ad

হিরোশিমা দিবস

দুইবার পারমাণবিক বোমা থেকে বেঁচে ফেরা সুতোমু ইয়ামাগুচি কি ভাগ্যবান, নাকি দুর্ভাগা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ১৩
দুইবার পারমাণবিক বোমা থেকে বেঁচে ফেরা সুতোমু ইয়ামাগুচি কি ভাগ্যবান, নাকি দুর্ভাগা? স্ট্রিম গ্রাফিক

‘যুদ্ধ’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর, ফেসবুকে ঢুকলেই ধ্বংসস্তূপ, আগুন আর মানুষের কান্নার ছবি। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিউজফিড স্ক্রল করতে এখন আর আঙুল থেমে যায় না।

কিন্তু যারা সত্যিই যুদ্ধের ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখেছেন, তাঁদের জীবনে এই ছোট্ট শব্দটির মানে সম্পূর্ণ আলাদা। যুদ্ধ তাঁদের জীবন চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। তেমনই একজন ছিলেন জাপানের নাগরিক সুতোমু ইয়ামাগুচি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুই পারমাণবিক হামলার সময়ই তিনি ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছি ছিলেন। দুবারই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও বেঁচে ফিরে আসেন। একে কি সৌভাগ্য বলবেন, নাকি দুর্ভাগ্য?

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস মানব সভ্যতার ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে আছে। যুদ্ধের উন্মাদনায় মানুষ কতটা নৃশংস হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। দুই শহর মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

‘আমি যেন শব্দহীন সিনেমা দেখছি। শুধু দৃশ্য বদলাচ্ছে, চারপাশের কিছুই বাস্তব লাগছিল না।’

পেশায় প্রকৌশলী সুতোমু ইয়ামাগুচির বয়স তখন ২৯ বছর। তিনি মিৎসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করতেন। তিন মাসের একটি ব্যবসায়িক সফরে হিরোশিমায় ছিলেন। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকালে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা ১৫। মিৎসুবিশির শিপইয়ার্ডের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন ইয়ামাগুচি। হঠাৎ করেই আকাশ দিয়ে প্লেন চলে যাওয়ার শব্দ শুনলেন। যুদ্ধের সময় মানুষ যুদ্ধাক্রান্ত জীবনের সঙ্গেও অভ্যস্ত হয়ে যায়। অভ্যাসবশত উপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন আমেরিকান বি-২৯ মডেলের বিমান ঘুরপাক খাচ্ছে আকাশে। খেয়াল করলেন, সেই বিমান থেকে প্যারাস্যুটে বেঁধে কী যেন ফেলে দেওয়া হয়েছে আকাশ থেকে। সঙ্গে সঙ্গেই আকাশ জুড়ে যেন বয়ে যায় প্রচন্ড এক আলোর ঝলকানি। জীবন বাঁচাতে ডুব দিলেন পাশে থাকা এক ডোবাতে। বোমা ফেলার প্রচণ্ড শব্দ তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য বধির করে দিলো। বিস্ফোরণ পরবর্তী শকওয়েভ তুলোর মতোই বাতাসে তুলে ছুড়ে দিলো পাশের আলুর ক্ষেতে। ইয়ামাগুচি ছিলেন গ্রাউন্ড জিরো বা বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে।

তাহলে সুতোমু ইয়ামাগুচি কি ইতিহাসের সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ, নাকি সবচেয়ে দুর্ভাগা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ, একই জীবনে দুইবার পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফেরার ঘটনা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য সৌভাগ্য।

কিছুক্ষণ পর সংবিৎ ফিরে এলে ইয়ামাগুচি দেখলেন, আকাশজুড়ে বিশাল মাশরুম আকৃতির ধোঁয়ার কুণ্ডলী। চারদিকে আগুন, কালো ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপ। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে শহরটি ছিল প্রাণচঞ্চল, সেটি যেন চোখের সামনেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে গেছে।

ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য টাইম্স-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাগুচি বলেছিলেন, ‘আমি জানি না ঠিক কী ঘটেছিল। মনে হয় কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। যখন চোখ মেলে তাকালাম, তখন সবকিছুই অন্ধকার লাগছিল। আর আমি বেশি কিছু দেখতেও পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমি যেন শব্দহীন সিনেমা দেখছি। শুধু দৃশ্য বদলাচ্ছে, চারপাশের কিছুই বাস্তব লাগছিল না।’

জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘আমরা মরে যাইনি আজো, তবু শুধু দৃশ্যের জন্ম হয়।’ ইয়ামাগুচির জীবনে সেই দিনের পর জন্ম নিয়েছিল এমন এক দৃশ্য, যার স্মৃতি তিনি আর কোনো দিন ভুলতে পারেননি।

‘মাশরুমের মেঘটা হিরোশিমা থেকে আমাকে অনুসরণ করে নাগাসাকিতে চলে এসেছে!’

'ইনোলা গে', 'লিটল বয়', ইউরেনিয়াম বোমা, কিলোটন বা তেজস্ক্রিয়তার মতো শব্দগুলো পৃথিবী জেনেছে পরে। কিন্তু ৬ আগস্টের সেই সকালে সুতোমু ইয়ামাগুচি শুধু জানতেন, তিনি বেঁচে আছেন। শরীরের ওপরের অংশ পুড়ে গেছে, বাম কানে ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছেন না। তবু তিনি জীবিত।

হিরোশিমার সেই পারমাণবিক হামলায় প্রায় ২০ হাজার সেনা এবং প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই রাতটি ইয়ামাগুচি কাটান একটি বিমান হামলা প্রতিরোধী আশ্রয়কেন্দ্রে। বাতাসে পোড়া গন্ধ, চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লাশ, আর বেঁচে থাকা মানুষের অসহায় আর্তনাদ। এই মৃত্যু নগরী পেরিয়েই তিনি রওনা হন রেলস্টেশনের দিকে। লক্ষ্য, যেভাবেই হোক বাড়ি ফেরা।

হিরোশিমা। সংগৃহীত ছবি
হিরোশিমা। সংগৃহীত ছবি

পরদিন, ৭ আগস্ট, অনেক কষ্টে একটি ট্রেনে উঠে নিজের শহর নাগাসাকির উদ্দেশে রওনা দেন। হিরোশিমা থেকে প্রায় ১৮০ মাইল পশ্চিমে ছিল শহরটি। শরীর তখনও জখম, কিন্তু বিশ্রাম না নিয়ে অফিসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৯ আগস্ট সকালে তিনি মিৎসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের কার্যালয়ে হাজির হন।

সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তিনি হিরোশিমার ভয়াবহতার কথা বলতে শুরু করেন। বোঝানোর চেষ্টা করেন, একটি মাত্র বোমা কীভাবে কয়েক মুহূর্তে একটি শহরকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু কেউই যেন বিশ্বাস করতে চাইছিল না। অনেকের কাছে তাঁর বর্ণনা অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছিল।

কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস বোঝা বড় দায়। ইয়ামাগুচি যখন অফিসে, নাগাসাকির আকাশে আবারও নেমে আসে দ্বিতীয় ট্র্যাজেডি। সকাল ১১টা ০২ মিনিটে মার্কিন বিমান বাহিনী নাগাসাকির ওপর ফেলে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’। ৪,৬৭০ কেজি ভরের এই বোমার ধ্বংসক্ষমতা ছিল ২১ কিলোটন টিএনটির সমতুল্য, যা লিটল বয়ের চেয়েও বিধ্বংসী ছিল। কিন্তু পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি নাগাসাকির একাংশকে কিছুটা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।

জানালার ফাঁক দিয়ে আবার তীব্র আলোর ঝলকানি দেখে ইয়ামাগুচির মনে দানা বাঁধে শঙ্কা। হাজার হলেও, ঘরপোড়া গরু তিনি। কিন্তু তাঁর সেই সিঁদুরে মেঘ দেখার ভয় অমূলক ছিল না। দেরি না করে মাটিতে শুয়ে পড়েন। বিস্ফোরণের তীব্র শকওয়েভে জানালার ভাঙা কাচ আর ধুলোবালিতে পুরো ঘর ভরে যায়। পরবর্তীতে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম মাশরুমের মেঘটা বুঝি হিরোশিমা থেকে আমাকে অনুসরণ করে নাগাসাকিতে চলে এসেছে!’

নাগাসাকিতেও ইয়ামাগুচি ছিলেন গ্রাউন্ড জিরো থেকে মাত্র দুই মাইলের মধ্যে। নাগাসাকিতে সেদিন ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যান, কিন্তু ইয়ামাগুচির প্রাণপাখিটা খাঁচাতেই রয়ে গেল।

বিস্ফোরণের এত কাছাকাছি থেকেও দুইবার বেঁচে যাওয়া আর কেউ নেই

যুদ্ধের পর ইয়ামাগুচি সুস্থ হয়ে ওঠেন। শুরুতে লোকে জানত তিনি কেবল নাগাসাকির হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন ব্যক্তি। ১৯৫৭ সাল থেকে নাগাসাকির বোমা হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি হিসেবে তাঁর কাছে হালকা বেগুনি রঙের ‘অ্যাটমিক বোম্ব ভিকটিম হেলথ হ্যান্ডবুক’ ছিল। এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি মাসিক ভাতা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মৃত্যুর পর দাফনের খরচ পাওয়ার সুবিধা ভোগ করতেন। তাঁর মতো আরও ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এই সুবিধা পেয়েছিলেন। তাঁর স্বাস্থ্যবইয়ে লেখা ছিল যে তিনি হিরোশিমা ও নাগাসাকি—দুই শহরেই বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু ১৯৬০ সালে বইটি নবায়ন করার সময় হিরোশিমার তথ্যটি মুছে ফেলা হয়।

যুদ্ধের উন্মাদনায় মানুষ কতটা নৃশংস হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি। সংগৃহীত ছবি
যুদ্ধের উন্মাদনায় মানুষ কতটা নৃশংস হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি। সংগৃহীত ছবি

হিরোশিমার তথ্যটিও যোগ করতে চাইলে প্রথমে সরকারি কর্মকর্তারা তাঁকে দুইবার বোমা হামলার শিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাননি। তাঁদের মতে, এতে তাঁর চিকিৎসা বা অন্যান্য সরকারি সুবিধায় কোনো পরিবর্তন হবে না। বিভিন্ন স্থানীয় সাংবাদিকসহ তাঁর বন্ধুরা তাঁকে অনুপ্রেরণা দেন যাতে ইয়ামাগুচি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেন। স্থানীয় সাংবাদিক মাসামি মিয়াশিতা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি তাঁর মতো মানুষ আর কখনও দেখিনি। দুইটি পারমাণবিক বোমার হামলায় আরও অনেকে বেঁচে ছিলেন, কিন্তু বিস্ফোরণের এত কাছাকাছি থেকেও দুবার বেঁচে গেছেন—এমন কাউকে আমি চিনি না। একবার বেঁচে যাওয়াই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, আর দুবার বেঁচে যাওয়া সত্যিই অলৌকিক ঘটনা। তবুও তিনি কখনও এটি নিয়ে বড়াই করেননি।’

অবশেষে ২০০৯ সালে, ৯৩ বছর বয়সে জাপান সরকার তাঁকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। তিনি ‘নিজু হিবাকুশা’, অর্থাৎ দুইবার পারমাণবিক বিস্ফোরণের শিকার ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পান।

সরকারি নথি বলছে, অন্তত ১৬৫ জন মানুষ দুই পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কিন্তু ইয়ামাগুচিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দুই বিস্ফোরণেরই গ্রাউন্ড জিরোর এত কাছাকাছি উপস্থিত ছিলেন এবং সেই পরিচয়ে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

বেশিরভাগ পরমাণু হামলার শিকার ব্যক্তিরা তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ক্যানসার বা অঙ্গহানির কারণে অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও ইয়ামাগুচি ভাগ্যবান। তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন। শ্রবণশক্তির আংশিক ক্ষতি এবং পায়ের দুর্বলতা ছাড়া তিনি তুলনামূলক সুস্থ ছিলেন। পারমাণবিক হামলা তাঁকে পরাজিত করতে না পারলেও হেরেছিলেন ক্যানসারের কাছে। ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।

সবচেয়ে ভাগ্যবান, নাকি সবচেয়ে দুর্ভাগা

তাহলে সুতোমু ইয়ামাগুচি কি ইতিহাসের সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ, নাকি সবচেয়ে দুর্ভাগা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ, একই জীবনে দুইবার পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফেরার ঘটনা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য সৌভাগ্য।

কিন্তু সেই সৌভাগ্যের মূল্য ছিল নিজের চোখে দুই শহরের ধ্বংস, হাজারো মানুষের মৃত্যু, আজীবনের শারীরিক যন্ত্রণা এবং এমন এক মানসিক ক্ষত, যা কখনও মুছে যায়নি। তাই ইয়ামাগুচির গল্প আসলে ভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের নয়। এটি যুদ্ধের নির্মমতার গল্প, যেখানে বেঁচে থাকাও কখনও কখনও আরেক ধরনের বেদনার নাম।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত