leadT1ad

প্যারোল কী, কোন কোন শর্তে দেওয়া হয় অনুমতি

বাগেরহাটের কারাফটকে মর্মান্তিক এক ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে সবাইকে। প্রশ্ন উঠছে, কেন প্যারোল নিয়ে এতো জটিলতা? প্যারোল আসলে কী? অধিকার নাকি প্রিভিলেজ? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলুন জেনে নিই প্যারোলের আদ্যোপান্ত।

স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলায় যশোর কারাগারে বন্দি।

গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়ি থেকে জুয়েলের স্ত্রী কানিজ সুর্বনা স্বর্ণালী ও তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে নিয়ে আসা হয় জুয়েলের স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ।

জুয়েলের মামাতো ভাই সাগর ফারাজী অভিযোগ করে বলেন, ‘স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই আমরা প্যারোলে মুক্তির জন্য কারাগারে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু অনুমতি মেলেনি। শেষমেশ লাশ নিয়েই স্বজনদের কারাগারে আসতে হলো। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও জুয়েলের প্যারোল পাওয়া উচিত ছিল।’

অন্যদিকে রোববার (২৫ জানুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আবেদন করা হয়নি।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। বিগত সরকারের আমলগুলোতেও আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্যারোল নিয়ে নানা টালবাহানা করা হয়েছে। এমনকি অত্যন্ত অমানবিক ও মর্যাদাহানিকরভাবে বিরোধীদলীয় নেতাদের হাতকড়া ও পায়ে ‘ডান্ডাবেড়ি’ পরা অবস্থায় বাবা-মায়ের জানাজায় অংশ নিতে বাধ্য করার নজিরও রয়েছে। সেই সময়কার ওই শিউরে ওঠা দৃশ্যগুলো দেশ-বিদেশে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে তীব্র সমালোচিত হয়েছিল।

বাগেরহাট সদর ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে দেখিয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ নিয়ে ফিরছেন স্বজন। স্ট্রিম ছবি
বাগেরহাট সদর ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে দেখিয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ নিয়ে ফিরছেন স্বজন। স্ট্রিম ছবি

৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর যখন ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার ডাক দেওয়া হলো, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল—অন্তত মানবিক ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্র আর কোনো প্রতিহিংসার পথে হাঁটবে না। কিন্তু যশোর কারাগারের ফটকে স্ত্রী ও ৯ মাস বয়সী কন্যার নিথর দেহের সামনে একজন বন্দির কান্নার যে দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তা যেন সেই পুরনো অমানবিক স্মৃতিগুলোকেই আবার নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সংগত কারণেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—প্যারোল আসলে কী? কেন এটি দেওয়া হয়? আর এর আইনি ভিত্তিই বা কী?

প্যারোল আসলে কী

‘প্যারোল’ শব্দটি মূলত ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ ‘কথা দেওয়া’ বা ‘প্রতিশ্রুতি’। আইন ও বিচারিক পরিভাষায় প্যারোল বলতে বোঝায় কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে তার সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্যারোল ও জামিন নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তি দেখা যায়।

জামিন বা বেইল হলো বিচার চলাকালীন বা আপিল বিচারাধীন অবস্থায় আদালতের মাধ্যমে পাওয়া মুক্তি। এটি অনেক ক্ষেত্রে আসামির অধিকার। অন্যদিকে, প্যারোল দেওয়া হয় বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর, যখন আসামি দোষী সাব্যস্ত হয়ে দণ্ড ভোগ করছেন।

প্যারোল সাধারণত নির্বাহী বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।

প্যারোলে মুক্তি মানে বন্দি কারাগারের চার দেয়ালের পরিবর্তে সমাজের মুক্ত পরিবেশে থাকেন, কিন্তু তার ওপর রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি বজায় থাকে। প্যারোলে থাকা সময়টিকেও সাজার অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়, যদি না মুক্তির শর্তে ভিন্ন কিছু উল্লেখ থাকে।

আইনগতভাবে প্যারোলে থাকা ব্যক্তি তখনও ‘দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি’ বা হিসেবেই বিবেচিত হন। তিনি একজন সাধারণ মুক্ত নাগরিকের মতো পূর্ণ অধিকার ভোগ করতে পারেন না। প্যারোল কোনো বন্দির আইনি অধিকার বা ‘রাইট’ নয়, বরং এটি কর্তৃপক্ষের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল বিশেষ সুবিধা বা ‘প্রিভিলেজ’।

কী কী শর্তে প্যারোল দেওয়া হয়

বাংলাদেশে প্যারোল আইন দীর্ঘকাল ধরে পরিচালিত হচ্ছে ব্রিটিশ আমলের ১৮৯৪ সালের কারা আইন, বাংলাদেশ জেল কোড এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪০১ ধারার সমন্বয়ে।

প্যারোল মানেই অবাধ স্বাধীনতা নয়। এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় কঠোর সব শর্ত। ২০১৬ সালের নীতিমালা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(২) ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্যারোলে মুক্ত বন্দির ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। নীতিমালার ‘ক’ অংশের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্যারোলে মুক্ত বন্দিকে সার্বক্ষণিক পুলিশ প্রহরার মধ্যে থাকতে হবে। জুয়েল হাসান সাদ্দামের মতো কেউ যদি জানাজার জন্য প্যারোল পান, তবে পুলিশ ও কারারক্ষীরা তাকে বেষ্টন করে রাখবেন এবং জানাজা শেষ হওয়া মাত্রই পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।

দ্বিতীয়ত, চলাফেরার ভৌগোলিক সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। নীতিমালার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গন্তব্যের দূরত্ব ও দুর্গমতা বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করবে। বন্দি চাইলেই নির্ধারিত এলাকা বা তার বাসভবনের বাইরে যেতে পারেন না।

তৃতীয়ত, বিদেশ ভ্রমণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্যারোলে মুক্তির আদেশে সাধারণত পাসপোর্ট জমা রাখার শর্ত থাকে এবং চিকিৎসার জন্য বিশেষ অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

২০২২ সালে শেখ হাসিনার শাসনামলে হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি নিয়ে মায়ের জানাজা পড়াচ্ছেন গাজীপুরের বিএনপি নেতা আলী আজম। ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালে শেখ হাসিনার শাসনামলে হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি নিয়ে মায়ের জানাজা পড়াচ্ছেন গাজীপুরের বিএনপি নেতা আলী আজম। ছবি: সংগৃহীত

চতুর্থত, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থে বন্দির গণমাধ্যমে কথা বলা বা রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। যদিও কোনো আইনে সরাসরি ‘মিডিয়ায় কথা বলা যাবে না’ এমন কথা লেখা নেই, কিন্তু সরকার ৪০১(২) ধারার ক্ষমতাবলে জনশৃঙ্খলার স্বার্থে এই শর্তটি জুড়ে দেয়। এই নীতিমালা অনুযায়ী, ভিআইপি বা সাধারণ—যেকোনো শ্রেণির বন্দির বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে।

নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, মুক্তির সময়সীমা সাধারণত ১২ ঘণ্টার বেশি হবে না, তবে বিশেষ প্রয়োজনে সরকার তা বাড়াতে পারে। এছাড়া বন্দি যেখানেই থাকুন না কেন, দূরত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্যারোল মঞ্জুর বা নামঞ্জুর করার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের হাতে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নীতিমালার ১(খ) অনুচ্ছেদে একটি বিশেষ ‘উইন্ডো’ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে আত্মীয়ের মৃত্যু ছাড়াও আদালতের আদেশ বা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্তে যেকোনো বন্দিকে প্যারোল দেওয়া যেতে পারে।

শর্ত ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিকভাবে প্যারোল বাতিল করে বন্দিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রয়োজনে পেনাল কোডের ২২৪ ধারা অনুযায়ী নতুন মামলাও হতে পারে।

প্রস্তাবিত নতুন আইনে কী পরিবর্তন আসছে

বিদ্যমান ব্যবস্থার অস্পষ্টতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে সরকার ‘বাংলাদেশ কারা ও সংশোধন পরিষেবা আইন, ২০২৩’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে। এই খসড়া আইনে প্যারোলকে প্রথমবারের মতো একটি কাঠামোগত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। খসড়া আইনের ১৯ থেকে ২৩ নম্বর ধারায় প্যারোল সংক্রান্ত বিধানগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বর্তমানের নির্বাহী আদেশের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত।

প্রস্তাবিত আইনের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সমাজে পুনর্বাসন ও পুনঃঅঙ্গীভূতকরণের উদ্দেশ্যে বন্দিকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। এটি প্যারোলের আধুনিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে শাস্তির চেয়ে সংশোধনের ওপর জোর দেওয়া হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় যেখানে জেলা প্রশাসক বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে খসড়া আইনের ২০ নম্বর ধারায় প্রতিটি জেলায় একটি ‘প্যারোল বোর্ড’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে গঠিত এই বোর্ডে সদস্য-সচিব হিসেবে থাকবেন সংশ্লিষ্ট কারাগারের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অথবা জেলার। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একক ক্ষমতার অপব্যবহার কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

২০২৩ সালে শেখ হাসিনার শাসনামলে শরীয়তপুরে হাতকড়া-ডান্ডাবেড়ি নিয়ে মায়ের জানাজায় ছাত্রদল নেতা। ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালে শেখ হাসিনার শাসনামলে শরীয়তপুরে হাতকড়া-ডান্ডাবেড়ি নিয়ে মায়ের জানাজায় ছাত্রদল নেতা। ছবি: সংগৃহীত

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে প্যারোলের যোগ্যতার ক্ষেত্রে। খসড়া আইনের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, একজন বন্দি তখনই প্যারোলের আবেদন করতে পারবেন, যখন তিনি নির্দিষ্ট মেয়াদের সাজা ভোগ করবেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ছাড়া অন্য যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে, অর্জিত রেয়াতসহ মোট কারাদণ্ডের ন্যূনতম অর্ধেক সময় অতিবাহিত করলেই বন্দি প্যারোলের যোগ্য হবেন। আর আমৃত্যু কারাদণ্ড ছাড়া সাধারণ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে, রেয়াতসহ ন্যূনতম ১৫ বছর কারাভোগ করতে হবে।

এছাড়া বন্দিকে কারা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত পুনর্বাসন কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। প্রস্তাবিত আইনে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো বন্দির একাধিক মামলায় সাজা থাকে এবং সেগুলো যদি যুগপৎভাবে চলতে থাকে, তবে সর্বোচ্চ মেয়াদের দণ্ডের অর্ধেক সময় পার হলেই তিনি আবেদন করতে পারবেন। আর যদি সাজা ক্রমান্বয়ে চলে, তবে মোট মেয়াদের অর্ধেক সময় পার হতে হবে।

নারী বন্দিদের জন্য এই আইনে বিশেষ বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। ২১(২) ধারা অনুযায়ী, সাধারণ বিধানের পাশাপাশি ‘সাজাপ্রাপ্ত নারী বন্দির বিশেষ সুবিধা আইন, ২০০৬’-এর সুবিধাও তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এছাড়া, প্যারোলে মুক্ত থাকার সময়টি কারাবাস হিসেবেই গণ্য হবে এবং বন্দি ওই সময়ের জন্য রেয়াত পাবেন—যা ২২ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। বন্দিদের তদারকির জন্য ২৩ নম্বর ধারায় ‘প্যারোল কর্মকর্তা’ নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে, যারা জেল থেকে মুক্ত হওয়া বন্দিদের সমাজে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করবেন।

মানবাধিকার নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার

প্যারোল ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো মানবিকতা এবং সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যবস্থাটি প্রায়শই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জুয়েল হাসান সাদ্দামের ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় মানবিক অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। ৫ আগস্টের পর যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, বিচার ব্যবস্থায় যে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, কারাফটকে লাশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাবার অসহায়ত্বের কাছে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, প্যারোল পাওয়াটা যদি কেবলই কর্তৃপক্ষের ‘দয়া’ বা ‘বিবেচনা’র ওপর নির্ভর করে, তবে সেখানে বৈষম্যের সুযোগ থেকেই যায়। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ অপরাধীরা সহজেই চিকিৎসার নাম করে দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকার বা প্যারোল পাওয়ার সুযোগ পান, অথচ বিরোধী মতের বা সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রে গুরুতর মানবিক সংকটেও আইনের কঠোর ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়। জুয়েল হাসানের ক্ষেত্রেও হয়তো ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বা ‘দূরত্ব’র অজুহাত দেখানো হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের স্ত্রী ও সন্তান হারানোর শোকের কাছে এই অজুহাতগুলো নিতান্তই ঠুনকো মনে হয়।

বাংলাদেশে প্যারোল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং একে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। ১৮৯৪ সালের ঔপনিবেশিক আইন বা বিক্ষিপ্ত কিছু নির্বাহী আদেশ দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর মানবাধিকার ও সংশোধনের ধারণা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ কারা ও সংশোধন পরিষেবা আইন, ২০২৩’-এর খসড়াটি একটি আশার আলো হতে পারে। প্রস্তাবিত আইনে প্যারোল বোর্ড গঠন এবং প্যারোল কর্মকর্তা নিয়োগের যে বিধান রাখা হয়েছে, তা কার্যকর হলে একক কোনো ব্যক্তির ইচ্ছামাফিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমবে।

প্যারোল কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার বা শাস্তির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়। এটি অপরাধীকে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া। জুয়েল হাসান সাদ্দামের মতো ঘটনাগুলো রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আইনের শাসন মানে কেবল কড়াকড়ি নয়, আইনের শাসন মানে মানবিক মর্যাদাও। যতদিন পর্যন্ত প্যারোল ব্যবস্থাকে একটি স্বচ্ছ আইনি কাঠামোর মধ্যে না আনা হবে এবং একে সম্পূর্ণভাবে বিচারিক বা নিরপেক্ষ বোর্ডের অধীনে ন্যস্ত না করা হবে, ততদিন পর্যন্ত কারাফটকে স্বজন হারানো বন্দিদের এমন হাহাকার আমাদের তথাকথিত ‘সভ্য’ সমাজকে বিদ্ধ করতে থাকবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত