leadT1ad

অস্তিত্ব সংকটে ঝিনাইদহের ১২ নদী: প্রার্থীদের নদী রক্ষার ‘বুলি’, ভোটাররা চান ‘রোডম্যাপ’

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ঝিনাইদহ

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ১৮
মৃতপ্রায় নবগঙ্গা নদী। ছবি: সংগৃহীত

ঝিনাইদহ জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা, কুমার ও চিত্রাসহ ১২টি নদ-নদী এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। কোথাও প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা, আর কোথাও ফসলি জমিতে রূপ নিয়েছে একসময়ের প্রমত্তা এসব নদী। দখল আর দূষণে নদীগুলো এখন সরু নালায় পরিণত হলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের মুখে এখন নদী রক্ষার প্রতিশ্রুতি। তবে ঝিনাইদহের সাধারণ ভোটার ও পরিবেশবাদীদের দাবি—কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, এবার নদী দখলমুক্ত করার বাস্তবমুখী ‘রোডম্যাপ’ দিতে হবে।

বিপন্ন ১২ নদীর হালচাল

ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বেগবতী, নবগঙ্গা, কুমার, গড়াই, কালীগঙ্গা, বেতনা, ইছামতি, কোদলা, কপোতাক্ষ, ফটকি, চিত্রা ও বেগবতী—এই ১২টি নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০৩ কিলোমিটার।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সদর ও কোটচাঁদপুরের চিত্রা নদীর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। কাগজে-কলমে ৮০ মিটার প্রস্থ থাকলেও বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৩ সালে দখলদারদের তালিকা তৈরি হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে তা আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে মহেশপুরের কোদালা নদীর বুকে গত ৩০ বছর ধরে অসংখ্য পুকুর ও ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। একইভাবে শৈলকুপার গড়াই ও কুমার নদ খননের অভাবে পলি জমে মরা খালে পরিণত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা থেকে উৎপত্তি লাভ করা কুমার নদের প্রবেশমুখ এবং জিকে সেচ প্রকল্পের সময় অন্যান্য উৎসমুখ বন্ধ হওয়ায় এটি এখন পানিশূন্য। ঝিনাইদহ শহরের নবগঙ্গা নদী পৌর ড্রেনের বর্জ্যে পরিণত হয়েছে এক বিষাক্ত জলাশয়ে।

এক সময় ঝিনুক ও রুপালি মাছের জন্য বিখ্যাত এই জনপদের মানুষ এখন নদী হারিয়ে বিপর্যস্ত। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক কাজী ফারুক বলেন, ‘প্রতিবার নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা চটকদার প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু বিজয়ী হয়ে দখলদারদের সঙ্গে আপস করেন। এবার নদী গিলে খাওয়া ব্যক্তিদের উচ্ছেদ করার সৎ সাহস যে প্রার্থীর আছে, আমরা তাকেই ভোট দেব।’

ভোটার রাকিবুল ইসলাম বাবু মনে করেন, নদী রক্ষাকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় দরকার। নবগঙ্গা রক্ষা পরিষদের সদস্যসচিব মো. গাউস গোর্কি বলেন, ‘আমরা আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না। সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুনখনন করতে হবে।’

মাঠে প্রার্থীরা: কে কী বলছেন

নির্বাচনী প্রচারণায় নদী রক্ষার বিষয়টি এখন প্রার্থীদের প্রধান অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিগত দিনে নদী খননের নামে কেবল লুটপাট হয়েছে। আমরা নির্বাচিত হলে কোনো দখলদারকে ছাড় দেব না এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনব।’

ঝিনাইদহ-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ বলেন, ‘নবগঙ্গা ও চিত্রা এই এলাকার জীবনরেখা। জনগণের নদী জনগণকে ফিরিয়ে দিতে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নেব এবং নদী সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প হাতে নেব।’

জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আলী আজম মোহাম্মদ আবু বকর বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নদীগুলোকে তিলে তিলে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা নির্বাচিত হলে ইনসাফ কায়েম করব এবং নদী দখলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে প্রতিটি নদী উদ্ধারে আপসহীন ভূমিকা রাখব।’

ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘কালীগঞ্জের চিত্রা ও বেগবতী নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দখলদারদের হঠানোই হবে আমার প্রথম কাজ। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করে সরাসরি কৃষকের উপকারে আসে এমন টেকসই খনন কার্যক্রম পরিচালনা করব।’

সিপিবি প্রার্থী আবু তোয়াব অপু বলেন, ‘নদী দখল মূলত লুটেরা রাজনীতির ফসল। ভূমিদস্যুদের হাত থেকে নদী উদ্ধার করে আমরা এই অঞ্চলের কৃষি ও প্রকৃতিকে রক্ষা করব।’

নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ঝিনাইদহবাসীর এই প্রাণের দাবি ততই জোরালো হচ্ছে। ভোটাররা এখন ব্যালটের মাধ্যমে এমন এক প্রতিনিধি বেছে নিতে চান, যিনি ঝিনাইদহের বারোটি নদীকে আবারও প্রাণবন্ত করে তুলবেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত