ad

বাংলা ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের সম্ভাবনা

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২১: ৪৫
বাংলা ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের সম্ভাবনা। স্ট্রিম গ্রাফিক

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তা মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের অন্যতম প্রধান সূত্রও। ভাষাপ্রয়োগের মধ্যে ব্যক্তিমানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান ও পরিচয় নিহিত থাকে। ব্যক্তির কথাবলার ভঙ্গি, শব্দব্যবহারের প্রকৃতি, ধ্বনি-উচ্চারণের প্রবণতা, বাক্যনির্মাণের স্বতন্ত্রতা, ব্যক্তিত্বের ছাপ প্রভৃতি সবই ভাষায় বিদ্যমান থাকে। ভাষা-গবেষণায় তাই প্রশ্ন ওঠে যে, ভাষিক উপাদানের মাধ্যমে ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব কি না? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে উদ্ভব ও বিকশিত হয়েছে ভাষাবিজ্ঞানের স্বতন্ত্র শাখা ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান।

প্রথাগত ফরেনসিক বিজ্ঞানে যেখানে আঙুলের ছাপ, রক্তের নমুনা, ডিএনএ, নখ, চুল, লালা কিংবা শারীরিক অন্যান্য প্রমাণ অপরাধ শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়, সেখানে ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান ভাষার বিভিন্ন উপাদানকে বিশ্লেষণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করে। ভাষাব্যবহারের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী অপরাধীর ভাষায় নির্দিষ্ট অঞ্চলের উচ্চারণ, বিশেষ শব্দব্যবহারের প্রবণতা, বাক্যগঠনের অভ্যাস, ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি, লিঙ্গ বা ধর্মভিত্তিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক গোষ্ঠীর ভাষাবৈশিষ্ট্য, পেশাগত শব্দব্যবহার তো থাকেই। এসবকে কেন্দ্র করে ভাষা হয়ে উঠেছে ব্যক্তিপরিচয় নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অবশ্য এর আগে সমাজভাষাবিজ্ঞান ও নৃতাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান নামে ভাষাবিজ্ঞানের স্বতন্ত্র শাখা-দুটিরর উদ্ভব ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের উদ্ভব ও অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করে।

‘ফরেনসিক’ শব্দটি ল্যাটিন ‘ফরেনসিস’ থেকে এসেছে, যার দ্বারা ‘আদালত-সংক্রান্ত’ বা ‘জনসমক্ষে বিচারসংক্রান্ত’ বিষয় বোঝানো হয়। সুতরাং ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান বলতে আইন, অপরাধ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভাষাবিজ্ঞানের তত্ত্ব ও পদ্ধতির প্রয়োগকে বুঝিয়ে থাকে। মূলত ভাষাবিজ্ঞানের এই শাখায় আইনি সমস্যার সমাধানের জন্য ভাষা-উপাদানকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। আইন ও ভাষার সম্পর্ক পুরোনো হলেও ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের সূচনা মূলত বিশ শতকের শেষপর্বে। ১৯৬৮ সালে সুইডিশ ভাষাবিদ জ্যান সোয়ার্টভিক ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘টাইমোথাই ইভান্স-মামলার’ বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শাস্ত্রটির উদ্ভব ঘটান। জ্যান সোয়ার্টভিক তাঁর বিশ্লেষণে প্রমাণ করেন যে, পুলিশি নথিভুক্ত স্বীকারোক্তির ভাষা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিটির ভাষা এক নয়। তিনি এ ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিক কিছু বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করে দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করেন।

এ থেকে প্রমাণিত হয় যে আইনি নথির ভাষাও বিশ্লেষণযোগ্য এবং ভাষার গঠনিক রূপ সত্য উদ্ঘাটনে ভূমিকা রাখতে পারে। পরবর্তী সময়ে ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান দ্রুতই বিকশিত হয় এবং শতক শেষ হওয়ার আগেই ফরেনসিক ধ্বনিবিজ্ঞান, লেখক/বক্তা শনাক্তকরণ, আইনি বয়ান বিশ্লেষণ, ভাষা ও পরিচিতি, করপাসভিত্তিক ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান, কম্পিউটেশনাল ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান প্রভৃতি উপশাখাগত ক্ষেত্র তৈরি হয়।

ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান ও সমাজভাষাবিজ্ঞানের নিকট-সম্পর্ক বিদ্যমান। উভয় ভাষাবিজ্ঞানের কথা অনুযায়ী ভাষা মানুষের গাত্র/বংশগত কিংবা সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক। এ ছাড়া ভূগোল ও বাস্তুপ্রতিবেশ, কৌম, উৎপাদনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, বিশ্বাস, সংস্কার ও সাংস্কৃতিক ঐক্য ভাষাগঠনের প্রভাবক শক্তি। তাই বিস্তৃত জনপদে ছড়িয়ে পড়া কোনো ভাষার বিশেষ অঞ্চলের বক্তার মুখের বুলিতে যে ধ্বনিগত ও শব্দগত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের বক্তার বুলি থেকে আলাদা হয়ে যায়। আবার সমাজ বা ধর্ম ও লিঙ্গপরিচয়গত কারণে একই অঞ্চলের দুই ব্যক্তির মধ্যে বুলিগত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এসব ব্যক্তিগত পার্থক্য ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগত পার্থক্য বা পরিচয় নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিক স্তরবিন্যাসও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কোনো অজ্ঞাত বক্তা বা লেখকের ভাষার পরিচয় নির্ণয় একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রক্রিয়াটির অভিমুখ থাকে বৃহৎ অবস্থা থেকে ক্ষুদ্র অবস্থার দিকে। একে এভাবে দেখানো যায় যে, ভাষা→উপভাষা →আঞ্চলিক ভাষারূপ→ সামাজিক ভাষারূপ→ ব্যক্তিগত ভাষারীতি→ নির্দিষ্ট ব্যক্তির ভাষাগত পরিচয় । অর্থাৎ প্রথমে নির্ধারণ করা হয় বক্তা কোন ভাষার অন্তর্ভুক্ত, তারপর কোন উপভাষা বা অঞ্চলের সঙ্গে তার ভাষার সম্পর্ক রয়েছে। এরপর আরও ক্ষুদ্র স্তরে গিয়ে তার ব্যক্তিগত ভাষার বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা হয়। ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্তরভিত্তিক ভাষাতাত্ত্বিক শনাক্তকরণ। একে আবার ভাষাতাত্ত্বিক পরিচয়-প্রোফাইল নির্মাণ প্রক্রিয়া নামেও অভিহিত করা হয়।

তাহলে দেখা যায়, ভাষার আঞ্চলিক বা ঔপভাষিক বৈচিত্র্য ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কেননা বিভিন্ন ঔপভাষিক অঞ্চলের মানুষের ভাষাপ্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান থাকে ধ্বনি, রূপমূল, শব্দ, বাক্য এবং বাগর্থগত স্তরসমূহে। দেখা যায় নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঔপভাষী বক্তা কোনো ধ্বনি বিশেষভাবে উচ্চারণ করে থাকেন; আবার একই অর্থের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন শব্দরূপ ব্যবহৃত হয়। শব্দগঠন, ক্রিয়ারূপ, বাক্যগঠন ইত্যাদিতেও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে। এসব বৈশিষ্ট্য বিশেষ ঔপভাষী কোনো অজ্ঞাত বক্তার সম্ভাব্য উৎস-অঞ্চল নির্ণয়ে সহায়তা করে থাকে।

ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় ‘ইডিওলেক্ট’ বা নিভাষা। ইডিওলেক্ট বলতে বোঝায় ব্যক্তির নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের ধরন। একেকটি মানুষের হাতের লেখায় যেমন এককটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে, তেমনি প্রত্যেক মানুষের ভাষাব্যবহারেরও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য থাকে। ইডিওলেক্ট গঠিত হয় ব্যক্তির উচ্চারণ প্রবণতা, শব্দ নির্বাচনের অভ্যাস, প্রিয় বাক্যাংশ ব্যবহার, বাক্যের দৈর্ঘ্য ও বিরামচিহ্ন ব্যবহারের ধরন, কথনের গতি, বিশেষ অভিব্যক্তি ব্যবহারের প্রবণতা প্রভৃতির মাধ্যমে। প্রমিত বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেউ একাধারে ‘আসল ব্যাপারটা হচ্ছে...’, কেউ ‘কথা হলো গিয়ে...’, কেউ-বা ‘আমি বলি কি...’ ইত্যাদি বাক্যাংশ ব্যবহার করে থাকেন। এই ধরনের পুনরাবৃত্ত ভাষাভঙ্গি ব্যক্তির ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের একটি দিক। কেবল কথ্য ভাষায় নয়, লিখিত ভাষায়ও ইডিওলেক্টের প্রকাশ ঘটে থাকে। বিভিন্ন লেখকের মধ্যে দেখা যায় নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা, বিশেষ বাক্যকাঠামো, কিছু শব্দ এড়িয়ে চলা, নির্দিষ্ট বিরামচিহ্নের ব্যবহার, বাক্যের ছন্দ প্রভৃতি অভ্যাস। বাংলা ভাষার সচেতন গবেষকেরা এমনসব বৈশিষ্ট্য বিচারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কমলকুমার মজুমদার কিংবা সুবিমল মিশ্রের ভাষাকে অনায়াসে চিহ্নিত করতে পারেন। সুতরাং এসব বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান কোনো বেনামি লেখা নির্দিষ্ট ব্যক্তির লেখা কি না সেটাও নির্ণয় করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় লেখকত্ব নির্ণয় পদ্ধতি। বর্তমানে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শৈলী পরিমিতিবিজ্ঞান, করপাস ভাষাবিজ্ঞান, পরিসংখ্যানমূলক ভাষাবিজ্ঞান প্রভৃতি শাখাগুলো।

ভাষাতাত্ত্বিক স্বতন্ত্রতার ক্ষেত্রে ধ্বনি, রূপমূল, বাক্য ও বাগর্থগত বৈচিত্র্য প্রধান। ভাষার এমন স্তরভিত্তিক বৈচিত্র্য ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও। ধ্বনি-বৈচিত্র্যের দিক থেকে বক্তার ভাষায় প্রধানত স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণ, ধ্বনি-পরিবর্তনের প্রবণতা, ধ্বনিদ্বিত্ব, ধ্বনিবিপর্যাস, শব্দের উচ্চারণগত বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি বিদ্যমান থাকে।

শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে নয়; সামাজিক পরিবেশ এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসগত কারণেও মানুষ বিশেষ ভাষারীতি ব্যবহার করে। এমন রীতিকে সমাজভাষা বলা হয়। সামাজিক গোষ্ঠীর ভাষায় থাকে বিশেষ শব্দ, বিশেষ উচ্চারণ, পেশাগত পরিভাষা, সাংস্কৃতিক সংকেত, ভাষাগত ট্যাবু, বিশেষ স্ল্যাং প্রভৃতি। আবার পেশাভিত্তিক দিক থেকে আইনজীবী, চিকিৎসক, কৃষক ও প্রযুক্তিবিদ সমান ভাষায় কথা বললেও তাদের শব্দচয়নে পার্থক্য থাকে। ফরেনসিক বিশ্লেষণে এসব সামাজিক ও পেশাগত ভাষাবৈশিষ্ট্য গুরুত্ব পায়।

বক্তা শনাক্তকরণে ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যও বিশেষ গুরুত্ব পায়। কণ্ঠস্বর মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়চিহ্ন। ফরেনসিক ধ্বনিবিজ্ঞানে তাই বিশ্লেষণ করা হয় স্বরের উচ্চতা, স্বরাঘাত, ধ্বনি উচ্চারণ, কথা বলার গতি, বিরতির ধরন, আঞ্চলিক উচ্চারণ প্রভৃতি। অন্যদিকে মানুষের কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ স্থির বিষয় নয় বলে তা পরিবর্তিত হয় নানা কারণে। এসব কারণের মধ্যে বয়স, অসুস্থতা, মানসিক অবস্থা এবং ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন প্রধান। এসব দিক বিবেচনা করে ফরেনসিক ধ্বনিবিজ্ঞান সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো তাই বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে একটি ক্ষেত্র যেমন আদালতের বৈচারিক কাজে অপরাধমূলক কোনো ফোনকলের ভাষাবিচার। অর্থাৎ ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোতে ফোনকলের বাংলা ভাষাকে বিশ্লেষণ করে অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ফোন কলটির বিশ্লেষণের ধাপ কয়েকটি স্তরে সংঘটিত হতে পারে। পর্যায়ক্রমিক স্তরগুলো হতে পারে: প্রথমে, ফোনকলটি বাংলা ভাষা কি না তা নির্ধারণ; দ্বিতীয় পর্যায়ে, বাংলার কোন আঞ্চলিক রূপের সঙ্গে এর মিল আছে তা নির্ণয়; তৃতীয় পর্যায়ে, বক্তার সামাজিক ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ; চতুর্থ পর্যায়ে, ব্যক্তিগত উচ্চারণ ও ভাষাভঙ্গির বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা এবং সবশেষে নির্ণীত বৈশিষ্ট্যর সঙ্গে বিদ্যমান নমুনার তুলনা। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ভাষা কোনো ব্যক্তির একমাত্র পরিচয় নয়। কেননা মানুষ যেমন একাধিক ভাষারীতি ব্যবহার করে; স্থানচ্যুতি কিংবা অভিবাসনের কারণে, কিংবা সমাজ বা অর্থনৈতিক স্তরপরিবর্তনেও তার ভাষা পরিবর্তিত হয়। আবার ইচ্ছাকৃতভাবেও অনেক বক্তা ভাষাপরিবর্তন করতে পারে। আজকাল প্রযুক্তির মাধ্যমেও কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন ঘটানো হয়। তাই ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান কখনো কেবল একটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় না; বরং বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক ও অভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ একত্রিত করে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে পৌঁছোয়।

২.

ইন্দো-আর্য ভাষাপরিবারের একটি প্রধান ভাষা বাংলা। প্রায় তিরিশ কোটির অধিক মানুষের ভাষা হিসেবে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা। সময়ের পরিবর্তন, ভৌগোলিক বিস্তার, দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিকাশ এবং বহুবিধ সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে বাংলা ভাষার অভ্যন্তরে এখন বৈচিত্র্য বিদ্যমান। এই বৈচিত্র্য শুধু শব্দভান্ডারে নয়; বরং ধ্বনি, রূপমূল, বাক্যগঠন, বাগার্থ ও ব্যবহারিক রীতির মধ্যেও প্রকাশিত। ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো ভাষার অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য যত বেশি, সেই ভাষার ব্যবহারকারীদের পরিচয় নির্ণয়ের সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে। বাংলা ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ ভাষীর ভৌগোলিক অবস্থান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হয়ে কাজ করছে।

বাংলা উপভাষার শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে বাংলা ভাষার প্রধান আঞ্চলিক বিভাগ হচ্ছে চারটি। এগুলো হচ্ছে রাঢ়ী (পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল), বরেন্দ্রী (উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল), কামরূপী (উত্তর-পূর্বাঞ্চল) এবং বঙ্গালী বা পূর্ববঙ্গীয় (বাংলাদেশের বৃহৎ অংশ)। অবশ্য প্রত্যেকটি বিভাগের রয়েছে আঞ্চলিক উপ-বিভাগ। যেমন, বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে সিলেটি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাটগাঁইয়া, ঢাকা অঞ্চলে ঢাকাইয়া, উত্তরাঞ্চলে যেমন রংপুরি প্রভৃতি। এসব ঔপভাষিক রূপ এতটাই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে এক অঞ্চলের ঔপভাষী অন্য অঞ্চলের ঔপভাষীর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপন করতেও অক্ষম হন। এছাড়া রয়েছে উপভাষাভিত্তিক নানা সমাজভাষিক রূপ, লিঙ্গ ও ধর্মকেন্দ্রিক এবং পেশাভিত্তিক নানা রূপভেদ। প্রমিত বাংলার ক্ষেত্রেও এমন অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। ফরেনসিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বাংলার এসব আঞ্চলিক বা ঔপভাষিক বৈচিত্র্য কিংবা প্রমিত বাংলার সমাজ, লিঙ্গ বা ধর্মগত বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলার প্রতিটি ভাষারূপে রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষাতাত্ত্বিক কিংবা সমাজতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য।

ভাষাতাত্ত্বিক স্বতন্ত্রতার ক্ষেত্রে ধ্বনি, রূপমূল, বাক্য ও বাগর্থগত বৈচিত্র্য প্রধান। ভাষার এমন স্তরভিত্তিক বৈচিত্র্য ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও। ধ্বনি-বৈচিত্র্যের দিক থেকে বক্তার ভাষায় প্রধানত স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণ, ধ্বনি-পরিবর্তনের প্রবণতা, ধ্বনিদ্বিত্ব, ধ্বনিবিপর্যাস, শব্দের উচ্চারণগত বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি বিদ্যমান থাকে। ফরেনসিক ধ্বনিবিজ্ঞানে এসব বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বক্তার সম্ভাব্য আঞ্চলিক উৎস নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। বাংলার বিভিন্ন উপভাষায় স্বরধ্বনির বিশেষ ব্যবহার, ব্যঞ্জনধ্বনির স্বাতন্ত্র্য, শব্দের ধ্বনিগত রূপান্তর, শব্দ উচ্চারণে স্বতন্ত্র প্রবণতা, বাক্যের ছন্দ ও টানের পার্থক্য, রূপতাত্ত্বিক গঠন, বাক্যরীতি ও শব্দভান্ডারগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ঔপভাষিক এই ধরনের বৈশিষ্ট্য ফরেনসিক বিশ্লেষণে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে আগেও উল্লিখিত হয়েছে যে, ভাষা শুধু অঞ্চলভিত্তিক নয়; সামাজিকভাবেও স্বতন্ত্র বা বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়। বাংলার ক্ষেত্রেও প্রমিত বাংলা ছাড়াও সমান অঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায় শিক্ষিত ও অশিক্ষিত লোকের ভাষায়, শহর ও গ্রামের ভাষায়, পেশাভিত্তিক ভাষায়, প্রজন্মভিত্তিক ভাষায়, লিঙ্গ কিংবা ধর্মভিত্তিক ভাষায়। সুতরাং প্রমিত বাংলা কিংবা বাংলার উপভাষাগুলোতেও এসব পার্থক্য বা বৈচিত্র্য বিদ্যমান বলে ব্যক্তি বা সমাজপরিচয় সনাক্তকরণে তা ফরেনসিক উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে।

এছাড়া বাংলা ভাষা সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিটাল রূপে এবং ডিজিটাল মাধ্যমেও। ফেসবুক ও ইন্সট্রোগ্রামে পোস্ট, মেসেঞ্জার বার্তা, হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথন, ইউটিউব মন্তব্য, ব্লগ, অনলাইন সংবাদ প্রতিক্রিয়া প্রভৃতির প্রধান মাধ্যম ডিজিটাল প্লাটফর্ম। এসব প্লাটফর্মের ডিজিটাল বাংলা ভাষায় দেখা যাচ্ছে আবার নানা বৈচিত্র্য। ইংরেজি-বাংলা মিশ্রণ, বিশেষ বানানরীতি, আঞ্চলিক শব্দের লিখিত ব্যবহার, ইমোজি ও প্রতীকের ব্যবহার প্রভৃতি ভাষাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তুলছে দিন দিন। ডিজিটাল প্লাটফর্মে কথোপকথন, ভয়েসের ব্যবহার, এআই দিয়ে ভাষাব্যবহার প্রভৃতিও ভাষাপ্রয়োগের অগ্রসরমান ধরন বা বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য বক্তা বা লেখক কিংবা যন্ত্রের ভাষা শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অর্থাৎ এসবই ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের বিষয়।

৩.

ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের প্রধান কাজ ভাষাকে বিশ্লেষণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা। উন্নত দেশসমূহে অপরাধ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভাষাবিজ্ঞানীরা ক্ষেত্রটিকে কাজে লাগান। বাংলাভাষী সমাজেও ভাষার এমনরূপ প্রয়োগের ব্যাপক সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলা ভাষার বিশেষ দিক হচ্ছে সুবিশাল ভাষীসম্প্রদায়; বহুধা বিভক্ত উপভাষা, ঔপভাষিক ধ্বনি-রূপমূল-শব্দবৈচিত্র্য, সামাজিক ভাষারূপ, দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল ভাষা প্রভৃতি। এসব বৈশিষ্ট্য বাংলা ভাষাকে ফরেনসিক ভাষাবৈজ্ঞানিক চর্চার বহুমাত্রিক ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করেছে। এখানে আমরা কয়েকটি প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে কথা বলব।

প্রথমেই বক্তা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রের কথা বলা যায়। এই প্রক্রিয়ায় কোনো অজ্ঞাত কণ্ঠস্বরের সঙ্গে পরিচিত কণ্ঠস্বরের তুলনা করে সম্ভাব্য বক্তার পরিচয় নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। আইনি দিক থেকে অপরাধমূলক ফোন কল, মুক্তিপণের দাবি, হুমকিমূলক বক্তব্য, গোপন রেকর্ডিং, প্রতারণামূলক যোগাযোগ, কণ্ঠবিকৃত করে অপপ্রচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে এর ব্যবহার হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বরের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রধান বিবেচ্য। কেননা ব্যক্তির কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণে ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ; অর্থাৎ কোন ধ্বনি কীভাবে উচ্চারিত হয়েছে, কথায় নির্দিষ্ট ধ্বনির পরিবর্তন, উচ্চারণের আঞ্চলিক বিশিষ্টতা ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্যায়ে স্বরগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়, অর্থাৎ কণ্ঠের উচ্চতা, স্বরের ওঠানামা, স্বরের টান, আবেগ প্রকাশের ধরন ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য। তারপরে বিশ্লেষণ করা হয় বক্তার কথনের গতি; যেহেতু কথা বলার সময়ে কেউ দ্রুত কথা বলেন, কেউ ধীরগতিতে। এছাড়াও বক্তার বিরতির ধরন বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, বক্তা কথার মধ্যে কোথায় এবং কী ধরনের বিরতি দেন, সেটিও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের অংশ হিসেবে বিচার করা হয়। বাংলা ভাষায় বক্তা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা রয়েছে, কারণ বিভিন্ন অঞ্চলের উচ্চারণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রাম কিংবা রংপুরের বক্তার ভাষায় যেমন রয়েছে স্বতন্ত্র স্বরাঘাত, বিশেষ ধ্বনি পরিবর্তন, নির্দিষ্ট শব্দের উচ্চারণ প্রভৃতি; সমানভাবে সিলেট কিংবা উত্তরবঙ্গের বক্তার ভাষায় রয়েছে স্বরধ্বনি ভিন্নরূপ পরিবর্তন, আলাদা শব্দপ্রয়োগ, বিশেষ বাক্যছন্দ কিংবা বিশেষ টোন বা স্বরভঙ্গি। এসব বৈশিষ্ট্য থেকে বক্তার ভাষাগত উৎস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে লেখক শনাক্তকরণের উল্লেখ করা যায়। কোনো রচনার লেখক-পরিচয় অথবা বেনামি বা বিতর্কিত লেখার লেখক নির্ণয়ের প্রক্রিয়া এটি। এতে ব্যবহৃত হতে পারে রচনার, কুম্ভিলকবৃত্তি নির্ণয়, হুমকির চিঠি, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, বেনামি ই-মেইল, অনলাইন পোস্ট, জাল নথি, সাইবার অপরাধের বার্তা প্রভৃতি ক্ষেত্রে। লেখক শনাক্তকরণে লেখকের ‘ভাষাগত স্বাক্ষর’ প্রধানত বিবেচনায় আনা হয়। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তি বা লেখকেরই নিজস্ব ভাষাশৈলী থাকে। হতে পারে তা শব্দব্যবহারের ধরন ও মাত্রায় কিংবা বাক্যনির্মাণের প্রকৃতি অর্থাৎ বাক্যের আকার আকৃতিতে। বিরামচিহ্নের ব্যবহারের প্রকৃতি এমনকি ব্যবহৃত বানানরীতিকেও এতে বিবেচনায় আনা হয়। কেননা, অনেক লেখকের নির্দিষ্ট বানান প্রয়োগের ঝোঁক থাকে। অনেকে আবার বিশেষ বাক্যাংশে কিছু অভিব্যক্তি বারবার ব্যবহৃত করেন, কিংবা বিশেষ শব্দ কিংবা বাক্যের শৈলী।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাষায় লেখক শনাক্তকরণের গবেষণা এখনো সীমিত হলেও সম্ভাবনা অনেক। বিশেষ করে সাহিত্যিকদের রচনাশৈলী বিশ্লেষণ, বেনামি রচনার লেখক নির্ণয়, অনলাইন লেখকের পরিচয় অনুসন্ধান, জাল একাডেমিক লেখা শনাক্তকরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে। এসব ক্ষেত্রে ‘স্টাইলোমেট্রিক পদ্ধতি’ নামক বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। স্টাইলোমেট্রি হচ্ছে লেখার পরিসংখ্যানগত শৈলী বিশ্লেষণ। এতে বিবেচনা করা হয় শব্দের ব্যবহারগত পরিমাণ, বাক্যের দৈর্ঘ্য, শব্দের পুনরাবৃত্তি, ব্যাকরণগত কাঠামো, লেখার প্যাটার্ন প্রভৃতি। বাংলা সাহিত্যে এই পদ্ধতির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের রচনা ও প্রামাণ্যতা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা নজরুল ইসলামের রচনার ভাষাশৈলী, কমলকুমার মজুমদারের রীতি কিংবা আরও অনেকের এবং বেনামি সাহিত্যকর্মের লেখক নির্ণয়-সহ নানা গবেষণা হতে পারে। যদিও বাংলা গবেষণায় এখানো তা উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়নি।

তৃতীয়ত, হুমকিমূলক ভাষা-বিশ্লেষণও বাংলার আরেকটা প্রয়োগক্ষেত্র হতে পারে। আগে যেমন ছিল, এখন বরং আরও হুমকি-ধামকি সমাজে বেড়েছে। সেটা লিখিতভাবে কিংবা অডিও দিয়েও। অপরাধ তদন্তে হুমকিমূলক ভাষার এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হয়ে থাকে হুমকির প্রকৃতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে। কারণ হুমকি নানা ধরনের হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে হুমকিদাতার উদ্দেশ্য, ভাষার আক্রমণাত্মকতা, পরিকল্পনার মাত্রা, আবেগগত অবস্থা-সহ সম্ভাব্য সামাজিক পরিচয় বিশ্লেষিত হতে পারে। একইসঙ্গে অপরাধী শনাক্তকরণেও তার প্রয়োগ হতে পারে।

চতুর্থত, প্রয়োগক্ষেত্র হতে পারে ডিজিটাল ফরেনসিক ভাষা-বিশ্লেষণে। ডিজিটাল এই যুগে ভাষার পরিবর্তন নিত্যই ঘটছে। বর্তমানে যোগাযোগ ও অপরাধের বড় অংশ সংঘটিত হয় অনলাইনে। যেমন, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়, সাইবার হয়রানি, অনলাইন হুমকি, গুজব ছড়ানো, চরিত্রহনন, জনমত তৈরি প্রভৃতিতে। তাই এসব ক্ষেত্রে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। বাংলা ডিজিটাল ভাষার বৈশিষ্ট্যও ইদানিং বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভাষামিশ্রণ, রোমান হরফে লেখা, আঞ্চলিক রূপের ব্যবহার, বিশেষ প্রতীক ও ইমোজি ব্যবহার প্রভৃতি নিত্যই দেখা যায়। এসব বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে বাংলা ডিজিটাল লেখক শনাক্তকরণের সম্ভাবনা রয়েছে।

ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের অপরাপর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে আইনি ভাষা-বিশ্লেষণ এবং পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও ভাষা-বিশ্লেষণ। অতিরিক্ত সংস্কৃতনির্ভর আইনি ভাষা, ভাষার সাধুরূপের অনাবশ্যক ব্যবহার, অপরিচিত ও পুরাতন আইনি শব্দের প্রয়োগ, জটিল বাক্য ব্যবহার, ইংরেজির বাহুল্য প্রভৃতি সাধারণ মানুষের অনুধাবনে বাধাগ্রস্ততা বাংলা ভাষায় বিচার-ব্যবস্থার একটি সমস্যা। ফরেনসিক ভাষাগবেষণায় আদালতের ভাষা, পুলিশি জবানবন্দির ভাষা, আইনি নথির স্পষ্টতা প্রভৃতির মাধ্যমে ন্যায়বিচারের ভাষাকে আরও সহজ করা সম্ভব। অন্যদিকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের ভাষাও ফরেনসিক গবেষণার বিষয়। প্রশ্নের ধরন, উত্তরপ্রদানের পদ্ধতি, চাপপ্রয়োগের ভাষা, স্বীকারোক্তির ভাষাগত বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি বিচার করে বক্তব্য সত্যিই অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের ভাষা কি না তা নির্ধারণ সম্ভব।

পঞ্চমত, বাংলা ভাষায় গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবেও ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান প্রযুক্ত হতে পারে। ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এমন হতে পারে যে প্রথমত, বক্তা-শনাক্তকরণ ডাটাবেস। এতে বিভিন্ন আঞ্চলিক বা উপভাষার মানুষের কণ্ঠস্বর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট ভাষার বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলা উপভাষার ফরেনসিক মানচিত্র নির্ধারণ। এতে অঞ্চলকেন্দ্রিক উপভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যেমন ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপমূলতাত্ত্বিক, বাগর্থিক ও বাক্যিক দিকগুলো নথিভুক্তি করে রাখা যেতে পারে। তৃতীয়ত, লেখক শনাক্তকরণ সফটওয়্যার তৈরি। এতে থাকবে বিভিন্ন লেখকের স্টাইলোমেট্রিক ডাটা এবং তাদের ভাষার বিশ্লেষণ পদ্ধতি। চতুর্থত, বাংলা সাইবার ভাষা গবেষণা। এতে থাকবে অনলাইন অপরাধের ভাষাভিত্তিক বিশ্লেষণ। বাংলা ভাষায় ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও তা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিকশিত হয়নি। এর কারণ গবেষণার উদ্যোগের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, পর্যাপ্ত করপাসের অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, আইনব্যবস্থায় সচেতনতার অভাব প্রভৃতি। তবে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য ও ডিজিটাল বিস্তার এই ক্ষেত্রকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ভাষা আজ আর যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে স্থির নয়; এখন একে ব্যক্তির পরিচয়ের সূক্ষ্ম চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর সেই ভাষাতাত্ত্বিক চিহ্নকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের কাজ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানর বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখলেও বাংলা ভাষায় তা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। এর অ্যাকাডেমিক আলোচনা কিংবা গবেষণা নাই বললেও চলে। অথচ ভাষী/বক্তা শনাক্তকরণ, লেখক শনাক্তকরণ, ডিজিটাল অপরাধ অনুসন্ধান, হুমকি বিশ্লেষণ, আইনি ভাষা, এআই এর ভাষা, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের ভাষা বিশ্লেষণসহ গবেষণা-ক্ষেত্রেও বাংলা ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞানের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

জফির সেতু: কবি, আখ্যানকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত