দ্য গার্ডিয়ানের এক্সপ্লেইনার
স্ট্রিম ডেস্ক

‘জাতীয় নিরাপত্তার’ যুক্তি দেখিয়ে ট্রাম্প বারবার বলেই যাচ্ছেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ চায় যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, গ্রিনল্যান্ড কিংবা ডেনমার্ক মানুক বা না মানুক ওই অঞ্চলের ব্যাপারে তারা কিছু একটা করবেই। অন্য দেশের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তারা চিন্তিত নয়।
এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ড সরাসরি ইইউ জোটের সদস্য না হলেও ডেনমার্কের স্বশাসিত এলাকা। তবে ডেনমার্ক ইইউ-এর সদস্য। আবার ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় এই জোটের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
যদিও ট্রাম্পের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের নেতারা শক্ত কথা বলছেন। সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁরা বলছেন, নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধু ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের। কিন্তু ট্রাম্পকে থামানোর কোনো স্পষ্ট কৌশল এখনো ঠিক হয়নি। ট্রাম্প সত্যিই যদি কোনো পদক্ষেপ নেন তবে কী জবাব দেওয়া হবে তাও পরিষ্কার নয়।
আজ যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির টেবিলে এত ঝড় সেই ভূখণ্ডের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। ইনুইট আদিবাসীরাই এই বরফের রাজ্যের প্রথম সন্তান। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিক থেকে তারা সেখানে বসবাস করছে। এরপর দৃশ্যপটে আসে নর্সরা। ৯৮৫ সালের দিকে এরিক দ্য রেড নামে এক নরওয়েজীয় সেখানে বসতি গড়েন। বরফে ঢাকা থাকলেও মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘গ্রিনল্যান্ড’ বা সবুজ ভূমি। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে নর্সরা সেখানে টিকে ছিল।
আধুনিক উপনিবেশের গল্প শুরু হয় ১৭২১ সালে হ্যান্স এজেড নামের এক মিশনারির হাত ধরে। তখন ডেনমার্ক ও নরওয়ে ছিল এক রাজ্যের অধীনে। সেই ডেনমার্ক-নরওয়েজীয় ইউনিয়নের ছত্রচ্ছায়ায় গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় শাসন শুরু হয়। ১৮১৪ সালে কিয়েল চুক্তির মাধ্যমে নরওয়ে সুইডেনের হাতে চলে যায়। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড থেকে যায় ডেনমার্কের দখলে। সেই থেকে দ্বীপটি ডেনিশ উপনিবেশ হিসেবেই পরিচিতি পায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমীকরণ আবার পাল্টে যায়। জার্মানি ডেনমার্ক দখল করে নেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে তারা আবার দ্বীপটি ডেনমার্ককে ফিরিয়ে দেয়। ১৯৫৩ সালে গ্রিনল্যান্ড ডেনিশ রাজ্যের আনুষ্ঠানিক অংশ হওয়ার মধ্য দিয়ে উপনিবেশ তকমা ঘোচে। ১৯৭৯ সালে গ্রিনল্যান্ড হোম রুল বা স্বায়ত্তশাসন পায়। এরপর ২০০৯ সালে আরও বেশি ক্ষমতা নিয়ে সেলফ রুল বা স্বরাজ চালু হয়। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখে। কেবল পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়গুলো কোপেনহেগেনের হাতে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বসবেন। অবশ্য এর আগেই ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের দূতেরা যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের বোঝানো শুরু করেছেন। তাঁরা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয়ের বাইরের রিপাবলিকানদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন।
কূটনৈতিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য আমেরিকার নিরাপত্তা শঙ্কা দূর করা। তাঁরা ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিতে চাইবেন। এই চুক্তির শর্ত অনুসারে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ আছে। সেখানে নতুন ঘাঁটি তৈরিরও অনুমতি রয়েছে। তাই আলাদা করে দখলের প্রয়োজন নেই। তাঁরা আরেকটি বিষয়ও সামনে আনবেন যা ইতিমধ্যেই ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, ন্যাটো মিত্রের ওপর আমেরিকার হামলা জোটের সমাপ্তি ডেকে আনবে। ন্যাটোর এক সদস্য আরেক সদস্যের ওপর হামলা করছে এমনটা ভাবাও যায় না।
ব্রাসেলসে ন্যাটো দূতেরা গত সপ্তাহে একমত হয়েছেন, তাঁরা মেরু অঞ্চলে সামরিক ব্যয় বাড়াবেন। সেখানে আরও সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে, বড় বড় মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এসব আমেরিকার নিরাপত্তা উদ্বেগ কমানোর জন্যই করা হচ্ছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন গ্রিনল্যান্ডে নাকি চীনা ও রুশ জাহাজ গিজগিজ করছে। কূটনীতিকরা বলছেন, এই দাবি পুরোপুরি অতিরঞ্জিত। তবে তাঁরা মনে করেন, পশ্চিমাদের সম্মিলিতভাবে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদার করা উচিত। এই পদক্ষেপই সংকট কাটানোর সবচেয়ে সহজ পথ হতে পারে। বাল্টিক সাগরের অবকাঠামো রক্ষার জন্য ন্যাটো যেমন ‘বাল্টিক সেন্ট্রি’ মিশন চালু করেছিল তেমন কিছু করা যেতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে বড় অর্থনৈতিক অস্ত্র আছে। ৪৫০ মিলিয়ন মানুষের বাজার তাদের হাতে। তারা আমেরিকার ওপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। ইউরোপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া যেতে পারে। ইউরোপের দেশগুলো যাতে আমেরিকার সরকারি বন্ড না কেনে সেই ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে আলোচিত অস্ত্র হলো ইইউর ‘ট্রেড বাজুকা’, যার পোশাকি নাম অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট। এই অস্ত্র ব্যবহার করে ইউরোপের বাজার থেকে মার্কিন পণ্য ও সেবা নিষিদ্ধ করা যায় এবং শুল্ক বসানো যায়। এমনকি বিনিয়োগও আটকে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো এই অস্ত্র ব্যবহার করতে সব সদস্য দেশের সম্মতি লাগবে।
জাতিসংঘের সাবেক এক কর্মকর্তা মতে, ইউরোপ প্রযুক্তির জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল। ডেটা সুরক্ষা থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সফটওয়্যার আপডেট সব কিছুতেই আমেরিকার দয়া দরকার হয়। তাছাড়া নিষেধাজ্ঞার হুমকি তখনই কাজে আসবে যখন ট্রাম্প সেটা বিশ্বাস করবেন। এখন পর্যন্ত তিনি এসব পাত্তাই দিচ্ছেন না।
গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতি ডেনমার্কের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। গত বছর ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় ৪০০ কোটি ড্যানিশ ক্রোন (প্রায় ৫৩ কোটি ইউরো) ভর্তুকি হিসেবে দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ড সরকারের দেশ চালাতে বছরে যা খরচ হয় (উন্নয়ন, বেতন-ভাতা, সরকারি সেবা), তার প্রায় অর্ধেকটাই আসে ডেনমার্কের এই অনুদান থেকে। এই অনুদানের পরিমাণ গ্রিনল্যান্ডের মোট জিডিপি বা অর্থনীতির আকারের প্রায় ২০ শতাংশ।
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দেশটি যাতে আমেরিকার অর্থনৈতিক বিনিয়োগের লোভের ফাঁদে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও চাইলে এর সমান প্রস্তাব দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই একটি খসড়া প্রস্তাবে অনুদান দ্বিগুণ করার কথা ভাবছে। এমনকি গ্রিনল্যান্ড ইউরোপের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকেও টাকা পেতে পারে।
ওয়াশিংটনের টাকার থলি হয়তো ব্রাসেলসের চেয়ে বড়। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড স্বাধীনতা পেলে আমেরিকার আগ্রাসী কর্পোরেটদের হাতে ধরা দিতে চাইবে না। তারা তাদের নর্ডিক ধাঁচের সমাজসেবা ব্যবস্থাও হারাতে চাইবে না।
কূটনীতি বা বিনিয়োগে সময় লাগবে, ট্রাম্প হয়তো চুক্তিতে সন্তুষ্ট হবেন না। তিনি নিজেই নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন সাফল্যের জন্য দ্বীপটির ‘মালিকানা’ মানসিকভাবে জরুরি।
ব্রুগেল থিংকট্যাংকের প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ইউরোপের উচিত সক্রিয়ভাবে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করা। ইইউর দ্রুত সৈন্য মোতায়েনের সক্ষমতা সক্রিয় করা দরকার। কোপেনহেগেন ও নুকের সম্মতিতে সেখানে ইউরোপীয় সৈন্য পাঠানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে ইউরোপ গ্রিনল্যান্ডের অখণ্ডতার প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি দেখাবে। এতে আমেরিকার দখল করার প্রক্রিয়া অনেক জটিল হয়ে যাবে।
জার্মান সরকার জানিয়েছে তারা ইউরোপীয় প্রতিরোধের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ফরাসি সেনা পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইউরোপ চাইলে অল্প সময়ে ৫০০০ সেনা মোতায়েন করতে পারে। যা আমেরিকার হিসাবনিকাশ বদলে দিতে পারে। জার্মানির একজন এমপি সের্গেই লাগোডিনস্কি বলেছেন আমেরিকা ও ইউরোপের যুদ্ধ কেউ চায় না। কিন্তু ইউরোপের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপ প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ধস নামাবে। বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাবে। এই ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে হয়তো ট্রাম্প দু’বার ভাববেন।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

‘জাতীয় নিরাপত্তার’ যুক্তি দেখিয়ে ট্রাম্প বারবার বলেই যাচ্ছেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ চায় যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, গ্রিনল্যান্ড কিংবা ডেনমার্ক মানুক বা না মানুক ওই অঞ্চলের ব্যাপারে তারা কিছু একটা করবেই। অন্য দেশের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তারা চিন্তিত নয়।
এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ড সরাসরি ইইউ জোটের সদস্য না হলেও ডেনমার্কের স্বশাসিত এলাকা। তবে ডেনমার্ক ইইউ-এর সদস্য। আবার ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় এই জোটের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
যদিও ট্রাম্পের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের নেতারা শক্ত কথা বলছেন। সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁরা বলছেন, নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধু ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের। কিন্তু ট্রাম্পকে থামানোর কোনো স্পষ্ট কৌশল এখনো ঠিক হয়নি। ট্রাম্প সত্যিই যদি কোনো পদক্ষেপ নেন তবে কী জবাব দেওয়া হবে তাও পরিষ্কার নয়।
আজ যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির টেবিলে এত ঝড় সেই ভূখণ্ডের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। ইনুইট আদিবাসীরাই এই বরফের রাজ্যের প্রথম সন্তান। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিক থেকে তারা সেখানে বসবাস করছে। এরপর দৃশ্যপটে আসে নর্সরা। ৯৮৫ সালের দিকে এরিক দ্য রেড নামে এক নরওয়েজীয় সেখানে বসতি গড়েন। বরফে ঢাকা থাকলেও মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘গ্রিনল্যান্ড’ বা সবুজ ভূমি। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে নর্সরা সেখানে টিকে ছিল।
আধুনিক উপনিবেশের গল্প শুরু হয় ১৭২১ সালে হ্যান্স এজেড নামের এক মিশনারির হাত ধরে। তখন ডেনমার্ক ও নরওয়ে ছিল এক রাজ্যের অধীনে। সেই ডেনমার্ক-নরওয়েজীয় ইউনিয়নের ছত্রচ্ছায়ায় গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় শাসন শুরু হয়। ১৮১৪ সালে কিয়েল চুক্তির মাধ্যমে নরওয়ে সুইডেনের হাতে চলে যায়। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড থেকে যায় ডেনমার্কের দখলে। সেই থেকে দ্বীপটি ডেনিশ উপনিবেশ হিসেবেই পরিচিতি পায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমীকরণ আবার পাল্টে যায়। জার্মানি ডেনমার্ক দখল করে নেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে তারা আবার দ্বীপটি ডেনমার্ককে ফিরিয়ে দেয়। ১৯৫৩ সালে গ্রিনল্যান্ড ডেনিশ রাজ্যের আনুষ্ঠানিক অংশ হওয়ার মধ্য দিয়ে উপনিবেশ তকমা ঘোচে। ১৯৭৯ সালে গ্রিনল্যান্ড হোম রুল বা স্বায়ত্তশাসন পায়। এরপর ২০০৯ সালে আরও বেশি ক্ষমতা নিয়ে সেলফ রুল বা স্বরাজ চালু হয়। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখে। কেবল পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়গুলো কোপেনহেগেনের হাতে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বসবেন। অবশ্য এর আগেই ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের দূতেরা যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের বোঝানো শুরু করেছেন। তাঁরা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয়ের বাইরের রিপাবলিকানদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন।
কূটনৈতিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য আমেরিকার নিরাপত্তা শঙ্কা দূর করা। তাঁরা ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিতে চাইবেন। এই চুক্তির শর্ত অনুসারে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ আছে। সেখানে নতুন ঘাঁটি তৈরিরও অনুমতি রয়েছে। তাই আলাদা করে দখলের প্রয়োজন নেই। তাঁরা আরেকটি বিষয়ও সামনে আনবেন যা ইতিমধ্যেই ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, ন্যাটো মিত্রের ওপর আমেরিকার হামলা জোটের সমাপ্তি ডেকে আনবে। ন্যাটোর এক সদস্য আরেক সদস্যের ওপর হামলা করছে এমনটা ভাবাও যায় না।
ব্রাসেলসে ন্যাটো দূতেরা গত সপ্তাহে একমত হয়েছেন, তাঁরা মেরু অঞ্চলে সামরিক ব্যয় বাড়াবেন। সেখানে আরও সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে, বড় বড় মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এসব আমেরিকার নিরাপত্তা উদ্বেগ কমানোর জন্যই করা হচ্ছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন গ্রিনল্যান্ডে নাকি চীনা ও রুশ জাহাজ গিজগিজ করছে। কূটনীতিকরা বলছেন, এই দাবি পুরোপুরি অতিরঞ্জিত। তবে তাঁরা মনে করেন, পশ্চিমাদের সম্মিলিতভাবে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদার করা উচিত। এই পদক্ষেপই সংকট কাটানোর সবচেয়ে সহজ পথ হতে পারে। বাল্টিক সাগরের অবকাঠামো রক্ষার জন্য ন্যাটো যেমন ‘বাল্টিক সেন্ট্রি’ মিশন চালু করেছিল তেমন কিছু করা যেতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে বড় অর্থনৈতিক অস্ত্র আছে। ৪৫০ মিলিয়ন মানুষের বাজার তাদের হাতে। তারা আমেরিকার ওপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। ইউরোপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া যেতে পারে। ইউরোপের দেশগুলো যাতে আমেরিকার সরকারি বন্ড না কেনে সেই ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে আলোচিত অস্ত্র হলো ইইউর ‘ট্রেড বাজুকা’, যার পোশাকি নাম অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট। এই অস্ত্র ব্যবহার করে ইউরোপের বাজার থেকে মার্কিন পণ্য ও সেবা নিষিদ্ধ করা যায় এবং শুল্ক বসানো যায়। এমনকি বিনিয়োগও আটকে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো এই অস্ত্র ব্যবহার করতে সব সদস্য দেশের সম্মতি লাগবে।
জাতিসংঘের সাবেক এক কর্মকর্তা মতে, ইউরোপ প্রযুক্তির জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল। ডেটা সুরক্ষা থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সফটওয়্যার আপডেট সব কিছুতেই আমেরিকার দয়া দরকার হয়। তাছাড়া নিষেধাজ্ঞার হুমকি তখনই কাজে আসবে যখন ট্রাম্প সেটা বিশ্বাস করবেন। এখন পর্যন্ত তিনি এসব পাত্তাই দিচ্ছেন না।
গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতি ডেনমার্কের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। গত বছর ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় ৪০০ কোটি ড্যানিশ ক্রোন (প্রায় ৫৩ কোটি ইউরো) ভর্তুকি হিসেবে দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ড সরকারের দেশ চালাতে বছরে যা খরচ হয় (উন্নয়ন, বেতন-ভাতা, সরকারি সেবা), তার প্রায় অর্ধেকটাই আসে ডেনমার্কের এই অনুদান থেকে। এই অনুদানের পরিমাণ গ্রিনল্যান্ডের মোট জিডিপি বা অর্থনীতির আকারের প্রায় ২০ শতাংশ।
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দেশটি যাতে আমেরিকার অর্থনৈতিক বিনিয়োগের লোভের ফাঁদে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও চাইলে এর সমান প্রস্তাব দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই একটি খসড়া প্রস্তাবে অনুদান দ্বিগুণ করার কথা ভাবছে। এমনকি গ্রিনল্যান্ড ইউরোপের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকেও টাকা পেতে পারে।
ওয়াশিংটনের টাকার থলি হয়তো ব্রাসেলসের চেয়ে বড়। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড স্বাধীনতা পেলে আমেরিকার আগ্রাসী কর্পোরেটদের হাতে ধরা দিতে চাইবে না। তারা তাদের নর্ডিক ধাঁচের সমাজসেবা ব্যবস্থাও হারাতে চাইবে না।
কূটনীতি বা বিনিয়োগে সময় লাগবে, ট্রাম্প হয়তো চুক্তিতে সন্তুষ্ট হবেন না। তিনি নিজেই নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন সাফল্যের জন্য দ্বীপটির ‘মালিকানা’ মানসিকভাবে জরুরি।
ব্রুগেল থিংকট্যাংকের প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ইউরোপের উচিত সক্রিয়ভাবে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করা। ইইউর দ্রুত সৈন্য মোতায়েনের সক্ষমতা সক্রিয় করা দরকার। কোপেনহেগেন ও নুকের সম্মতিতে সেখানে ইউরোপীয় সৈন্য পাঠানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে ইউরোপ গ্রিনল্যান্ডের অখণ্ডতার প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি দেখাবে। এতে আমেরিকার দখল করার প্রক্রিয়া অনেক জটিল হয়ে যাবে।
জার্মান সরকার জানিয়েছে তারা ইউরোপীয় প্রতিরোধের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ফরাসি সেনা পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইউরোপ চাইলে অল্প সময়ে ৫০০০ সেনা মোতায়েন করতে পারে। যা আমেরিকার হিসাবনিকাশ বদলে দিতে পারে। জার্মানির একজন এমপি সের্গেই লাগোডিনস্কি বলেছেন আমেরিকা ও ইউরোপের যুদ্ধ কেউ চায় না। কিন্তু ইউরোপের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপ প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ধস নামাবে। বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাবে। এই ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে হয়তো ট্রাম্প দু’বার ভাববেন।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রেজিম চেঞ্জ ও তেলের সম্পর্ক বহুদিনের। রেজিম চেঞ্জ বলতে কোনো সরকারকে উৎখাত বা অপসারণ করা বোঝায়। এ কাজে প্রায়ই বাইরের শক্তি জড়িত থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
৯ ঘণ্টা আগে
ইরান আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই প্রতিবাদ এখন শুধু রিয়ালের দরপতন বা অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
১ দিন আগে
ভেনেজুয়েলাসহ বেশ কয়েকটি দেশের জ্বালানি তেলের পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই বলে কি ব্যবসা বন্ধ থাকবে? নিশ্চয় না। ব্যবসায়ীরা এক অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। তারা একটি বিশাল জাহাজের বহরের সঙ্গে তেলবাহী জাহাজ যুক্ত করে দেয়, যেন বোঝা না যায়, কোন জাহাজে করে তেল পরিবহন করা হচ্ছে।
২ দিন আগে
গত ২৮ ডিসেম্বর জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। বছরের শেষ সময়ে এসে সরকারের এই সিদ্ধান্ত যেন মানুষের ধৈর্যের বাঁধে শেষ আঘাত হানে। নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম আর রিয়ালের দরপতনে সাধারণ মানুষ আগে থেকেই দিশেহারা ছিল।
৩ দিন আগে