁর বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি কেবল কৃষি উন্নয়নের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল গ্রামীণ বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ঢাল। তিনি একে ‘শ্রমশক্তির সঞ্চয়ন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের এমপ্লয়মেন্ট-ইনটেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামে বলেছে, খাল খনন বা গ্রামীণ রাস্তা তৈরির মতো কাজে যন্ত্রের বদলে শ্রম ব্যবহার করলে একই বাজেটে ২ থেকে ৫ গুণ বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।

খাল খনন কর্মসূচিতে জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
খাল খনন কর্মসূচিতে জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

এছাড়া প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম তাঁর ‘ডেভলপমেন্ট প্ল্যানিং ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে বলেছেন, পুঁজির অভাব থাকা দেশগুলোতে শ্রমই হলো সবচেয়ে বড় সম্পদ। খাল খনন বা বাঁধ নির্মাণের মতো কাজে এই শ্রম ব্যবহার করলে তা মুদ্রাস্ফীতি না ঘটিয়েই মানুষের হাতে নগদ টাকা বা খাদ্য পৌঁছে দেয়।

বাংলাদেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মৌসুমি বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। কৃষিকাজের মধ্যবর্তী সময়ে যখন শ্রমিকদের হাতে কাজ থাকে না, তখন খাল খননের মতো প্রকল্প তাদের বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের হাতে নগদ টাকা পৌঁছালে তা স্থানীয় বাজারে খরচ হবে, যার ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও মৎস্য খাতের মতো ক্ষেত্রগুলো সচল হবে। খাল সচল হলে মাছ ও হাঁস পালনের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়াবে।

বাস্তবায়ন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও বিএডিসি যৌথভাবে দেশের ৫৪টি জেলায় প্রথম ধাপের কাজ শুরু করেছে। তবে এই মহতী উদ্যোগের সফলতায় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে খনন করা খাল পুনরায় ভরাট না হয়। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কাজের নিয়মিত তদারকি অত্যন্ত জরুরি।

সব মিলিয়ে তারেক রহমানের এই শ্রমনির্ভর খাল খনন কর্মসূচি পরিবেশ রক্ষা এবং বেকারত্ব দূরীকরণে একটি ‘দ্বিমুখী জয়’ বা ‘টু-ইন-ওয়ান’ কৌশল হতে পারে। যদি সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এটি বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি কেবল সেচব্যবস্থার উন্নতিই করবে না, বরং দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের এক নতুন পথ উন্মোচন করবে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতে এই কর্মসূচি এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে সাব্যস্ত হতে পারে।

সম্পর্কিত