বাবা হারানোর বেদনায় শুরু হাসপাতাল নির্মাণ, ৪ দশকেও হয়নি চালু

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাভার (ঢাকা)

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১২: ৪১
ধামরাইয়ে ইউনুস খান ক্যান্সার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পড়ে থাকা স্থাপনা। স্ট্রিম ছবি

ক্যান্সারে বাবাকে হারানোর দুঃখ থেকে ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ে একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবাল। প্রায় ৩০০ টাকা ব্যয়ে আশির দশকের মাঝামাঝি শুরু হয় এর নির্মাণকাজ। তবে তাঁর মৃত্যুতে ইউনুস খান ক্যান্সার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পটি চার দশকেও চালু হয়নি। বর্তমানে এটি দেখভাল করছে ইকবাল আহমেদ ফাউন্ডেশন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিপুল ব্যয়ে হাসপাতালের নির্মাণকাজ বহু দূর এগোলেও নানা জটিলতায় থেমে যায়। তবে সরকার বা কোনো ব্যক্তি এগিয়ে এলে কাজটি আবার শুরু করতে মালিকপক্ষ রাজি আছে। স্থানীয়রা বলছেন, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া হাসপাতালটি এখন মাদকসেবী ও বিষাক্ত প্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

উপজেলার ওয়ার্শী ও পাইকপাড়া গ্রামের সীমানায় প্রায় ১৬ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছিল মেগা চিকিৎসাকেন্দ্র। চৌহাট ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে দূর থেকেই চোখে পড়ে একটা সীমানা দেয়ালের ভেতর একাধিক আধুনিক ভবন, কাছাকাছি যেতেই বোঝা যায় অযত্নের ছাপ।

অযত্নে স্থাপনাগুলো ছেয়ে গেছে আগাছায়। স্ট্রিম ছবি
অযত্নে স্থাপনাগুলো ছেয়ে গেছে আগাছায়। স্ট্রিম ছবি

সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা বিশিষ্ট হাসপাতাল কমপ্লেক্সের মূল ভবন ছাড়াও চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবন, একটি মসজিদ, পুকুর ও অন্যান্য স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে অকেজো পড়ে আছে। ভবনের দেয়ালে শ্যাওলা, বারান্দা জুড়ে ধুলাবালি, চারপাশে ঘন ঝোপঝাড়। অনেক জায়গায় আগাছা ও লতাগুল্ম ভবনের দেয়াল বেয়ে উঠে গেছে। সন্ধ্যার পর এলাকাটি প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে বলে জানান স্থানীয়রা।

ব্যক্তিগত শোকের অভিজ্ঞতা থেকে হাসপাতাল

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয়রা জানান, ধামরাই উপজেলার সীমান্ত গ্রাম চৌহাটের সন্তান শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবাল স্বাধীনতার আগে থেকেই মুদ্রণ ব্যবসা করছিলেন। পরে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। আশির দশকে তাঁর বাবা ইউনুস খানের শরীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। পরে চিকিৎসার জন্য তাঁকে একাধিক দেশে নেওয়া হয়। তবে তাঁকে বাঁচাতে যায়নি। অসুস্থ অবস্থায় তিনি ছেলেদের একটি ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের কথা বলেন, যাতে দেশের মানুষ স্বল্প খরচে এর উন্নত চিকিৎসা পায়।

প্রয়াত বাবার ইচ্ছা পূরণ করতেই ১৯৮৫ সালে তাঁর নামেই হাসপাতালটি নির্মাণ শুরু করেন ছেলে খান মোহাম্মদ ইকবাল। কিন্তু এই শিল্পপতির মৃত্যুর পর থেমে যাওয়া প্রকল্পটির অবকাঠামো এখন অপচয়ের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নষ্ট হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। স্ট্রিম ছবি
নষ্ট হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। স্ট্রিম ছবি

এর দেখভালের দায়িত্বে থাকা ইকবাল আহমেদ ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘২০১৭ সালে প্রধান উদ্যোক্তা শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবালের মৃত্যুর পর পুরো প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। তবে সরকার বা কোনো ব্যক্তি যদি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে মালিকপক্ষ রাজি আছে।’

বন্ধ প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের আক্ষেপ

একটি বড় প্রকল্পের অবকাঠামো কাজে লাগানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ না দেখে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। রাজন আহমেদ বলেন, হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতার ইচ্ছা ছিল এলাকাবাসীর সেবা করা, কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। তার পরিবারেরও সদিচ্ছা দেখছি না। তাই সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে এই অবকাঠামো যাতে কাজে লাগানো হয়।

ঢাকার একটি ডেন্টাল মেডিকেল শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা মীম বলেন, নির্মাণাধীন হাসপাতালটি সম্পূর্ণ হলে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলার মানুষকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষার্থী সুমন ইসলাম বলেন, হাসপাতালটি চালু হলে শুধু ধামরাই না, আশপাশের কয়েকটি উপজেলার মানুষ উপকার পেত। বর্তমানে এখানে বন জঙ্গল হয়ে আছে যা আমাদের কোনো কাজে লাগছে না।

পড়ে থাকা অবকাঠামোর নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ধামরাই থানার ওসি মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, এই বিষয়টি নজরে এসেছে। ওই এলাকায় পুলিশ নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোনো অভিযোগ পেলেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রকল্পটি চালুর বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন বলেন, ‘নির্মাণাধীন প্রকল্পটি একজন নিজ উদ্যোগে শুরু করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর থেমে যায় সবকিছু। এই প্রকল্প নিয়ে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে (এমপি) জানিয়েছি, যাতে এই হাসপাতালটি চালু করা যায়। আমরা সে বিষয়ে কাজ করছি।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত