leadT1ad

ট্রাম্পের গাজা উন্নয়ন পরিকল্পনার আড়ালে কী

ডোনাল্ড ট্রাম্পে নতুন গাজা পরিকল্পনা। ছবি: সংগৃহীত

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির তীরে নাকি মাথা তুলে দাঁড়াবে চকচকে আকাশচুম্বী দালান। রোদের আলোয় ঝিকমিক করবে কাচের জানালারা। নাম দেওয়া হবে ‘নিউ গাজা’ আর ‘নিউ রাফাহ’। সেখানে গড়ে উঠবে এক লাখের বেশি আধুনিক আবাসন ইউনিট। পাশে থাকবে সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত শিল্প পার্ক। এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য নতুন বিমানবন্দর তৈরির কথাও বলা হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জমকালো মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন স্বপ্নই দেখালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও আবাসন ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনার। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই পরিকল্পনা যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের ভাগ্য ফেরানোর জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো যাদের জন্য এই উন্নয়ন, তারা এই পরিকল্পনার বিন্দুবিসর্গও জানে না। গাজার মানুষের সঙ্গে এই তথাকথিত মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কোনো পরামর্শই করা হয়নি।

জ্যারেড কুশনারের দাবি, এর কোনো ‘প্ল্যান বি’ বা বিকল্প পরিকল্পনা নেই। তাঁর উপস্থাপিত এই নকশাকে তিনি যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার জন্য চূড়ান্ত রূপরেখা । অথচ বাস্তবচিত্র এই রঙিন স্বপ্নের সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় যে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তা আধুনিক ইতিহাসে বিরল। দক্ষিণ ইসরায়েলের গ্রাম ও সেনা ফাঁড়িতে হামাসের সেই আক্রমণের জেরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। ধারণা করা হচ্ছে তারা ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে মারা গেছেন।

গত বছরের ১০ অক্টোবর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। তারপরও মৃত্যুর মিছিল থামেনি। ওই ঘোষণার পরেও ৪৭০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জমকালো মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন স্বপ্নই দেখালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও আবাসন ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনার
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জমকালো মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন স্বপ্নই দেখালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও আবাসন ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনার

ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রস্তাবকে ‘ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পুনর্গঠনের মহৎ উদ্যোগ’ হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু সেই প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকারের কোনো বুলি নেই। সম্পত্তির মালিকানা বা ভূমির অধিকার নিয়ে সেখানে টুঁ শব্দটি করা হয়নি। এমনকি ইসরায়েলের চালানো যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ও সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। পরিবর্তে পরিকল্পনা করা হচ্ছে বিশাল বিশাল চকচকে ইমারত গড়ার। এই ইমারতগুলো গড়ে উঠবে আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ আর যুদ্ধের জঞ্জালের ওপর। যে জঞ্জালের নিচে হাজার হাজার মানুষের লাশ এখনো মাটিচাপা পড়ে আছে। দাভোস ফোরামে ট্রাম্প দাবি করেছেন, গাজার যুদ্ধ নাকি সত্যিই শেষ হতে চলেছে। অথচ ঠিক সেইদিনই গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় দুই শিশু ও তিন সাংবাদিকসহ অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ট্রাম্প নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন তিনি মনেপ্রাণে একজন আবাসন ব্যবসায়ী। তাঁর কাছে সবকিছুর মূল বিষয় হলো ‘লোকেশন’ বা অবস্থান। তিনি সাগরের পাড়ের এই সুন্দর ভূখণ্ডের অমিত সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, এত মানুষের জন্য জায়গাটা কত কিছুই না হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই তথাকথিত মাস্টারপ্ল্যানকে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি বলে অভিহিত করে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ না করেই এমন একপক্ষীয় নকশা করা হয়েছে। চলমান গণহত্যাকে কেবল লোভনীয় ‘বিনিয়োগের সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক সুসান আবুলহাওয়া এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য গাজার আদি চরিত্র মুছে ফেলা। যারা এখনো বেঁচে আছে তাদের সস্তা শ্রমিকের দাসে পরিণত করা। তারা কেবল সেখানকার ‘শিল্প এলাকাগুলো’ দেখাশোনা করবে। আর গাজার উপকূলরেখা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের নাগালের বাইরে রেখে আলাদা করা হবে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় নির্বিচার বোমাবর্ষণ চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমর্থন আর অস্ত্রের জোগান দিয়ে ইসরায়েলকে এই কাজে পূর্ণ সহায়তা করেছে। এই দীর্ঘ হামলায় গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বড় বড় আবাসিক ব্লকগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব বড় হাসপাতাল আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন কেবল ইট-পাথরের স্তূপ। বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট আর পৌরসেবা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। ২৩ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেকে প্রাণ বাঁচাতে একাধিকবার জায়গা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। মানুষ সামান্য খাবার আর পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। জীবন বাঁচাতে অতি প্রয়োজনীয় ত্রাণের প্রবেশপথ ইসরায়েল নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা ইচ্ছামতো সবকিছু আটকে দিয়ে মানবিক বিপর্যয়কে আরও ঘনীভূত করছে।

বোর্ড অব পিস নাকি ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ

গাজা পুনর্গঠনের এই পরিকল্পনা ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ নামের এক নতুন উদ্যোগের অংশ। দাভোসে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই বোর্ডের সনদ ঘোষণা করে, একে তাঁর প্রশাসনের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এই ব্যবস্থা গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারকি করবে। যারা এই বোর্ডে স্থায়ী আসন পেতে চান তাদের ১০০ কোটি ডলার ফি দিতে হবে। ১১ পৃষ্ঠার এই সনদে গাজার নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। দেখে মনে হচ্ছে এটি একটি আন্তর্জাতিক বিবাদ নিষ্পত্তির মঞ্চ হয়ে উঠতে চাইছে। হয়তো জাতিসংঘের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই এর আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে।

বিধ্বস্ত গাজা। সংগৃহীত ছবি
বিধ্বস্ত গাজা। সংগৃহীত ছবি

এখন পর্যন্ত এই নির্বাহী বোর্ডে যুক্ত হয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। আছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আর ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে ভেটো দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছেন খোদ ট্রাম্প। আশ্চর্যের বিষয় হলো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। অথচ আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে গাজায় যুদ্ধাপরাধের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। সেই পরোয়ানাকে থোড়াই কেয়ার করে তাঁকে বোর্ডে রাখা হয়েছে। অন্তত ৫০টি দেশের নেতা আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রতিপক্ষ চীন ও রাশিয়াও রয়েছে। বেশ কয়েকটি দেশ যোগ দিতে রাজিও হয়েছে। তবে ট্রাম্প কানাডার আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবের সমালোচনা করেছিলেন। তারই প্রতিশোধ হিসেবে কানাডাকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফোরামে ট্রাম্প বলেছেন এই বোর্ড গাজায় খুব সফল হবে। সেখানে সফল হলে তারা অন্য বিষয়ের দিকেও নজর দেবেন। এরপর কুশনার গাজা নিয়ে তাঁদের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যান দেখান। কিন্তু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো রূপরেখার কথা তিনি ভুলেও উচ্চারণ করেননি। গাজার বর্তমান শাসকগোষ্ঠী হামাস তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাবের নিন্দা জানিয়েছে। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে গাজার জনগণ তাদের ভূখণ্ড নিয়ে এই বিদেশি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেবে না।

গাজা প্ল্যানে কী আছে

ট্রাম্পের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গাজার জিডিপি বাড়ানোর প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১০ বিলিয়ন বা ১০০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অথচ যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে ২০২৪ সালে দেশটির অর্থনীতির আকার মাত্র ৩৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে নেমে এসেছিল। ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। আধুনিক পরিষেবা ও জনসেবার অবকাঠামো গড়ার জন্য অন্তত ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

এই বিপুল অঙ্কের অর্থের জোগান কে বা কারা দেবে তা স্পষ্ট করেননি কুশনার। তবে তিনি অন্য সব কিছুর চেয়ে নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিলেন। তাঁর মতে নিরাপত্তাই হবে এক নম্বর অগ্রাধিকার। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কেউ সেখানে বিনিয়োগ করবে না। কেউ সেখানে ভবন গড়তে আসবে না। আর কর্মসংস্থান তৈরির চাকা সচল করতে হলে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। কুশনার জানালেন উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলিদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে হামাসের সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কাজ করা হবে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ফিলিস্তিনি জনগণ বা তাদের নেতৃত্বের সঙ্গে এসব পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না তার কোনো প্রমাণ নেই। গাজায় ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ সাওয়া বলেন, ফিলিস্তিনি সুশীল সমাজ বা সরকারি কোনো সংস্থাকে বোর্ড অব পিসের আলোচনায় রাখা হয়নি। মাঠপর্যায়ে ১০ বছর ধরে কাজ করা ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা বিস্মিত ও হতবাক। বিশেষ করে গাজায় গত দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতার পর কেউ তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেনি। গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। বিশ্বনেতারা যখন দাভোসে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন ইসরায়েল তখন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গাজায় তাদের ধ্বংসলীলা অব্যাহত রেখেছে। তাদের সামরিক অভিযান বিন্দুমাত্র থামেনি।

উন্নয়নের চার ধাপ ও বাসস্থানের অনিশ্চয়তা

দাভোসের মঞ্চে জ্যারেড কুশনার এক ঝলমলে মানচিত্র তুলে ধরলেন। তাতে গাজার ভবিষ্যৎ আঁকা হয়েছে রঙের প্রলেপে। উন্নয়ন নাকি হবে চার ধাপে। শুরুটা হবে একেবারে দক্ষিণের শহর রাফাহ থেকে। এরপর ধীরে ধীরে তা উত্তরের দিকে এগোবে। কুশনারের দেখানো মানচিত্রে উপকূলীয় এলাকাগুলোকে আলাদা রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে থাকবে পর্যটন কেন্দ্র। থাকবে মিশ্র ব্যবহারের টাওয়ার আর আবাসিক ও শিল্প এলাকা। প্রথম ধাপে রাফাহ আর খান ইউনিসের কিছু অংশ পুনর্গঠন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে হাত দেওয়া হবে খান ইউনিসের বাকি অংশে। মধ্য গাজার শরণার্থী শিবিরগুলোর উন্নয়নের পালা আসবে তৃতীয় ধাপে। আর চতুর্থ বা শেষ ধাপে কাজ হবে উত্তরের গাজা সিটিতে।

কুশনার উপস্থিত দর্শকদের জানালেন সব এলাকা নতুন করে সাজাতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সময় ফিলিস্তিনিরা কোথায় থাকবেন তা তিনি বলেননি। নতুন বাড়িঘর বা সম্পদ কাদের দেওয়া হবে সে বিষয়েও তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন।

গোলাপি রঙে আঁকা পর্যটন স্বপ্ন

মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় ট্রাম্প প্রশাসন গাজার পুরো সমুদ্রসৈকতকে গোলাপি রঙে মুড়ে দিয়েছে। তারা এই এলাকাকে ‘উপকূলীয় পর্যটন অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াবে ১৮০টি আকাশচুম্বী অট্টালিকা। গাজার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে মিসর সীমান্তের কাছে একটি বন্দর গড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তার ঠিক কাছেই থাকবে বিমানবন্দর। এই জায়গা পুরোনো গাজা বিমানবন্দর থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। দুই দশক আগে ইসরায়েলি হামলায় সেই বিমানবন্দরটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের খতিয়ান

গত বছরের অক্টোবর মাসে ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রতিবেদন মতে, যুদ্ধের সময় সেখানে বেকারত্ব বেড়েছে ৮০ শতাংশ। বর্তমানে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ কর্মহীন। ২০২৪ সালে জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৮৩ শতাংশ কমে গেছে। দুই বছরের হিসাবে এই পতনের হার ৮৭ শতাংশ। জিডিপি নেমে এসেছে মাত্র ৩৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে। মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে বছরে মাত্র ১৬১ ডলারে।

গাজা চেম্বার অব কমার্সের মহাপরিচালক মাহের আলতাব্বা গত মাসেই আল জাজিরাকে বলেছিলেন, যুদ্ধের আগে গাজায় অর্থনীতির চাকা ঘুরছিল। তখন বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে অনেক প্রকল্প শুরু হয়েছিল।

কুশনারের প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে নির্মাণ কৃষি বা সেবা খাতে পাঁচ লাখের বেশি নতুন চাকরি তৈরি হবে। কারিগরি শিক্ষার জন্য দেড়শ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

এই বোর্ড ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’র নীতি অনুসরণ করে গাজাকে বিদেশি সাহায্যের নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে চায়। প্রস্তাবে নতুন এক ‘লজিস্টিক করিডোর’ ও রাফাহতে নতুন ‘ত্রিপক্ষীয়’ ক্রসিংয়ের নকশা দেখানো হয়েছে। গাজার শহরের কেন্দ্রগুলোকে জুড়ে দেওয়ার জন্য সড়ক তৈরির কথাও আছে। মানচিত্র দেখে মনে হচ্ছে নতুন ক্রসিং এমন এক বিন্দুতে হবে যেখানে গাজা ইসরায়েল ও মিসরের সিনাই অঞ্চল মিশেছে। এদিকে গাজা ও মিসরের মধ্যকার মূল রাফাহ ক্রসিং আগামী সপ্তাহে উভয় দিকের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

‘নিউ রাফাহ’ ও ‘নিউ গাজা’র বিভ্রম

কুশনার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ‘নিউ রাফাহ’ শিরোনামের কিছু ঝকঝকে ছবি দেখিয়ে দর্শকদের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ছবিতে গাজার এই দক্ষিণের শহরে এক লাখেরও বেশি স্থায়ী আবাসন গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। দাবি করা হয়েছে সেখানে প্রায় ২০০ স্কুল ও ৭৫টির বেশি চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি হবে। আরেকটি স্লাইডে ‘নিউ গাজা’র ছবি ভেসে ওঠে। সেখানে গাজাকে একটি শিল্পাঞ্চল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ডেটা সেন্টার ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর।

নিরস্ত্রীকরণের শর্ত ও সমীকরণ

এত সব রঙিন স্বপ্নের মাঝেও কুশনার কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে না। এর পরেই কেবল ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। যুদ্ধের সময় ইসরায়েল গাজায় বেশ কিছু সশস্ত্র দল ও গ্যাংকে মদত দিয়েছিল। কুশনার জানিয়েছেন এদের ভেঙে দেওয়া হবে অথবা ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ বা এনসিএজির সঙ্গে একীভূত করা হবে। ১৫ জন ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদ বা টেকনোক্র্যাট নিয়ে এই কমিটি গঠিত হবে। তারাই দৈনন্দিন প্রশাসন চালাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাসের সব ভারী অস্ত্র অবিলম্বে অকেজো করা হবে। ছোট অস্ত্রগুলো পর্যায়ক্রমে জমা নেবে নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী। হামাস এখনো অস্ত্র সমর্পণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তাদের আশঙ্কা এর ফলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলি হামলার মুখে ফিলিস্তিনিদের আত্মরক্ষার ন্যূনতম সক্ষমতাটুকুও হারিয়ে যাবে।

দাভোসের উপস্থাপনায় কুশনারের স্লাইডে লেখা ছিল যেসব হামাস সদস্য সহযোগিতা করবে এবং অস্ত্র সমর্পণ করবে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে। তাদের সাধারণ ক্ষমা বা ‘নিরাপদ প্রস্থানের’ সুযোগ দেওয়া হবে। কাউকে কাউকে কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে নতুন পুলিশ বাহিনীতে নেওয়া হতে পারে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বা পিএ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস শান্তি পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও গাজা শাসনে পিএর কেন্দ্রীয় ভূমিকা দাবি করেছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত