গত সোমবার সন্ধ্যায় মাদক নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আচমকা অভিযানে নামে পুলিশ। কিন্তু সেই অভিযানের ধরণ ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ জনমনে গভীর আতংকের সৃষ্টি করেছে। পুলিশের ওই অভিযানে মারধরের শিকার হয়েছেন সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদ ও আজকের পত্রিকার কাউসার আহমেদকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিনকে মাটিতে ফেলে টেনেহিঁচড়ে পেটানোর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই দৃশ্যগুলো আমাদের পুরোনো ভীতিকর স্মৃতির সামনে দাঁড় করিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে সরকার বদল হয়েছে। মানুষ আশা করেছিল শাসনের ধরন বদলাবে এবং পুলিশ হবে জনবান্ধব। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা প্রমাণ করেছে পুলিশের লাঠির ভাষা বদলায়নি। এই প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে এসেছে সেই পুরনো প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি তবে এখনো ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ বা ‘পুলিশ স্টেটের’ চরিত্রেই রয়ে গেছে?
পুলিশি রাষ্ট্র বলতে আসলে কী বোঝায়
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি রাষ্ট্রকে তখনই পুলিশি রাষ্ট্র বলা হয় যখন সরকার তার নিজের নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে আইন বা বিচারবিভাগের চেয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর বেশি নির্ভর করে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, পুলিশি রাষ্ট্র হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পুলিশ গোপনে বা প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি চালায়।
এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসন থাকে নামমাত্র। সংবিধান বা আদালতের চেয়ে থানার ওসির ক্ষমতা বেশি মনে হয়। এখানে পুলিশ কেবল অপরাধ দমন করে না। তারা নির্ধারণ করে কে রাজনীতি করবে আর কে করবে না। নাগরিকরা কী বলবে বা কোথায় যাবে তাও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে তারা। পুলিশি রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘দায়মুক্তি’। পুলিশ যদি কোনো অন্যায় করে বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তবে তার বিচার হয় না। রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের সুরক্ষা দেয়। কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকার জন্য এই বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই ব্যবস্থায় ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়। সাধারণ মানুষ পুলিশকে বন্ধু না ভেবে আতঙ্কের কারণ মনে করে।
বিগত দেড় দশকে পুলিশ কি দলীয় ‘লাঠিয়াল’ ছিল
বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। শেখ হাসিনা সরকারের সময় পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল প্রবল। তখন বিরোধী দলের আন্দোলন দমাতে পুলিশকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। গায়েবি মামলা বা ভুতুড়ে মামলার সংস্কৃতি চালু হয়েছিল সেই সময়। মৃত মানুষ বা বিদেশে থাকা মানুষের নামেও নাশকতার মামলা দিয়েছে পুলিশ। এসবই পুলিশি রাষ্ট্রের ধ্রুপদী উদাহরণ।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র। অপরাধ দমনের নামে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ ছিল মুখস্ত চিত্রনাট্যের মতো । কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর দিনের পর দিন স্বীকার না করা বা ‘গুম’ করার সংস্কৃতি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল। ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে মানুষকে জেলে যেতে হয়েছে। পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল গ্রেপ্তারের অবাধ ক্ষমতা।
২০২২ সালে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার কর্মীরা বৈঠক করতে পারছেন। তাই একে পুলিশি রাষ্ট্র বলা যাবে না। মন্ত্রীর এই উক্তি তখন সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। কারণ বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পুলিশ তখন কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল না। তারা হয়ে উঠেছিল ‘সামাজিক মাতবর’। সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, পুলিশ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও হস্তক্ষেপ শুরু করেছিল। পার্কে কে কার সঙ্গে বসেছে বা কে কী পোশাক পরেছে তা নিয়েও পুলিশি জেরা শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ওপর এক ধরনের অভিভাবকসুলভ খবরদারি বা ‘মরাল পুলিশিং’ চাপিয়ে দিয়েছিল।
৫ আগস্টের অভ্যুত্থান কি তবে শুধুই ক্ষমতার পালাবদল
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল মূলত বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। থানার পর থানা আক্রান্ত হয়েছিল। পুলিশ সদস্যরা কর্মবিরতিতে গিয়েছিল। সেই সময় মনে হয়েছিল পুলিশ বাহিনীতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে অনেক রদবদল করা হয়েছে। অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল এবার হয়তো ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসবে পুলিশ। তারা হবে সত্যিকার অর্থেই জনগণের বন্ধু।
কিন্তু বাস্তবতা বদলাতে সময় লাগছে। কাঠামোর পরিবর্তন হলেও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন যে হয়নি তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় স্পষ্ট। পুলিশের কাজ মাদক নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু মাদক অভিযানের নামে নিরাপরাধ মানুষকে পেটানো কোনো সভ্য দেশের রীতি হতে পারে না। সাংবাদিকরা যখন নিজেদের পরিচয়পত্র দেখান তখনো তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। ডিসি মাসুদ আলম একে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে অভিহিত করেন। তিনি অজুহাত দিয়েছেন আইডি কার্ড না থাকার। কিন্তু আইডি কার্ড না থাকলেই কি কাউকে রাস্তায় ফেলে পেটানো বৈধ? আইন কি পুলিশকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে?
পুলিশের সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতা কেন এখনো অজেয়
সরকার বদলায়। কিন্তু পুলিশের লাঠির আঘাতের ধরন বদলায় না। এর পেছনে রয়েছে গভীর কাঠামোগত সমস্যা। আমাদের পুলিশ চলে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনে। ব্রিটিশরা এই আইন করেছিল এদেশের মানুষকে প্রজা হিসেবে শাসন করার জন্য। সেই আইনে পুলিশকে প্রভুর আসনে বসানো হয়েছে। সেবার মানসিকতা সেখানে গৌণ। আজও পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণে সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতা বা ‘মাস্টার মাইন্ডসেট’ গেঁথে দেওয়া হয়। তারা মনে করে লাঠিই সব সমস্যার সমাধান।
আরেকটি বড় কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। সাংবাদিক পেটানোর ঘটনায় বা ছাত্র নির্যাতনের ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্যের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির কম। তদন্ত কমিটি হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিছুদিন পর তারা আবার চাকরিতে ফিরে আসে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা ‘কালচার অফ ইম্পিউনিটি’ পুলিশকে বেপরোয়া করে তোলে। তারা জানে ‘ওপরের নির্দেশ’ বা ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে পার পাওয়া যাবে।
পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবও একটি বড় বাধা। সরকার টিকে থাকার জন্য পুলিশের ওপর নির্ভর করে। ফলে পুলিশকে বাড়তি সুবিধা বা ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই অন্যায্য ক্ষমতা চর্চা করতে গিয়ে পুলিশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়েও মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা মনে করছেন তারা আইনের ঊর্ধ্বে। কোনো সুনির্দিষ্ট ওয়ারেন্ট বা অভিযোগ ছাড়াই তল্লাশি ও মারধর করার সাহস তারা এই মানসিকতা থেকেই পান।
আইনের রক্ষক যখন নিজেই বিচারক, তখন নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়
সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার বা দণ্ড প্রদানের ক্ষমতা কেবল আদালতের। পুলিশ কাউকে শাস্তি দিতে পারে না। তাদের কাজ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশ নিজেই বিচারকের ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিনকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কোনো নাগরিকের গায়ে হাত তোলার অধিকার পুলিশের নেই। আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া বলপ্রয়োগ বেআইনি।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা প্রমাণ করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখনো হুমকির মুখে। তথ্য সংগ্রহের সময় সাংবাদিককে পেটানো মানে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। পুলিশ যখন সাংবাদিকের ক্যামেরা বা মোবাইল কেড়ে নেয় তখন তারা প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করে। এটি একটি অপরাধমূলক কাজ। এই আচরণগুলোই বলে দেয় আমরা এখনো পুলিশি রাষ্ট্রের চরিত্র থেকে বের হতে পারিনি।
সংস্কার কি কেবলই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ হবে আইনের রক্ষক। শোষক নয়। অন্তবর্তী সরকার বারবার পুলিশ সংস্কারের কথা বলছে। পুলিশ কমিশন গঠনের আলোচনা চলছে। কিন্তু সংস্কার কেবল কাগজে কলমে হলে চলবে না। তা হতে হবে মানসিকতায়। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।
পুলিশের প্রতিটি অভিযানের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। শরীরে বডি ক্যামেরা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যাতে তারা কী করছে তা রেকর্ড থাকে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থা বা বদলি কোনো শাস্তি হতে পারে না।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং সতর্কবার্তা। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে পুলিশ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। সরকার বদলালেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলাবে না। সেই পুরোনো ভয় আর আতঙ্কের মধ্যেই কাটাতে হবে জীবন।
পুলিশি রাষ্ট্রের তকমা কোনো দেশের জন্য সম্মানের নয়, বরং ভয় ও লজ্জার। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় এই তকমা বয়ে বেড়িয়েছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান আমাদের সেই লজ্জা মোচনের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু পুলিশের সাম্প্রতিক আচরণ সেই সুযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। রাষ্ট্র যদি এখনই কঠোর না হয় তবে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। মনে রাখতে হবে পুলিশ জনগণের সেবক, প্রভু নয়। যতক্ষণ এই সত্য প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে ততক্ষণ আমরা পুলিশি রাষ্ট্রের ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারব না।