কাস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকী

ফিদেল ও কিউবা: ভালোবাসার চোখে আর শত্রুর দৃষ্টিতে

লেখা:
লেখা:
এদুয়ার্দো গালেয়ানো

সংগৃহীত ছবি।

ফিদেল কাস্ত্রোর শত্রুরা দাবি করে, কাস্ত্রো ছিলেন মুকুটহীন রাজা। তারা বলেন, কাস্ত্রো ঐক্য আর অন্ধ আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য করতে পারতেন না। এই দাবি হয়তো ঠিক।

কাস্ত্রোর শত্রুদের কেউ বা বলে, নেপোলিয়নের যদি কিউবার সরকারি পত্রিকা ‘গ্রানমা’র মতো পত্রিকা থাকত, তবে কোনো ফরাসি ওয়াটারলুর যুদ্ধে পরাজয়ের খবর জানতে পারত না। এই কথাও হয়তো ঠিক।

তাঁর শত্রুরা বলে, কাস্ত্রো কথা বলতেন বেশি, আর শুনতেন কম। আর তাই নাকি ছিল তাঁর ক্ষমতায় থাকার মন্ত্র। মানুষের কথার চেয়ে নিজের কথার প্রতিধ্বনি শুনতেই বেশি অভ্যস্ত ছিলেন কাস্ত্রো। কী জানি! শত্রুদের এই দাবিও হয়তো সত্য।

কিন্তু কাস্ত্রোর এই শত্রুরা কিছু কথা চেপে যায়। তারা বলে না যে কেবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা পেতে কাস্ত্রো বুলেটের সামনে বুক পেতে দেননি।

তিনি ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন সমানে সমান হয়ে, বুক চিতিয়ে। তাঁকে ৬৩৭ বার হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। প্রতিবার তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন। তাঁর অদম্য জীবনীশক্তি একটি উপনিবেশকে স্বাধীন দেশে পরিণত করায় মূল ভূমিকা রেখেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ১০ জন প্রেসিডেন্ট কিউবাকে গিলে খেতে চেয়েছিলেন। তাঁরা ছুরি-চামচ হাতে তৈরি ছিলেন রীতিমতো। কোনো জাদুমন্ত্র বা ঈশ্বরের অলৌকিক ক্ষমতায় নয়, নিজেদের জোরেই কিউবা ওই ১০ প্রেসিডেন্টের আমল পার করে টিকে রয়েছে।

দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিদের পা চেটে চলার বা দাসত্ব করার অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলে। কাস্ত্রোর শত্রুরা কখনো এই কথা মুখে আনে না যে কিউবা কখনোই তাতে অংশ নেয়নি। মাথা নত না করার দিক থেকে কিউবা সত্যিই পৃথিবীতে বিরল দেশ।

কিউবার বিপ্লবের অপরাধ একটাই। তারা নিজেদের আত্মমর্যাদা ধরে রাখতে কোনো আপস করে না। আর এ জন্যই তাদের পদে পদে শাস্তি পেতে হয়।

কিউবা ঠিক যেমন রাষ্ট্র হতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তেমন হতে পারেনি। কিন্তু শত্রুরা এ কথা স্বীকার করে না যে চারপাশের কঠিন বাস্তবতায় কিউবা ঠিক ততটুকুই এগোতে পেরেছে, যতটুকু তাদের এগোতে দেওয়া হয়েছে।

কিউবা যা চেয়েছিল আর বাস্তবে যা পেয়েছে, এই দুয়ের মাঝে এক দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। শত্রুরা বলে না যে আমেরিকার দেওয়া দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণেই এই দেয়াল এত উঁচু হয়েছে। এই অবরোধ কিউবার নিজস্ব গণতন্ত্রের গলা চেপে ধরেছে। গোটা সমাজকে পরিণত করেছে সেনাছাউনিতে। এর ফলে এমন আমলাতন্ত্রের জন্ম হয়েছে, যারা সমাধানের বদলে সমস্যা তৈরি করতেই বেশি ওস্তাদ। আর নিজেদের এই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তারা ওই অবরোধকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

কাস্ত্রোর শত্রুরা স্বীকার করতে চায় না যে এত দুঃখ-কষ্ট, বাইরের আক্রমণ আর ভেতরের কড়াকড়ির পরও কিউবাই লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে কম বৈষম্যপূর্ণ সমাজের জন্ম দিয়েছে।

তাঁর শত্রুরাও স্বীকার করে, কাস্ত্রোর এত সব অর্জন সম্ভব হয়েছে কিউবান মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। সাধারণ মানুষ এক বীর যোদ্ধার জেদি ইচ্ছাশক্তিকে নিজেদের স্বপ্ন বানিয়েছিল। কাস্ত্রো সব সময় পরাজিতদের পক্ষে লড়াই করেছেন, ঠিক যেমনটা করেছিলেন ক্যাস্টিলের মাঠের সেই দন কিহোতে।

এদুয়ার্দো গালেয়ানো (১৯৪০-২০১৫), উরুগুয়ের সাংবাদিক, লেখক ঔপন্যাসিক। তাঁকে ‘লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সাহিত্যের নক্ষত্র’ এবং ‘বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত