জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আন্দামান সাগরে ভারত-জাপান-ইন্দোনেশিয়ার শক্তি প্রদর্শন: সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ১৪
আন্দামান সাগরে ভারত-জাপান-ইন্দোনেশিয়া শক্তি প্রদর্শন করছে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করতে আন্দামান সাগরে এক বিশাল শক্তি প্রদর্শন করল ভারত, জাপান এবং ইন্দোনেশিয়া। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এই তিন দেশের নৌবাহিনী একটি উচ্চপর্যায়ের ত্রিপাক্ষিক মহড়ায় অংশ নিয়ে তাদের সামরিক সক্ষমতার জানান দেয়। এই মহড়া কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে একটি ‘নিরাপদ ও স্থিতিশীল’ অঞ্চল গড়ার শক্তিশালী বার্তা। মূলত যৌথ প্রস্তুতি ও পারস্পরিক কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই তিন শক্তিধর রাষ্ট্র একই সমান্তরালে এসে দাঁড়িয়েছে।

মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত আন্দামান সাগরের এই তৎপরতা বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির অংশ হিসেবে এই ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতা আঞ্চলিক শক্তিসাম্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্স ‘সিটিএফ ১৫৪’-এর কমান্ড গ্রহণ ভারতের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ত্রিপাক্ষিক মহড়ার মূল লক্ষ্য ও তাৎপর্য কী

ভারতীয় নৌবাহিনীর তথ্যমতে, এই মহড়ার প্রধান লক্ষ্য তিন দেশের মধ্যে পারস্পরিক অপারেশনাল বোঝাপড়া এবং কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সমুদ্রপথে যেকোনো আকস্মিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও রণকৌশলগত ঐক্য নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি কার্যকর প্রচেষ্টা।

যৌথ নিরাপত্তা

আন্দামান সাগরের এই মহড়ায় সমুদ্রপথে অবৈধ অনুপ্রবেশ, জলদস্যুতা এবং যেকোনো আকস্মিক সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনটি দেশ কীভাবে একযোগে কাজ করবে, তার একটি সফল মহড়া সম্পন্ন হয়। ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় ও রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের যৌথ প্রতিরক্ষা দেয়ালকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। এই সমন্বিত উদ্যোগ কেবল সামুদ্রিক অপরাধ দমন নয়, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মিত্র দেশগুলোর দ্রুত সাড়াদানের সক্ষমতাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কৌশলগত বার্তা

এই অঞ্চলে ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার শক্তিশালী জোট পরোক্ষভাবে এই বার্তাই দেয় যে, যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথের নিরাপত্তা বজায় রাখতে তারা সম্মিলিতভাবে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ত্রিপাক্ষিক মহড়াটি সমুদ্রপথের অবাধ চলাচল ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করে। মূলত এই দেশগুলোর কৌশলগত ঐক্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইনকে সুরক্ষিত রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সংকেত প্রদান করেছে।

আন্দামান ভারতের ‘অপ্রতিরোধ্য সামরিক দুর্গ’ কেন

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে হলেও এটি বর্তমানে দেশটির প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভারত মহাসাগরের এই কৌশলগত অবস্থান ভারতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলপথে একচ্ছত্র নজরদারি এবং দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনন্য সুবিধা প্রদান করে।

ত্রি-সদস্য কমান্ড

২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্দামান ও নিকোবর কমান্ড হলো ভারতের একমাত্র এবং প্রথম ‘থ্রি-সার্ভিস থিয়েটার কমান্ড’, যেখানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী একক নেতৃত্বের অধীনে কাজ করে। পোর্ট ব্লেয়ারে সদর দপ্তর বিশিষ্ট এই কমান্ডটি ৫৭০টিরও বেশি দ্বীপের বিশাল এলাকা জুড়ে ভারতের সামুদ্রিক সীমান্ত রক্ষা এবং কৌশলগত নজরদারি নিশ্চিত করে। এই সমন্বিত কাঠামোর ফলে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তিনটি বাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে যৌথ অপারেশন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়, যা ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের একটি অনন্য উদাহরণ। বর্তমানে এই কমান্ডটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সাথে ভারতের সামরিক কূটনীতি ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছে।

পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপন

ভারত কৌশলগতভাবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আইএনএস কোহাসা এবং আইএনএস বাজ-এর মতো নৌ-বিমানঘাঁটির রানওয়ে ৩ হাজার মিটারের বেশি সম্প্রসারণ করছে, যাতে পি-এইটআই পসেইডন নজরদারি বিমান এবং সুখোই-৩০ এমকেআই-এর মতো যুদ্ধবিমান অনায়াসে ল্যান্ডিং-টেক অফ করতে পারে। এই আধুনিক পরিকাঠামো বঙ্গোপসাগর ও মালাক্কা প্রণালীর মুখে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির বিপরীতে একটি শক্তিশালী ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া গ্রেট নিকোবরে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে ভারত এই অঞ্চলে নিজের স্থায়ী সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: সিটিএফ ১৫৪-এর কমান্ড গ্রহণ

ভারত আন্দামান সাগরে মহড়ার ঠিক আগেই গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাহরাইনে অবস্থিত ৪৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ‘কম্বাইন্ড মেরিটাইম ফোর্সেস’-এর অধীনে সিটিএফ ১৫৪-এর কমান্ড গ্রহণ করেছে।

আন্দামান সাগরে ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার এই যৌথ তৎপরতা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামুদ্রিক নিরাপত্তা কেবল একক কোনো দেশের নিজস্ব বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্র।

বাহরাইনের মানামায় এক অনুষ্ঠানে ভারতীয় নৌবাহিনীর কমোডর মিলিন্দ এম মোকাশি ইতালীয় নৌবাহিনীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি। এই কমান্ড গ্রহণের মাধ্যমে ভারত লোহিত সাগর ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল জলসীমায় প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা পালন করবে।

ভারতের নেতৃত্ব

বাহরাইনের মানামায় সিএমএফ সদর দপ্তরে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় নৌবাহিনীর কমোডর মিলিন্দ এম মোকাশি ইতালীয় নৌবাহিনীর বিদায়ী কমান্ডারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিটিএফ ১৫৪-এর কমান্ড গ্রহণ করেন। ভাইস অ্যাডমিরাল কার্ট এ রেনশ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই পরিবর্তন ভারতের পেশাদারিত্বের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর আস্থার প্রতিফলন। এই টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে ভারত এখন ৪৭টি সদস্য দেশের নৌবাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পথ দেখাবে।

প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা

২০২৩ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত সিটিএফ ১৫৪ মূলত সদস্য দেশগুলোর নৌবাহিনীর পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষভাবে কাজ করে। এই টাস্ক ফোর্স নিয়মিতভাবে ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট ট্রেনিং’, ‘কম্পাস রোজ’ এবং ‘নর্দান/সাদার্ন রেডিনেস’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে থাকে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অবৈধ পাচার, জলদস্যুতা এবং অনিয়মিত অভিবাসনের মতো সাধারণ সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলায় ভারতসহ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

সামুদ্রিক সহযোগিতায় নতুন সমীকরণ কেন

আন্দামান সাগরের এই ত্রিপাক্ষিক মহড়া এবং আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব—দুটো ঘটনাই ভারতের বৈশ্বিক সামুদ্রিক রণকৌশলের একটি বড় চিত্রের অংশ। জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে ভারতের এই ঘনিষ্ঠতা মূলত ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির একটি অত্যন্ত সফল এবং সময়োপযোগী বাস্তবায়ন। এই ত্রিপাক্ষিক জোট ভারত মহাসাগরে চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ নীতির বিপরীতে এক শক্তিশালী কৌশলগত পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত মালাক্কা প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই দেশগুলোর যৌথ উপস্থিতি এখন অপরিহার্য। এই সহযোগিতার ফলে সমুদ্রপথে অবৈধ কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ সুনিশ্চিত হবে।

আন্দামান সাগরে ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার এই যৌথ তৎপরতা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামুদ্রিক নিরাপত্তা কেবল একক কোনো দেশের নিজস্ব বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্র। ভারতের শক্তিশালী নৌ-ঘাঁটি স্থাপন এবং বৈশ্বিক কমান্ডে নেতৃত্বের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশটিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মালাক্কা প্রণালীর মুখে ভারতের এই দৃঢ় অবস্থান এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে একাত্মতা ভবিষ্যতে একটি নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা রক্ষায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

পরিশেষে বলা যায়, এই সমন্বিত উদ্যোগ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে, যা আগামী দিনে যেকোনো আঞ্চলিক অস্থিরতা মোকাবিলায় এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতে এক অনন্য ও অপরিহার্য সমীকরণ হিসেবে গণ্য হবে।

সম্পর্কিত