ad

হাড় সুস্থ রাখতে কী কী খাবেন, কখন সতর্ক হবেন

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ০০
হাড়ক্ষয় প্রতিরোধে কী কী খাবেন, কখন সতর্ক হবেন। বিবিসি থেকে নেওয়া ছবি

ছোটবেলায় আমরা অনেকেই শুনেছি, দুধ খেলে হাড় শক্ত হয়। অনেকেই হয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুধ খেয়েছি শুধু এই ভেবে যে, দুধ খেলে শক্তি বাড়বে, হাড় মজবুত হবে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের যত্ন নিয়ে আমরা আর ভাবি না। অথচ হাড়ের ক্ষয় শুরু হয় আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক আগে। সময়মতো যত্ন না নিলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড় দুর্বল হয়ে যায়, সামান্য আঘাতেই ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

তবে আশার কথা হলো, যেকোনো বয়সেই হাড়ের যত্ন নেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে দুধের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে আরও কিছু খাবার। সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা আর প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করলে হাড়কে ঠিক রাখা যায়।

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল মাসকিউলো স্কেলেটাল হেলথের অধ্যাপক কেট ওয়ার্ডের মতে, আমাদের হাড়ের স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করে শৈশব ও তরুণ বয়সের ওপর। এ সময় হাড় যেমন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, তেমনি এর ঘনত্বও বাড়ে, শক্তিশালী হয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার শুরুর দিকে হাড় সবচেয়ে বেশি শক্ত থাকে। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই হাড়ের ঘনত্ব কমতে শুরু করে।

নারীদের ঝুঁকি বেশি, তবে পুরুষরাও নিরাপদ নন

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ অস্টিওপোরোসিসে ভুগছেন। এই রোগে হাড় ধীরে ধীরে পাতলা ও দুর্বল হয়ে যায়। ফলে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে।

হাড়ের জন্য সাপ্লিমেন্ট কতটা কার্যকর, তা নিয়ে এখনো গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট সব সময় হাড় ভাঙা ঠেকাতে পারে না।

অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওপেনিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, শুরুর দিকে সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁদের হাড় দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমবার হাড় ভেঙে যাওয়ার পরই রোগটি ধরা পড়ে। বিশেষ করে ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রতি বছর এক কোটিরও বেশি কোমরের হাড় ভাঙার ঘটনা ঘটে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবারই হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে। তবে মেনোপজের পর নারীদের ক্ষেত্রে এই ক্ষয় আরও দ্রুত হয়। তাই তাঁদের অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরুষরা নিরাপদ। তাঁদেরও এই রোগ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেস ডসন-হিউজ বলেন, একসময় অস্টিওপোরোসিসকে শুধু নারীদের রোগ বলে মনে করা হতো। কারণ তখন অনেক পুরুষই কম বয়সে হৃদ্‌রোগে মারা যেতেন। এখন মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। ফলে বেশি বয়সে পৌঁছানো পুরুষদের মধ্যেও অস্টিওপোরোসিসের ঘটনা আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে।

প্রতিদিন কতটুকু ক্যালসিয়াম প্রয়োজন

হাড় সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন। এ ছাড়া ভিটামিন কে, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক ও ফসফরাস হাড় ও পেশি ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যালসিয়ামের কথা উঠলেই সবার আগে আসে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের নাম। ২০০ মিলিলিটার এক গ্লাস দুধে প্রায় ২৬০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।

সম্প্রতি বৃদ্ধাশ্রমে থাকা সাত হাজারের বেশি প্রবীণকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত দুগ্ধজাত খাবার ও পর্যাপ্ত প্রোটিন খেয়েছেন, তাঁদের কোমরের হাড় ভাঙার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ৪৬ শতাংশ কম ছিল। গবেষকদের ধারণা, ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন একসঙ্গে কাজ করায় এই উপকার পাওয়া যায়।

হাড় সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন। এ ছাড়া ভিটামিন কে, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক ও ফসফরাস হাড় ও পেশি ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যালসিয়ামের কথা উঠলেই সবার আগে আসে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের নাম।

প্রতিদিন কতটুকু ক্যালসিয়াম প্রয়োজন, তা বয়স, লিঙ্গ ও দেশভেদে কিছুটা ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রায় ৭০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম যথেষ্ট ধরা হয়। যাঁদের অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার মিলিগ্রাম। আর মেনোপজের পর নারীদের প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

দুধ না খেলেও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব

অনেকেই মনে করেন, ক্যালসিয়ামের একমাত্র উৎস দুধ। কিন্তু বাস্তবে এমন অনেক খাবার আছে, যেগুলোও হাড়ের জন্য বেশ উপকারী। অধ্যাপক কেট ওয়ার্ডের মতে, যারা দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার কম খান, তাঁদের জন্য সয়াজাত খাবার ভালো বিকল্প হতে পারে।

সয়ায় রয়েছে আইসোফ্লাভোন নামের প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ উপাদান, যা শরীরে অনেকটা ইস্ট্রোজেন হরমোনের মতো কাজ করে। বিশেষ করে মেনোপজের পর নারীদের হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখতে এটি সহায়ক হতে পারে।

এছাড়া চিয়া বীজও পুষ্টিগুণে ভরপুর। মাত্র এক টেবিল চামচ চিয়া বীজে প্রায় ৯৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। পাশাপাশি এতে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাস, যা হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চিয়া বীজ ওমেগা-৩ চর্বিরও ভালো উৎস। এটি শরীরের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। শরীরে দীর্ঘদিন কোনো প্রদাহ বা ব্যথা থাকলে শরীর নতুন হাড় তৈরির চেয়ে পুরোনো হাড় দ্রুত ভাঙতে শুরু করে। এতে অস্টিওপোরোসিস রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রাণীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছর ধরে চিয়া বীজ খাওয়ানো ইঁদুরের হাড়ের খনিজ উপাদান অন্যদের তুলনায় বেশি ছিল। তবে মানুষের ক্ষেত্রেও একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ডুমুরজাতীয় শুকনো ফলেও ভালো পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। দুটি শুকনো ডুমুর থেকেই প্রায় ১০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। একটি কমলালেবুতেও থাকে প্রায় ৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম।

শুধু ক্যালসিয়ামই নয়, এসব ফলে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম, যা হাড় তৈরিতে সাহায্য করে। এ ছাড়া বিভিন্ন ফলে থাকা পলিফেনল নামের উদ্ভিজ্জ উপাদান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এগুলো হাড় ক্ষয়ের গতি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারী এক বছর ধরে প্রতিদিন ৫০ গ্রাম শুকনো আলুবোখারা খেয়েছেন, তাঁদের হাড়ের ক্ষয় অন্যদের তুলনায় কম হয়েছে। আবার একাধিক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যারা বেশি ফল ও শাকসবজি খান, তাঁদের হাড়ের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি কম।

হাড় ভাঙা রোধে সাপ্লিমেন্ট কি সহায়ক

হাড়ের জন্য সাপ্লিমেন্ট কতটা কার্যকর, তা নিয়ে এখনো গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট সব সময় হাড় ভাঙা ঠেকাতে পারে না। আবার অতিরিক্ত ভিটামিন ডি গ্রহণও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সাপ্লিমেন্ট না খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। যাঁদের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, মাংস, প্রোটিন ও সবুজ শাকসবজি থাকে, তাঁদের সাধারণত আলাদা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না।

তবে যাঁদের শরীরে ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে, কিংবা রোদে কম যাওয়া হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাড় ভালো রাখতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সুষম খাদ্য, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম আর স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত