নতুন প্রজন্ম কেন কথায় কথায় গালি দিচ্ছে

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আড্ডা, বিনোদন, এমনকি রাজনীতির মঞ্চেও দেখা যাচ্ছে—কাউকে যুক্তিতে পরাস্ত করার চেয়ে তাকে ‘রোস্ট’ করা বেশি জনপ্রিয়। কঠোর সমালোচনা আর ব্যক্তিগত অপমানের সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই শুধু নতুন ধরনের হাস্যরস শিখছি, নাকি অজান্তেই এমন একটি ভাষার সংস্কৃতি তৈরি করছি, যেখানে যুক্তির জায়গা দখল করছে অপমান, আর গালির তীব্রতাই হয়ে উঠছে জনপ্রিয়তার নতুন মাপকাঠি?

আগে রাগ হলে মানুষ বালিশে মুখ গুঁজে থাকত, দরজা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করত, বড়জোর বলত—‘সময় সবকিছুর জবাব দেবে।’ এখনকার প্রজন্ম অস্থির, তাৎক্ষণিক ও উত্তেজিত। তাই তাদের রাগও ইনস্ট্যান্ট, রাগের প্রতিক্রিয়া ততোধিক ইনস্ট্যান্ট; অপেক্ষার সময় নেই, অভিমান জমিয়ে রাখার সময় নেই। এখন সমাজের অসঙ্গতিতে কারও রাগ উঠল, মোবাইল বের হলো, ফ্রন্ট ক্যামেরা অন হলো। দুই মিনিটের মধ্যেই পৃথিবী জেনে গেল—কে কত বড় অন্যায় করেছে এবং তাকে কোন কোন অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায়!

তবে এই গালিগালাজকে শুধু ভাষার অবক্ষয় বললে ভুল হবে। রাগী এই প্রজন্ম কাকে গালি দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে, আর গালি দিয়েই বা এত স্বস্তি পাচ্ছে কেন—তার উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে তাদের ভবিষ্যৎ, হতাশা, ক্ষমতার সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্ক এবং রাজনীতির দিকে।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে প্রকাশ্য বক্তৃতা ও রাজনৈতিক স্লোগানে অশালীন ভাষার ব্যবহার যে ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, তার উদাহরণও কম নয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক স্লোগান ও আন্দোলনের ভাষায় গত কয়েক বছরে নারীর শরীর ও যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক কটূক্তি এবং অপমানসূচক শব্দের ব্যবহারও প্রকাশ্যে এসেছে, যা নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা রাজনৈতিক ভাষার ক্রমবর্ধমান অশালীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদেও একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের একটি অংশকে স্পিকার ‘অরুচিকর ও অশ্লীল’ বিবেচনা করে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এসব ঘটনা দেখায়, রাজনৈতিক বিরোধিতা প্রকাশের ভাষা ক্রমশ যুক্তি, ব্যঙ্গ ও কঠোর সমালোচনা থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত অপমান, স্ল্যাং এবং অশালীনতার দিকে এগোচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালিগালাজ করে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তারের ঘটনাটি কেবল একজন তরুণের ভাষা ব্যবহারের প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের সময়ের একটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করলেই এখন রাগ, ক্ষোভ, ব্যঙ্গ, স্ল্যাং ও গালির এক নতুন ভাষার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকাশভঙ্গিতে ভদ্রতার পুরোনো অভিধান যেন দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হলো, তরুণরা হঠাৎ এত রাগান্বিত কেন? আর সেই রাগের ভাষা ক্রমশ এত অশ্রাব্য হয়ে উঠছে কেন?

লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারার মতে, মনের জমে থাকা ক্ষোভ থেকে গালি বেরিয়ে আসে; এতে সাময়িকভাবে রাগ-কষ্টের উপশম ঘটতে পারে। তবে গালাগালির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অপর পক্ষকে আঘাত, অপমান ও ছোট করা। (সূত্র: মানুষের আচরণ—গালিগালাজের শব্দ চয়নের মনস্তত্ত্ব, প্রথম আলো, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১)

সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন ‘অ্যাবিউসিব ল্যাঙ্গুয়েজ’-এর সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন। একই সময়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালাগালি ও আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে আইন তৈরির উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ।

বাংলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেট স্পিচ, অপমানজনক মন্তব্য ও অনলাইন হয়রানির বিস্তার নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের হাজার হাজার বাংলা মন্তব্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা রাজনৈতিক হেট স্পিচ, বুলিং, থ্রেট ও ট্রলিং-এর মতো আক্রমণাত্মক ভাষার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। ফলে গালাগালির বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত রুচির প্রশ্ন নয়; এটি এখন সামাজিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গেও যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ক্ষোভ কোনো একটি দেশের একক ঘটনা নয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ছাত্র ও তরুণদের মধ্যে রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অসন্তোষ দৃশ্যমান। কোথাও তা রাজপথে বিস্ফোরিত হয়েছে, কোথাও ডিজিটাল পরিসরে। রাষ্ট্রীয় দমন, বৈষম্য, দুর্নীতি, বেকারত্ব, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট—প্রতিটি কারণের প্রকাশ ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় মিল আছে: তরুণদের একটি অংশ আর আগের ভাষায় কথা বলতে চাইছে না।

গালিগালাজকে শুধু ভাষার অবক্ষয় বললে ভুল হবে। রাগী এই প্রজন্ম কাকে গালি দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে, আর গালি দিয়েই বা এত স্বস্তি পাচ্ছে কেন—তার উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে তাদের ভবিষ্যৎ, হতাশা, ক্ষমতার সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্ক এবং রাজনীতির দিকে।

আমাদের সমাজে বয়স ও পদমর্যাদার সঙ্গে শ্রদ্ধার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বড়দের কথা মানতে হবে, রাষ্ট্রপ্রধানকে নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দেখতে হবে, শিক্ষক-অভিভাবক কিংবা ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করারও একটি সামাজিক সীমা থাকবে—এমন ধারণাই দীর্ঘদিনের। কিন্তু নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ এই সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখছে। তাদের কাছে বয়স বা পদমর্যাদা সম্মানের স্বয়ংক্রিয় লাইসেন্স নয়। সম্মান অর্জন করতে হয় আচরণ, জবাবদিহি ও নৈতিকতার মাধ্যমে। ফলে পুরোনো প্রজন্ম যেখানে অশ্রদ্ধা দেখছে, নতুন প্রজন্মের একটি অংশ সেখানে দেখছে ক্ষমতার সঙ্গে সমান চোখে কথা বলার অধিকার।

তবে এই পরিবর্তনকে শুধু প্রজন্মের অভদ্রতা বলে ব্যাখ্যা করলে মূল সমস্যাটি আড়াল করা হবে। মানুষ সাধারণত তখনই ভাষার সীমা অতিক্রম করে, যখন তার মনে হয় প্রচলিত ভাষা আর কাজ করছে না। আবেদন করেছি, লাভ হয়নি; অভিযোগ করেছি, কেউ শোনেনি; যুক্তি দিয়েছি, উত্তর পাইনি—এই অভিজ্ঞতা যখন জমতে থাকে, তখন ভদ্র ভাষার ওপর আস্থা কমতে শুরু করে। ভাষা তখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না, তা হয়ে ওঠে আঘাত করার মাধ্যম। গালি সেখানে অনেক সময় যুক্তির বিকল্প নয়, বরং অসহায়ত্বের বিকৃত ভাষাগত বহিঃপ্রকাশ।

গালির এই সমষ্টিগত ভাষা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ভদ্র, ধীর ও জটিল যুক্তির চেয়ে অনেক সময় উত্তেজনা, সংঘর্ষ এবং তীব্র আবেগকে বেশি দৃশ্যমান করে তোলে। একটি দীর্ঘ যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের চেয়ে একটি অশালীন বাক্য, তীব্র ব্যঙ্গ বা গালিভরা ভিডিও দ্রুত মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে রাগ শুধু প্রকাশিত হয় না, সেটি ডিজিটাল অর্থনীতির অংশও হয়ে যায়। বেশি রাগ, বেশি প্রতিক্রিয়া; বেশি প্রতিক্রিয়া, বেশি দৃশ্যমানতা; আর বেশি দৃশ্যমানতা মানে বেশি সামাজিক প্রভাব।

রাগের ভাষা যদি ক্রমাগত নিষ্ঠুর হয়, তাহলে ভালোবাসার ভাষাও একসময় তার কোমলতা হারায়। বিদ্রোহের ভাষা যে সব সময় অশ্রাব্য হতে হবে, তা নয়। আমাদের প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। সব রাগকে গালিতে নামিয়ে আনা যেমন ভাষার দারিদ্র্য, তেমনি সব প্রতিবাদকে ভদ্রতার খাঁচায় বন্দী করাও ক্ষমতার সুবিধা। প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন ভাষা তৈরি করতে পারি, যা ক্ষমতার বিরুদ্ধে যথেষ্ট তীক্ষ্ণ, কিন্তু মানুষের সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে অকারণে নিষ্ঠুর করে না?

এখানেই গালির রাজনৈতিক অর্থনীতি রয়েছে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সব মানুষের সমান সুযোগ নেই। সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতায় লেখার সুযোগ সবার নেই, টেলিভিশনের টকশোতে যাওয়ার সুযোগও নেই। রাজনৈতিক দলের কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ, সংগঠন তৈরি কিংবা দীর্ঘ আন্দোলন পরিচালনার জন্য অর্থ ও প্রভাব প্রয়োজন। কিন্তু একটি মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে যে কেউ একটি ভিডিও করে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে। গালি তাই এক অর্থে ক্ষমতাহীন মানুষের সবচেয়ে সস্তা রাজনৈতিক অস্ত্র।

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতাকে প্রজন্মগত সংঘাত ও আপেক্ষিক বঞ্চনা তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি প্রজন্ম যখন দেখে যে তাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রত্যাশার তুলনায় সমাজে সুযোগ, মর্যাদা বা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কম, তখন তাদের মধ্যে বঞ্চনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। এই ক্ষোভ সব সময় সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রকাশের সুযোগ পায় না; ফলে তা বিকল্প সাংস্কৃতিক ভাষা খুঁজে নেয়—স্ল্যাং, ব্যঙ্গ, মিম কিংবা গালি তারই অংশ।

ব্যক্তি আক্রমণ, অপমান, হুমকি এবং সহিংসতার ভাষা কখনোই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু গালির নিন্দা করতে গিয়ে যদি আমরা শুধু ভাষাটিকেই দেখি এবং সেই ভাষার পেছনের সামাজিক বাস্তবতাকে না দেখি, তাহলে সমস্যার অর্ধেকও বুঝব না। একটি সমাজে কেন এত মানুষ রাগান্বিত—এই প্রশ্নটি গালি দেওয়া ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার প্রশ্নের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

এখনকার তরুণ প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৃথিবীর নানা প্রান্তের জীবন ও সুযোগ দেখতে পাচ্ছে। সে জানছে তার অধিকার কী হতে পারত। আবার একই সময়ে নিজের জীবনে দেখতে পাচ্ছে সীমিত সুযোগ ও অনিশ্চয়তা। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই ব্যবধান থেকেই তৈরি হয় বঞ্চনার অনুভূতি। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত ভয় এবং ক্ষমতার সম্পর্কের জায়গায়। একসময় রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক নেতা কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ক্ষেত্রেই মানুষের ভেতরে একটি স্বাভাবিক ভয় কাজ করত। এখন ডিজিটাল প্রজন্ম ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছে। তারা মন্তব্য করছে, ব্যঙ্গ করছে, মিম বানাচ্ছে, ভিডিও করছে। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার প্রতীকী দূরত্ব কমে গেছে। যে নেতাকে একসময় শুধু টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যেত, তাকে এখন মানুষ ফেসবুকের মন্তব্যের ঘরে নিয়ে এসেছে।

গালির এই সমষ্টিগত ভাষা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ভদ্র, ধীর ও জটিল যুক্তির চেয়ে অনেক সময় উত্তেজনা, সংঘর্ষ এবং তীব্র আবেগকে বেশি দৃশ্যমান করে তোলে।

তাই বর্তমানের গালির রাজনীতিকে কেবল ভাষার অবক্ষয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি এক ধরনের সামাজিক সংকেত। ভাষা যখন ক্রমশ আক্রমণাত্মক হয়, তখন বুঝতে হবে সমাজের কোথাও না কোথাও ক্ষোভ জমছে। সেই ক্ষোভের কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব, প্রজন্মগত সংঘাত কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতা।

গালাগালি করার অধিকারকে যদি কেউ বাকস্বাধীনতা বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে তাঁকে একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে—বাক সংযমও একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য শর্ত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই ভাষাগত উচ্ছৃঙ্খলতার লাইসেন্স নয়। সমালোচনা আর গালাগালি এক জিনিস নয়; প্রতিবাদ আর ব্যক্তিগত অপমানও এক নয়।

বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে উদ্বেগজনকভাবে গালি, কুরুচিপূর্ণ শব্দ এবং স্ল্যাং ব্যবহারের একটি স্বাভাবিকীকরণ চলছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে তাকে অপমান করা যেন এখন অনেকের কাছে সাহসিকতা। কোনো স্বৈরাচারী, একদলীয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকারের প্রধানকে গালি দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে গণতান্ত্রিক প্রমাণ করা যায় না। বরং আরও ভয়ংকর বিষয় হলো—যাঁরা কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাঁদের অনেকেই ভিন্নমত শুনতে অক্ষম হয়ে পড়েন; সমালোচনার জবাবে যুক্তির পরিবর্তে গালি দেন, প্রশ্নকারীর চরিত্রহনন করেন এবং নিজের মতের বিরোধিতাকে শত্রুতা হিসেবে দেখেন।

এ এক ভয়াবহ আত্মবিরোধিতা। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যদি ভাষা, আচরণ ও মানসিকতায় নিজেই স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে হয়, তবে সেটি মুক্তির রাজনীতি নয়—ক্ষমতার চরিত্র বদলানোর অপেক্ষা মাত্র। আকাশের দিকে থুতু ছুড়ে যেমন শেষ পর্যন্ত নিজের মুখই ভেজে, তেমনি গালির সংস্কৃতিকে বৈধতা দিতে দিতে সমাজ একসময় নিজেই তার শিকার হয়।

তরুণদের এই গালি সংস্কৃতিকে নিছক ‘স্বাভাবিক প্রজন্মগত পরিবর্তন’ বলে উদ্যাপন করার সুযোগ নেই। নৃবিজ্ঞানের ভাষায়, একটি প্রজন্ম যখন তার নিজস্ব পরিচয় নির্মাণের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচলিত শিষ্টাচারকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন তা প্রথমে ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মনে হলেও ধীরে ধীরে সেই প্রত্যাখ্যানই নতুন সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই—আজ যে গালি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, কাল সেটিই বন্ধু, পরিবার, নারী, দুর্বল বা ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে দৈনন্দিন সহিংসতার ভাষা হয়ে উঠতে পারে। ক্ষোভের অধিকার অবশ্যই আছে, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের নামে ভাষাকে যদি আমরা ক্রমাগত নিষ্ঠুর করে তুলি, তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা ক্ষমতাকে নয়, নিজেদের সামাজিক সম্পর্ককেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করি।

সম্ভবত এ সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—তরুণরা কেন গালি দিচ্ছে। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, তারা কেন মনে করছে গালি না দিলে তাদের ক্ষোভের তীব্রতা বোঝানো যাবে না? এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে আমরা যদি শুধু শব্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, তবে যে বাস্তবতা থেকে সেই শব্দ জন্ম নিচ্ছে, তাকে অক্ষত রেখেই দেব।

তাই বলে গালিকে সমর্থন করা যায় না, করা উচিতও নয়। কিন্তু গালিদাতার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভকেও অস্বীকার করা যায় না। গালাগালির কোলাহলে একটু কান পাতুন—হয়তো সেখানে শুনবেন ক্ষমতাহীন মানুষের রাগ, বঞ্চিত মানুষের অভিমান, উপেক্ষিত মানুষের শেষ চিৎকার। হ্যাঁ, অক্ষমের ভাষা হলো গালি। সমাজের দায়িত্ব তাই শুধু গালি থামানো নয়; বরং এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষকে মানুষ গালি দেবে না। গালিবাজ নতুন প্রজন্মকে আমরা রাগ করে হয়তো ‘অস্বীকার’ করতে পারি, কিন্তু ‘উপেক্ষা’ করতে পারি না। গালাগালিতে লিপ্ত ‘অক্ষম’ মানুষদের যদি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ‘সক্ষম’ করি, তবেই হয়তো গালি বন্ধ হতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত