জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন

অতীতের ভয় নিয়ে সংস্কারের পথে বাংলাদেশ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানের জয় পেয়েছে বিএনপি। গত ১৮ বছরের মধ্যে এটিই দেশের প্রথম গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিএনপি ও তার মিত্ররা জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টি আসন জিতেছে। সরকার গঠনের জন্য ১৫১টি আসন প্রয়োজন হলেও তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা ৭৭টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি আসন পেয়েছে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন ১৭ বছরের বেশি সময় নির্বাসনে থাকা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তিনি সবসময় অস্বীকার করে এসেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরে প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন।

জয়ের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে তারেক রহমান বলেন, এই বিজয় বাংলাদেশের। এই বিজয় গণতন্ত্রের। এই বিজয় সেই জনগণের যারা গণতন্ত্রের প্রত্যাশা করেছে ও তার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে।

অন্যদিকে অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে ভারত চলে যাওয়া শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে প্রতারণা ও প্রহসন বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন পুরোপুরি গণতান্ত্রিক হতে পারে না।

ভোটের অধিকার পুনরুদ্ধার

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচনকে রাতের ভোটের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ডামি নির্বাচন বলে সমালোচকরা আখ্যায়িত করতেন। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান রাজনৈতিক অচলায়তন ভেঙে দিয়েছিল। তাই এবার ভোটকক্ষে ঢোকার বিষয়টি অনেক বাংলাদেশির জন্য একধারে নতুন ও আবেগপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

বগুড়ার ৩৮ বছর বয়সী দোকানদার মোহাম্মদ সালাম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, আমরা বছরের পর বছর লাইনে দাঁড়িয়েছি কিন্তু মনে হতো কিছুই বদলাবে না। আজ অন্তত মনে হয়েছে আমার ভোট গণনা করা হবে।

প্রথমবারের মতো ভোট দিতে আসা ঢাকার মেহরুবা আখতার ব্যালটের সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের যোগসূত্র দেখছেন। তিনি বলেন, আমরা পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় ছিলাম। এখন আমরা সেই পরিবর্তনকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি।

লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ এমইইকে জানান, নিম্ন ও মধ্য আয়ের নাগরিকরা বিপুল পরিমাণে জুলাই অভ্যুত্থান ও নির্বাচন উভয় ক্ষেত্রে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁদের অংশগ্রহণের বার্তা একটিই আর তা হলো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। আঠারো মাস আগে তাঁরা রক্ত দিয়ে পরিবর্তন চেয়েছিলেন। এবার তাঁরা ব্যালটের মাধ্যমে সেই দাবি পুনর্ব্যক্ত করলেন।

পারভেজ নির্বাচনকে অভ্যুত্থানের সরাসরি ফলাফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি যুক্তি দেখান, নতুন সংসদকে শহীদের ঋণ শোধ করতে হবে। এর জন্য পুলিশ সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং জনপ্রশাসন মেরামতের মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদও এই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তবে তিনি আত্মতুষ্টির বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে। তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এবং ভিন্নমত দমনের প্রলোভনও জাগিয়ে তোলে। তিনি ২০০১ ও ২০০৮ সালের বিপুল বিজয়ের উদাহরণ দেন যা পরে গণতান্ত্রিক রীতি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

ডানপন্থী রাজনীতির দিকে মোড়

বাংলাদেশের নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কতটা সরে গেছে তাও দেখিয়েছে। প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামী সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

একসময় দলটিকে কোণঠাসা করা হয়েছিল। কখনো কখনো রাজনীতিতে তাদের নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর তারা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আবার নির্বাচনী মাঠে ফিরেছে।

গবেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ধর্মীয় ও ডানপন্থী শক্তিগুলো নিজেদের দৃশ্যমান করার সুযোগ পেয়েছে। আলতাফ পারভেজ বলেন, জামায়াত নিজেকে বিস্ময়কর দক্ষতার সঙ্গে পুনর্গঠিত করেছে। তারা চতুর্থ সারির শক্তি থেকে বড় দলগুলোর নির্ভরযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। তাদের প্রচারণায় নৈতিকতা ও দুর্নীতি দমন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের এই সময়ে তাদের বার্তা মানুষের মনে ধরেছে।

তবে জামায়াতের উত্থান জনপরিসরে নারীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জামায়াতের আমির সম্প্রতি বলেছিলেন, নারীদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থাকা উচিত নয়। এক্সে দেওয়া এক বিতর্কিত পোস্টে তিনি বাড়ির বাইরে কাজ করা নারীদের সম্পর্কে আপত্তিকর ‘পেশা’ তুলনা করেন। তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর তিনি দাবি করেন তাঁর অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল।

তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সংসদে জোরালো উপস্থিতি নারীর সমঅধিকারের প্রশ্নে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, এনসিপির একটি অংশের সঙ্গে জামায়াতের কৌশলগত জোট নারী ভোটারদের দূরে ঠেলে দিতে পারে। এই নারীরা ২০২৪ সালে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের আশায় রাস্তায় নেমেছিলেন।

সামিনা এই পরিবর্তনকে পুরোনো ধাঁচের ক্ষমতার রাজনীতির প্রত্যাবর্তন বলে অভিহিত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংসদীয় সুবিধা আদায়ের চেষ্টা জুলাইয়ের নৈতিক শক্তিকে ম্লান করে দিতে পারে। তাঁর মতে আন্দোলনের প্রতীককে ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এর দায়িত্ব নেওয়া হয়নি। এতে জনগণের আস্থা কমেছে।

নারীর প্রতিনিধিত্ব: ক্ষমতায়ন ছাড়াই অংশগ্রহণ

নারীরা বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব খুবই নগণ্য। সরাসরি নির্বাচিত ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র সাতজন নারী জয়ী হয়েছেন। মনোনয়নের সময় থেকেই এই অসামঞ্জস্য শুরু হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্যে দেখা যায়, ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি দল একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি। এর মধ্যে জামায়াতও রয়েছে।

জুলাই সনদে নারীদের মনোনয়নের জন্য ৫ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন বর্তমান নির্বাচনী আইনে ৩০ শতাংশ রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংসদে এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্বের দীর্ঘদিনের দাবিও উপেক্ষিত হয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সেউতি সবুর এমইইকে বলেন, নারীদের প্রতিনিধিত্ব কম এবং রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, দলগুলোকে দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ। নাগরিক অধিকার আদায়ে নারীদের একা লড়তে হচ্ছে। তিনি জানান নারী সংগঠনগুলো ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব ও আনুপাতিক অন্তর্ভুক্তি এবং সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। আমরা ভিক্ষা চাইনি। আমরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার চেয়েছিলাম।

সেউতি সবুরের কাছে এই নির্বাচন মিশ্র অনুভূতির। তিনি বলেন, একমাত্র স্বস্তির বিষয় হলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং স্বাধীনতাবিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আমরা আপাতত একটু দম নিতে পারি আর অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারি।

ম্যান্ডেট ও সংস্কারের পথ

নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তারা ২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী সাংবিধানিক সংস্কার সমর্থন করেন কি না। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ ভোটের মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লাখ ভোটার হ্যাঁ বলেছেন। ২ কোটি ২৫ লাখ ভোটার না বলেছেন। ভোট পড়ার হার ছিল ৬০ শতাংশের কিছু বেশি।

ভোটের আগে নাগরিক সমাজের কিছু গোষ্ঠী গণভোটের গঠন নিয়ে সমালোচনা করেছিল। আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ এবং অধিকারকর্মীরা বলেছিলেন ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবকে একটি মাত্র হ্যাঁ বা না প্রশ্নের মধ্যে আটকে দেওয়া হয়েছে। এতে বিস্তারিত বিতর্কের সুযোগ কমেছে এবং জেনে-শুনে পছন্দ করার সুযোগ থাকেনি। কিছু এলাকার ভোটাররা বলেছেন হ্যাঁ বা না ভোটের আসলে অর্থ কী হবে তা নিয়ে তাঁরা অনিশ্চিত ছিলেন।

তবুও হ্যাঁ ভোটের ব্যাপকতা নতুন সংসদকে সংস্কারের ম্যান্ডেট দিয়েছে। এবারে ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালে সামরিক শাসনে অনুষ্ঠিত গণভোটের মতো একপাক্ষিক ছিল না। ১৯৯১ সালের সাংবিধানিক ভোটের মতো এতে ভোটার উপস্থিতিও কম ছিল না।

আলতাফ পারভেজ বলেন, ফলাফল সব সাংবিধানিক বিতর্কের সমাধান দেয়নি। তবে এটি কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।

পরবর্তী ধাপে এই ম্যান্ডেটের ব্যাখ্যা নির্ধারিত হবে। সাংবিধানিক সংস্কার সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে এগোবে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী আলোচনায় সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠনের কথাও ছিল। সংস্কারের মধ্যে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য ও সংসদের তদারকি জোরদার এবং পুলিশ ও জনপ্রশাসনের সংস্কারের বিষয়গুলো থাকবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা হবে।

সংখ্যালঘু ও আদিবাসী এবং নারীদের সম্পৃক্ত করা হলে এই প্রক্রিয়ার বৈধতা বাড়বে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সংস্কারের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আলোচনার প্রক্রিয়ার ওপর। একতরফাভাবে কিছু করলে তা আবার ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের সেই পুরনো চক্রে দেশকে ফিরিয়ে নিতে পারে।

আপাতত বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন শেষ করেছে। তবে আসল রায় এখনো বাকি। হাতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপিকে পরিচিত পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। তারা তাদের এই ম্যান্ডেটকে জবাবদিহি ও বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার কাজে লাগাবে নাকি আবার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে হাঁটবে তা সময়ই বলে দেবে।

ভোটাররা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রথমে রাজপথে এবং পরে ব্যালটে প্রকাশ করেছেন। একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে এক বয়স্ক ভোটার যেমনটি মৃদু স্বরে বলছিলেন, আমরা আমাদের কাজ করেছি। এখন তাদের কাজ করার পালা।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

Ad 300x250

সম্পর্কিত