পরিসংখ্যানে স্বস্তি, বাজারে অস্বস্তি

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২০: ১৩
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বিবিএস বলছে, বিগত জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে, যা গত আট মাসে সর্বনিম্ন। জুনে এটা ছিল ৯ দশমিক ১৬; মে’তে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় মূল্যস্ফীতিই নিম্নমুখী বলে জানাচ্ছে সংস্থাটি। তাদের জোগানো তথ্য স্বস্তিদায়ক মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা—নিত্যপণ্যের দাম কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।

এই ফারাকের প্রথম কারণ নিহিত পরিসংখ্যানের প্রকৃতিতে। মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করা হয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায়। কিন্তু গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ১০ শতাংশে অবস্থান করছে। ফলে কোনো কোনো মাসে কিংবা বার্ষিক হারে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও দ্রব্যমূল্যের স্তর এখনো সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। দ্বিতীয় কারণ জ্বালানির ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি। গত ১৮ এপ্রিল ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম একযোগে বাড়ানো হয়। ১ জুন ফের দাম সমন্বয় করে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ এবং পেট্রল ১৪০ টাকায় উন্নীত করা হয়। এটা সরাসরি প্রভাব ফেলে উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণন খরচে, যার প্রতিফলন শেষতক পড়ে খুচরা বাজারে।

তৃতীয় কারণ এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট গ্যাস সংকট। দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমেছে ২১৫ কোটিতে। এতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কমার কথা জানিয়েছেন কারখানা মালিকরা।

চতুর্থ কারণ সরবরাহ শৃঙ্খলের কাঠামোগত দুর্বলতা ও চাঁদাবাজি। সিপিডির সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ক্ষেত থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে চালসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্বাভাবিক মুনাফা, পরিবহনে চাঁদাবাজি, আড়তভিত্তিক সিন্ডিকেট ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের নিয়ন্ত্রণ দায়ী বলে চিহ্নিত হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে বাংলাদেশের ব্যর্থতা স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। এডিবির সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ থাকবে; প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। তুলনায় শ্রীলঙ্কায় থাকবে ৫ দশমিক ২ শতাংশ, নেপালে ৫ এবং ভারত, ভুটান ও মালদ্বীপে প্রায় ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ; যেখানে নেপাল ও ভুটানে ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ ২০২১-২২ সালে শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি ৪৯ শতাংশে উঠেছিল। কঠোর মুদ্রানীতি, কার্যকর বাজার তদারকি এবং উৎপাদন-উৎসাহমূলক নীতির মাধ্যমে দেশটি দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ভারতও নিয়মিত সুদহার সমন্বয়, খাদ্যশস্যের বাফার স্টক ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীভূত বাজার নজরদারির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের কাছাকাছি রাখতে পেরেছে। নেপালও তুলনামূলক স্থিতিশীল মুদ্রানীতি ও আমদানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

এই বাস্তবতায় সরকারের করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাভাবিক করতে হবে—এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচলসহ গ্যাস আমদানির টেকসই উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কৃষিপণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিতে হবে এবং এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। তৃতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগীর অতিরিক্ত স্তর কমাতে প্রত্যক্ষ বাজার সংযোগ, ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও কোল্ড স্টোরেজে প্রবেশাধিকার সহজ করা প্রয়োজন। চতুর্থত, জ্বালানির মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও পূর্বাভাসযোগ্য করা দরকার, যাতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই হঠাৎ ধাক্কা এড়ানো যায়। পঞ্চমত, ভারত ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মুদ্রানীতি ও সরবরাহ-পক্ষীয় হস্তক্ষেপের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে; যাতে শুধু সুদহার বাড়িয়ে—বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আঘাত না করেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। সবশেষে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি সম্প্রসারণ এবং খোলাবাজারে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি, যতদিন না কাঠামোগত সংস্কারের সুফল খুচরা বাজারে দৃশ্যমান হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত