জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিবিসির প্রতিবেদন

বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারত কি নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বড় ব্যবধানে জয়ের পর দিল্লি সুচিন্তিত ও উষ্ণ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

বাংলায় দেওয়া এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নির্বাচনে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ভারত একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে। পাশাপাশি ‘বহুমাত্রিক সম্পর্ক’ আরও জোরদার করতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন।

মোদির বার্তা ছিল ভবিষ্যতমুখী ও সতর্কতামূলক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুস্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরে, অবিশ্বাসও বাড়ে। দেশের অন্যতম দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

অনেক বাংলাদেশির অভিযোগ, দিল্লি ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়েছিল। এই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন বিরোধ, বাণিজ্যিক বাধা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মতো পুরোনো অভিযোগ। ভিসা সেবা প্রায় বন্ধ, সীমান্ত পেরোনো ট্রেন ও বাস চলাচল থেমে আছে, ঢাকা–দিল্লি ফ্লাইটও কমে গেছে।

এখন দিল্লি বিএনপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে কিনা তা নয়, প্রশ্ন দিল্লি কীভাবে যোগাযোগ করবে? বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদ দমনে কঠোর অবস্থান বজায় রেখে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছে, তা প্রশমিত করাই এখন মূল লক্ষ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক নতুন করে সাজানো সম্ভব। তবে দরকার সংযম এবং পারস্পারিক বিনিময়।

লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক আভিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী দল হিসেবে বিএনপিই সামনে এগোতে ভারতের সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ। প্রশ্ন হলো, তারেক রহমান কীভাবে দেশ শাসন করবেন? তিনি স্পষ্টতই ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চান। কিন্তু বলা যত সহজ, করা তত নয়।’

দিল্লির কাছে বিএনপি অচেনা নয়

২০০১ সালে তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত শীতল হয়ে পড়ে। বিএনপি–জামায়াত শাসনকাল ছিল অস্থিরতা ও গভীর পারস্পরিক অবিশ্বাসে ভরা।

ভারতের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানাতে প্রথম বিদেশি অতিথি ছিলেন। তবে বিশ্বাসের ঘাটতি কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বিএনপির তুলনামূলক সহজ যোগাযোগ দিল্লির সন্দেহ বাড়ায় যে ঢাকা কৌশলগতভাবে সরে যাচ্ছে কি না।

ভারতের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের মদদ দেওয়া বন্ধ করা এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

নির্বাচনের পর ভোলা ও যশোরের মতো জেলায় হিন্দুদের ওপর হামলার খবর দিল্লিকে উদ্বিগ্ন করে। আরও বিপদজনক ছিল ২০০৪ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান, যা ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে যাওয়ার কথা ছিল। অর্থনৈতিক সম্পর্কও ভালো ছিল না। টাটা গ্রুপের প্রস্তাবিত ৩০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ গ্যাসমূল্য নিয়ে জটিলতায় আটকে যায়। পরে ২০০৮ সালে চুক্তি বাতিল হয়।

২০১৪ সালে বিরোধীদলের প্রধান খালেদা জিয়া নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন। দিল্লি এই ঘটনাকে চরম অবজ্ঞা হিসেবেই দেখে।

এই অস্বস্তিকর ইতিহাসই ব্যাখ্যা করে কেন ভারত পরে শেখ হাসিনায় এত বিনিয়োগ করেছিল।

ক্ষমতায় ১৫ বছরে হাসিনা দিল্লির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে, বিদ্রোহ দমনে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও যোগাযোগ উন্নয়ন।

এখন দিল্লিতে নির্বাসনে থাকা হাসিনা মৃত্যুদণ্ডের মুখে। চব্বিশের আন্দোলনে জাতিসংঘের মতে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন, বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। তাঁকে প্রত্যর্পণে ভারতের অনীহা ঢাকার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার প্রক্রিয়াটি আরও জটিল করেছে।

গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় ঢাকায় আসেন এবং সেই সুযোগে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। সাম্প্রতিক এক সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ,’ যা দিল্লি ও পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডি দু’পক্ষ থেকেই স্বাধীনতার ইঙ্গিত।

অনেক বাংলাদেশির অভিযোগ, দিল্লি ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়েছিল। এই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন বিরোধ, বাণিজ্যিক বাধা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মতো পুরোনো অভিযোগ।

হাসিনার পতনের পর ঢাকা দ্রুতই ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে। ১৪ বছর পর ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট গত মাসে চালু হয়। এর আগে ১৩ বছরে প্রথমবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফর করেন। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সফর হয়েছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা আবার আলোচনায়। ২০২৪–২৫ সালে বাণিজ্য বেড়েছে ২৭ শতাংশ। একসময়ের শীতল সম্পর্ক আবার উষ্ণ হয়েছে।

দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের স্মৃতি পট্টনায়ক বিবিসিকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকাটা আমাদের উদ্বেগ নয়—একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে সেটি তাঁদের অধিকার। অস্বাভাবিক ছিল হাসিনার সময়ে প্রায় কোনো যোগাযোগই না থাকা। দোলকটি একদিকে বেশি দুলেছিল এখন উল্টো দিকে অতিরিক্ত দুলে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।’

হাসিনার নির্বাসন সম্ভবত আরেকটি এবং বেশি গুরুতর বিরক্তির কারণ। পট্টনায়ক বলেন, ‘বিএনপিকে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। হাসিনার প্রত্যার্পন হওয়ার সম্ভাবনা কম। একই সঙ্গে ঢাকার বিরোধী দলগুলো সরকারকে চাপ দেবে। ভারতকে তার ফেরত দেওয়ার জন্য এটাই তাদের হাতে পররাষ্ট্রনীতিতে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করার অল্প কয়েকটি হাতিয়ার।’

সম্পর্ক পুনরুদ্ধার সহজ হবে না

খবরে বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের হাজার হাজার তৃণমূল কর্মী ভারতে ঢুকেছেন।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘দিল্লি যদি নিজের মাটি থেকে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে, তা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। নির্বাসন থেকে হাসিনার নির্বাচনের আগের সংবাদ সম্মেলনগুলো ছিল বিভ্রান্তিকর। তিনি অনুশোচনা না করলে বা নেতৃত্ব বদলের সুযোগ না দিলে, তার উপস্থিতি সম্পর্ক জটিলই রাখবে।’

এর সঙ্গে আছে সীমান্ত পারাপারের, ভারতীয় রাজনীতিক ও টিভি স্টুডিওর উসকানিমূলক মন্তব্য। এসব কার্যক্রম বাংলাদেশকে দিল্লি সার্বভৌম রাষ্ট্র নয় বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য উঠোন হিসেবে দেখার ধারনাটি মজবুত করে।

পালিওয়ালের মতে, ঢাকার নতুন নেতৃত্ব ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে কি না এবং দিল্লি নিজের উত্তপ্ত বার্তা কমাতে পারে কি না তার ওপর নতুন সম্পর্ক নির্ভর করে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগে এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দেখা গেছে।

‘এতে ব্যর্থ হলে, ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত হোক পরিস্থিতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘরেই আটকে থাকবে’—তিনি বলেন।

তবে সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও দুই দেশের মধ্যকার নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে। ভারত ও বাংলাদেশ নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ-টহল, বার্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় ৫০ কোটি ডলারের ভারতীয় ঋণসুবিধা রয়েছে।

পট্টনায়ক বলেন, ‘আমি মনে করি না বিএনপি এই সহযোগিতা ফিরিয়ে নেবে। এটি নতুন নেতা, ভিন্ন জোট এবং ১৭ বছর পর ক্ষমতায় ফেরা একটি দল।’

সব অস্থিরতার মধ্যেও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে বেঁধে রেখেছে। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার আর এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হয়ে উঠেছে ভারত।

ছেঁড়া সম্পর্ক নতুন করে গোছোনো দরকার

পালিওয়াল বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে ভারতের অতীত সম্পর্ক জটিল এবং সমঝোতার চেয়ে অবিশ্বাসই বেশি। কিন্তু আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমান অতীতকে ভবিষ্যতের শত্রু হতে না দেওয়ার যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখিয়েছেন এবং দিল্লির বাস্তববাদী যোগাযোগের আগ্রহ—এগুলো আশাব্যঞ্জক।’

কে আগে এগোবে

দত্ত বলেন, ‘বড় প্রতিবেশী হিসেবে উদ্যোগ নেওয়া উচিত ভারতের। যোগাযোগ শুরু করা ভারতেরই দায়িত্ব। বাংলাদেশ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করেছে। এখন যুক্ত হওয়া দরকার, কোথায় সহায়তা করা যায় দেখা দরকার। আশা করি, বিএনপিও অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে।’

সম্পর্কের এই নতুন সূচনা এখন আর কথার ফুলঝুরির ওপর ততটা নির্ভর করছে না বরং তা নির্ভর করছে বড় প্রতিবেশী দেশ ভারত অতি-সতর্কতা কাটিয়ে আস্থার পথ বেছে নেবে কি না তার ওপর।

Ad 300x250

সম্পর্কিত