leadT1ad

নির্বাচন আচরণবিধি: কী করা যাবে, কী যাবে না

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ১৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২জানুয়ারি) থেকে সব দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন।

প্রচারের নির্ধারিত সময় শুরুর আগেই জনসংযোগ ও প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগে অনেক প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয় কমিশন। এর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বা স্বতন্ত্র প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন তাহেরীও রয়েছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে ভোট চাওয়ার অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আগাম নির্বাচনী প্রচারে জনসভা করার অভিযোগে শোকজ করা হয়। নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি মানাতে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি’অনুসরণ করতে চায়।

২২ তারিখ শুরু হওয়া ভোটের প্রচার চালানো যাবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোট।

নির্বাচনের বিধি অনুযায়ী প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই শুধু আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করা যাবে এবং তা ভোট শুরুর ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে থামিয়ে দিতে হবে। এমনকি নির্বাচনের পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রার্থীদের নিজ দায়িত্বে পোস্টার ও ব্যানার সরানোর নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।

প্রার্থীরা যা করতে পারবেন

প্রার্থীরা তাদের প্রচারে পোস্টার ও লিফলেট অবশ্যই সাদা-কালো হতে হবে, রঙিন পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। পোস্টারের আকার ১৮ ইঞ্চি×২৪ ইঞ্চির মধ্যে এবং লিফলেট বা হ্যান্ডবিলের আকার এ-ফোর সাইজের মধ্যে হতে হবে। পোস্টার বা ব্যানার রশি দিয়ে ঝোলাতে হবে। কোনোভাবেই দেওয়াল, গাছ, বেড়া বা কোনো স্থাপনায় আঠা দিয়ে লাগানো যাবে না।

পোস্টারে দলীয় নেতার ছবি থাকবে কী?

পোস্টারে প্রার্থীর নিজের ছবি এবং প্রতীক ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। তবে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করা যাবে। কোনো অনুষ্ঠানে বা মিছিলের ছবি বা ‘অ্যাকশন ফটো’ব্যবহার নিষিদ্ধ।

প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে সুবিধার্থে ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন। প্রতিটি ইউনিয়ন বা পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে। একাধিক ক্যাম্প বা কেন্দ্রীয় ক্যাম্পের নামে অতিরিক্ত অফিস খোলা যাবে না। ক্যাম্পে ভোটারদের বসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, তবে সেখানে কোনো ভোজ বা আপ্যায়নের আয়োজন নিষিদ্ধ।

কেমন হবে পথসভা?

প্রার্থীরা জনসভা, পথসভা বা ঘরোয়া বৈঠক করতে পারবেন। সভার স্থান ও সময় সম্পর্কে অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানাতে হবে এবং অনুমতি নিতে হবে। প্রচারের ক্ষেত্রে সব প্রার্থী সমান অধিকার পাবেন। প্রতিপক্ষের সভায় বাধা দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। জনগণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এমন কোনো ব্যস্ত সড়ক বা স্থানে সভা করা যাবে না।

মাইক ব্যবহার করা যাবে কি?

প্রচারণায় মাইক ব্যবহার করা যাবে, তবে তা সীমিত সময়ের জন্য। বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে। শব্দদূষণ রোধে মাইকের শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবলের নিচে রাখতে হবে।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের এই নতুন বিধিমালায় ডিজিটাল প্রচারণাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাতে পারবেন, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ এবং গুজবমুক্ত।

যা করতে পারবেন না

কোনো দেওয়াল, দালান, বেড়া বা গাছে চুনকাম, কালি বা রং দিয়ে কোনো কিছু লেখা বা আঁকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্বাচনের প্রচারে অংশ হিসেবে কোনো গেট বা তোরণ নির্মাণ করা যাবে না। রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, এমনব কোনো প্যান্ডেল তৈরি করা যাবে না। কোনো প্রকার আলোকসজ্জা করা যাবে না।

নির্বাচনী প্রচারে কোনো মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বা শোডাউন করা যাবে না। বাস, ট্রাক, ট্রেন বা যান্ত্রিক নৌযানে করে মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না। দলীয় প্রধান ব্যতীত অন্য কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তি হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা গেলেও হেলিকপ্টার থেকে লিফলেট বা ব্যানার ফেলা যাবে না।

নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো প্রার্থী নিজ নির্বাচনী এলাকার কোনো প্রতিষ্ঠানে চাঁদা বা অনুদান দিতে পারবেন না এবং অনুদানের অঙ্গীকারও করতে পারবেন না। কোনো প্রার্থী সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে কোনো প্রকল্পের অনুমোদন বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারবেন না।

প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো কুৎসা রটানো, অশালীন বা আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া যাবে না। লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো বক্তব্য বা কাজ করা যাবে না। মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডায় কোনো নির্বাচনী প্রচার চালানো যাবে না।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কোনো ভুয়া ভিডিও (ডিপফেক), অডিও বা কন্টেন্ট তৈরি করা নিষিদ্ধ। ইন্টারনেটে কোনো মিথ্যা তথ্য, গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো যাবে না। অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘বট’ ব্যবহার করে প্রচার-প্রচারণা চালানো যাবে না।

প্রতীক হিসেবে কোনো জীবন্ত প্রাণী (যেমন- ঘোড়া, ঈগল ইত্যাদি) সঙ্গে নিয়ে মিছিল করা যাবে না এবং প্রচারে ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনী ক্যাম্পে বা জনসভায় ভোটারদের কোনো কোমল পানীয়, খাবার বা উপহার দেওয়া যাবে না। কোনো বিলবোর্ড স্থাপন করা যাবে না, তবে দলীয় কার্যালয়ে নির্দিষ্ট আকারের সাইনবোর্ড থাকতে পারে। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে কোনো প্রার্থী বা তাঁর এজেন্ট বা কর্মী বেআইনিভাবে প্রবেশ করতে বা জটলা পাকাতে পারবেন না।

কত টাকা খরচ করতে পারবেন?

গেজেটে নির্বাচনী ব্যয়ের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা দল নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা নির্ধারিত হয় ভোটারপ্রতি ১০ টাকা অথবা থোক বরাদ্দ হিসেবে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই অঙ্কের ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নির্বাচনী এলাকায় যদি মোট ভোটার ৪ লাখ হয়, তবে ১০ টাকা হারে হিসাব করলে অঙ্কটি দাঁড়ায় ৪০ লাখ টাকা; যা ২৫ লাখের চেয়ে বেশি হওয়ায় ওই প্রার্থীর ব্যয়সীমা হবে ৪০ লাখ টাকা। আবার, কোনো আসনে যদি ভোটার সংখ্যা দেড় লাখ হয়, সেক্ষেত্রে ১০ টাকা হারে খরচ আসে ১৫ লাখ টাকা; কিন্তু আইনের শর্ত অনুযায়ী যেহেতু ২৫ লাখ টাকা অংকটি উচ্চতর, তাই ওই প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্ধারিত হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারব্যয়ের একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা। এই খরচ অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হতে হবে এবং নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিদেশি কোনো অর্থায়নে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা চালানো যাবে না।

নির্বাচনী ইশতেহার ও গণমাধ্যম

বিধি ২৪ অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দের পর রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে পারবেন। এই ইশতেহার পাঠ ও ঘোষণার সময় পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। বিধি ২৫ অনুযায়ী, গণমাধ্যমে নির্বাচনী সংলাপে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী বা প্রতিনিধিরা ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারবেন না।

নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম ও প্রতিকার কে করবে

নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো অনিয়ম হলে বা আচরণ বিধি লঙ্ঘিত হলে যে কেউ নির্বাচন কমিশন বা রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশন নির্বাচনী তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করবে। তবে রিটার্নিং অফিসার বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারবেন।

লঙ্ঘনের শাস্তি কি?

বিধি ২৭ অনুযায়ী এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৬ (ছয়) মাসের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। কোনো রাজনৈতিক দল আচরণ বিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।

সবচেয়ে কঠোর শাস্তি হলো প্রার্থিতা বাতিল। বিধি ২৮ অনুযায়ী, কমিশন যদি তদন্তে নিশ্চিত হয় যে কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কেউ গুরুতর আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছেন এবং তিনি নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছেন, তবে কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করে ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৯১ ই অনুযায়ী এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত