leadT1ad

তেলের নেশায় রেজিম চেঞ্জ: মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাতিন আমেরিকা

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৩০
ট্রাম্প ১৮২৩ সালের মনরো মতবাদকে নতুন করে ‘ডনরো মতবাদ’ নামে উপস্থাপন করেন। এআই জেনারেটেড ছবি

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রেজিম চেঞ্জ ও তেলের সম্পর্ক বহুদিনের। রেজিম চেঞ্জ বলতে কোনো সরকারকে উৎখাত বা অপসারণ করা বোঝায়। এ কাজে প্রায়ই বাইরের শক্তি জড়িত থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

সমালোচকদের মতে, তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে হস্তক্ষেপের পেছনে বড় কারণ হলো জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ। এই হস্তক্ষেপকে সাধারণত গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নিরাপত্তা বা সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে পশ্চিমা কোম্পানির স্বার্থও এতে জড়িত থাকে।

এখানেই তৈরি হয় পশ্চিমাদের এক উভয় সংকট ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। হস্তক্ষেপ করলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকিও থাকে। আবার হস্তক্ষেপ না করলে গুরুত্বপূর্ণ তেলসম্পদ শত্রু বা অস্থিতিশীল সরকারের হাতে চলে যেতে পারে।

শুরুতে তেলকে সাধারণত মূল কারণ হিসেবে বলা হয় না। তেল প্রসঙ্গ আসে পরে। পুনর্গঠন চুক্তি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা বহুজাতিক কোম্পানির সুবিধাজনক চুক্তির মাধ্যমে তা সামনে আসে। ইতিহাস বলে, স্বল্পমেয়াদি লাভের পর দীর্ঘ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পশ্চিমবিরোধী ক্ষোভ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রতিক্রিয়া পশ্চিমাদের দিকেই ফিরে আসে। এর কিছু ঐতিহাসিক উদাহরণও আছে।

ইরান: ১৯৫৩

ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক তেল কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করেন। এতে ব্রিটেন ও পশ্চিমাদের তেল নিয়ন্ত্রণ হুমকির মুখে পড়ে। সিআইএ ও এমআই৬ একটি অভ্যুত্থান ঘটায়। মোসাদ্দেককে অপসারণ করা হয়। শাহকে ক্ষমতায় ফেরানো হয়।

সরকারিভাবে বলা হয়, সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানোই লক্ষ্য। কিন্তু পরে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, তেল ছিল মূল কারণ। এই অভ্যুত্থান পশ্চিমাদের তেল স্বার্থ রক্ষা করেছিল। তবে এর ফলেই ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের বীজ বপন হয়।

ইরাক: ২০০৩

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে হামলা হয়। সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। অজুহাত ছিল গণবিধ্বংসী অস্ত্র ও সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র। পরে এসব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

যুদ্ধের পর ইরাকের তেলখাত নতুন আইনে সাজানো হয়। বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলে দেওয়া হয়। হ্যালিবার্টনের মতো পশ্চিমা কোম্পানি বড় চুক্তি পায়। এভাবে ইরাকের বিশাল তেলভাণ্ডারের ওপর প্রভাব নিশ্চিত করা হয়।

লিবিয়া: ২০১১

আরব বসন্তের সময় ন্যাটো হস্তক্ষেপ করে। বেসামরিক মানুষ রক্ষার কথা বলা হয়। মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাত ও হত্যা করা হয়।

পশ্চিমা কোম্পানিগুলো আবার প্রভাব ফিরে পায়। কিন্তু লিবিয়ার তেল উৎপাদন পরে মিলিশিয়াদের কারণে ভেঙে পড়ে। দেশটি গৃহযুদ্ধে ডুবে যায়। স্থায়ী স্থিতিশীলতা আর আসেনি।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্য ভাগ করার ক্ষেত্রেও তেল বড় ভূমিকা রেখেছিল। সাইকস-পিকো চুক্তিতে সীমান্ত টানা হয়েছিল তেলের মানচিত্র দেখে। ইরাকের মতো নতুন রাষ্ট্রে ব্রিটিশ কোম্পানির আধিপত্য ছিল।

ভেনেজুয়েলা: ২০২৬

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই ধারা আবার সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দেয় অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ এর। ৩ জানুয়ারি মার্কিন বিশেষ বাহিনী কারাকাসে অভিযান চালায়।

প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়। তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ করা হয় মাদক ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, আমেরিকান কোম্পানি ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠন করবে। দেশ চালাতেও তারা সহায়তা করবে।

তিনি ‘ডনরো মতবাদ’-এর কথা বলেন। এটি মনরো মতবাদের ট্রাম্পীয় রূপ। এর অর্থ, আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখা।

ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভাণ্ডার রয়েছে। পরিমাণ তিনশ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতির কারণে উৎপাদন কমে গেছে।

এই অভিযানে বিমান হামলা ও অবরোধও ছিল। এটিকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে দেখানো হয়। মাদুরো সরকারকে অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলা হয়।

বিশ্ব প্রতিক্রিয়া বিভক্ত। অনেকে একে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলেছেন। অন্যরা একে মাদুরোর দমনমূলক শাসনের অবসান হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকেরা অতীতের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন। শাসন পরিবর্তনের পর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ—এই পুরনো ধারা আবার দেখা যাচ্ছে।

স্থায়ী দ্বিধা-দ্বন্দ্ব

পশ্চিমা শক্তিগুলো এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে। স্বৈরশাসিত তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে ফেলতে পারে। তাই হস্তক্ষেপের লোভ তৈরি হয়।

কিন্তু জোরপূর্বক শাসন পরিবর্তন জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী। এর ফলে বিদ্রোহ, ক্ষমতার শূন্যতা ও নতুন সংকট তৈরি হয়।

সমর্থকেরা বলেন, এসব অভিযান স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা আনে। সমালোচকেরা বলেন, তেল ও কৌশলগত স্বার্থই আসল চালিকা শক্তি। এতে কোম্পানির লাভ হয়। কিন্তু মানুষের জীবন ও বিশ্বাসের ক্ষতি হয়।

ভেনেজুয়েলায় অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। এটি শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে নয় বরং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত। তিনি প্রকাশ্যে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছেন।

ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখন বড় প্রশ্ন। এই হস্তক্ষেপ কি স্থিতিশীলতা আনবে? নাকি আরেকটি দীর্ঘ সংকট তৈরি করবে?

ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। তেল নিরাপত্তার নামে শাসন পরিবর্তন বারবার একই চক্রে ফিরে আসে।

ট্রাম্পের নজরে এরপর কোন দেশ

ভেনেজুয়েলায় অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। এটি শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে নয় বরং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত। তিনি প্রকাশ্যে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছেন।

ট্রাম্প ১৮২৩ সালের মনরো মতবাদ নতুন করে তুলে ধরেন। তিনি একে ‘ডনরো মতবাদ’ নামে উপস্থাপন করেন। এর মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের দাবি জোরালো করা হয়।

এরপরই অন্য দেশগুলোর প্রতি হুমকি ও কড়া বক্তব্য শুরু হয়। অনেক দেশ এখন ওয়াশিংটনের দিকে উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে আছে।

ভেনেজুয়েলার পর একাধিক দেশ এখন ট্রাম্পের নজরে। এই তালিকায় রয়েছে কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, গ্রিনল্যান্ড ও ইরান।

কিউবা

কিউবা বহুদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে। ভেনেজুয়েলার তেলে দেশটির অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় কিউবা বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।

ট্রাম্প বলেন, কিউবার আর আয়ের উৎস নেই। তিনি ইঙ্গিত দেন, দেশটি দুর্বল হয়ে পড়ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীও কিউবা সরকারকে সতর্ক বার্তা দেন।

কলম্বিয়া

ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর ট্রাম্প কলম্বিয়াকে টার্গেট করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে প্রকাশ্যে অপমান করেন।

কলম্বিয়া তেল ও খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। এটি মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও।

যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, সেখানে সামরিক অভিযানও হতে পারে।

মেক্সিকো

মেক্সিকো সীমান্ত ছিল ট্রাম্পের রাজনীতির বড় ইস্যু। তিনি মাদক ও অবৈধ অভিবাসনের জন্য মেক্সিকোকে দায়ী করেন।

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ চালিয়ে দেশটির প্রেসিডন্টে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ চালিয়ে দেশটির প্রেসিডন্টে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ট্রাম্প বলেন, মাদক ঢল নেমেছে। মাদক কার্টেল দমনে ‘কিছু করা হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন। মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রস্তাব মেক্সিকো সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে।

গ্রিনল্যান্ড

ট্রাম্প সম্প্রতি আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি একে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলেন।

গ্রিনল্যান্ড খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ। এটির কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সরকার এই দাবি স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে। এ ধরনের চেষ্টা ন্যাটোর সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

ইরান

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নজরে রাখছে। ইরান আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু। ২০২৬ সালেও নতুন হামলার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য ও পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকেই একে আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।

বিষয়:

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত