সরদার ফরিদ আহমদ

বাংলাদেশের কূটনীতিতে কিছু বিবৃতি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কারণ সেগুলো কেবল একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নীতির ঘোষণা। গত ৫ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিটি সেই ধরনের একটি দলিল। এটি দৈনন্দিন প্রেস রিলিজ নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। এর পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটি ভাষা, শব্দ চয়ন ও রাজনৈতিক বার্তা—তিন দিক থেকেই ব্যতিক্রমী। বিবৃতিতে বলা হয়, পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে অভিযোগ করা হয়, তিনি ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন।
কূটনৈতিক বিবৃতির শক্তি তার শব্দে। পররাষ্ট্র দপ্তর সাধারণত সংযত ভাষা ব্যবহার করে। কারণ কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো পরিমিতি। কিন্তু যখন কোনো রাষ্ট্র মনে করে তার মর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ বা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তখন ভাষাও বদলে যায়। এই বিবৃতিতে সেই পরিবর্তিত ভাষার স্পষ্ট উপস্থিতি দেখা যায়।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে একটি শব্দ—‘জুলাই বিপ্লব’। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক পরিসরে ‘আন্দোলন’, ‘অভ্যুত্থান’ কিংবা ‘গণঅভ্যুত্থান’—বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ‘জুলাই বিপ্লব’ শব্দের ব্যবহার নিছক ভাষাগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি রাষ্ট্রের সরকারি অভিধানে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিভাষার অন্তর্ভুক্তি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিপ্লব বলতে শুধু সরকার পরিবর্তন বোঝায় না। রাজনৈতিক বৈধতার উৎস, ক্ষমতার কাঠামো ও রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটলে তাকে বিপ্লব হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্নাহ আরেন্ট লিখেছিলেন, বিপ্লবের মূল লক্ষ্য কেবল শাসক পরিবর্তন নয়; নতুন রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ। আবার স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার ‘পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বিপ্লব তখনই ঐতিহাসিক তাৎপর্য পায়, যখন তা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও বৈধতার নতুন কাঠামো সৃষ্টি করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শব্দ চয়নকে কেবল অলঙ্কার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাজনৈতিক অবস্থানও নির্দেশ করে।
বিবৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। সেখানে বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান। এই বক্তব্যের কূটনৈতিক তাৎপর্য গভীর। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলো সার্বভৌম সমতা। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তি চুক্তি থেকে শুরু করে জাতিসংঘ সনদ পর্যন্ত এই নীতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে, অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে; তাহলে সেটিকে সে কেবল রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে নয়, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে পারে। বাংলাদেশের বিবৃতিতে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী ধারার জনক হিসেবে পরিচিত হান্স জে মরগেনথো বলেছিলেন, প্রতিটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে থাকে জাতীয় স্বার্থ। বন্ধুত্ব কিংবা বিরোধ দুটিই পরিবর্তনশীল। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ স্থায়ী। একইভাবে কেনেথ ওয়াল্ট তার নব্য বাস্তববাদ তত্ত্বে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভাষা এই বাস্তববাদী দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে হচ্ছে। সেখানে আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কখনোই বশ্যতা স্বীকারকারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। এই একটি বাক্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ভাষার সবচেয়ে আলোচিত অংশ। কারণ এটি কেবল ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় সম্পর্কে একটি ঘোষণা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ছোট বা মাঝারি শক্তির দেশগুলো প্রায়ই বড় শক্তির প্রভাবের মধ্যে থাকে। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; অন্য কারও কৌশলগত সুবিধার ভিত্তিতে নয়। সেই অর্থে এই বাক্যটিকে একটি নীতিগত অবস্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ভাষারও ইতিহাস আছে। কখনো একটি বাক্য, কখনো একটি শব্দই দীর্ঘ সময়ের নীতিগত পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের এই বিবৃতি তেমন কোনো পরিবর্তনের সূচনা কিনা, তার চূড়ান্ত উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কূটনৈতিক ভাষায় এত স্পষ্ট, দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান খুব বেশি দেখা যায়নি। এই কারণেই বিবৃতিটি একটি দিনের সংবাদ নয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা বদলের সম্ভাব্য সূচনাপত্র হিসেবেও আলোচনার দাবি রাখে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, এটি কেবল একটি ঘটনার নিন্দা জানিয়ে থেমে থাকেনি। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। সেটি হলো, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে হবে; নাকি এক পক্ষের রাজনৈতিক সুবিধাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে।
বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি গঠনমূলক, ভবিষ্যতমুখী এবং উভয় দেশের জন্য লাভজনক সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি।
এই বাক্যগুলোকে সাধারণ কূটনৈতিক সৌজন্য মনে করার সুযোগ নেই। কারণ এর পরেই বিবৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও ভারত এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। অথচ একই সময়ে তাকে ভারতের মাটিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুই অবস্থানের মধ্যে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে।
এখানেই বিবৃতিটি নতুন কূটনৈতিক মাত্রা পায়। কারণ এটি প্রথমবারের মতো একই নথিতে প্রত্যর্পণ চুক্তি, রাজনৈতিক আশ্রয়, গণমাধ্যমে বক্তব্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক– এই চারটি বিষয়কে একই কাঠামোয় এনে বিশ্লেষণ করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনে প্রত্যর্পণ চুক্তি কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজমাত্র নয়। এটি রাষ্ট্রের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি। একই সঙ্গে এটিও সত্য, প্রত্যর্পণ প্রশ্নে অনেক রাষ্ট্র রাজনৈতিক, মানবাধিকার কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে। ফলে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হবে, এমন বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নেই। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার অনুরোধ ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে, তাহলে সেই অসন্তোষ প্রকাশও কূটনীতির স্বীকৃত অংশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঠিক সেটিই করেছে। তারা শুধু অসন্তোষ জানায়নি; এটিও বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অর্থাৎ বিবৃতির ভাষা আবেগনির্ভর নয়; এটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক পরিণতিরও ইঙ্গিত বহন করছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক হেডলি বুল তার ‘দ্য অ্যানার্কিক্যাল সোসাইটি’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে কেবল শক্তি নয়; কিছু অভিন্ন নিয়ম ও পারস্পরিক প্রত্যাশা জরুরি। যখন একটি রাষ্ট্র মনে করে সেই অলিখিত নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে, তখন সম্পর্কের ভেতর অবিশ্বাস তৈরি হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে সেই অবিশ্বাসের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের বিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট কিওহ্যান দেখিয়েছেন, পারস্পরিক নির্ভরশীলতার যুগেও রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ কিংবা আঞ্চলিক সহযোগিতা– সব ক্ষেত্রেই আস্থা একটি বড় উপাদান। আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সহযোগিতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাসে সহযোগিতা যেমন আছে, তেমনি মতপার্থক্য আছে। সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ– এসব প্রশ্ন অনেক বছর ধরেই আলোচনার বিষয়।
সাম্প্রতিক বিবৃতির তাৎপর্য এখানেই যে, বাংলাদেশ তার অসন্তোষ প্রকাশে এবার অনেক বেশি স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে ‘সার্বভৌমত্ব’, ‘জুলাই বিপ্লব’, ‘বশ্যতা স্বীকারকারী রাষ্ট্র নয়’, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি’– এই শব্দগুলো একই বিবৃতিতে একত্রে এসেছে।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ভারত সরকারকে আগে থেকেই তাদের উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ ঘটনাটি ঘটার আগে কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছিল বলেই সরকারি বক্তব্যে উল্লেখ করা হলো। তারপরও অনুষ্ঠানটি হওয়ায় ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কূটনীতির ভাষায় এটিকে পূর্ব-সতর্কতার পর প্রকাশ্য আপত্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এই বিবৃতি তাই শুধু শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করার দৃঢ় ঘোষণা। বাংলাদেশের সরকার বলতে চেয়েছে, ভবিষ্যতের সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস নয়, বরং স্পষ্ট অবস্থানই হবে কূটনীতির ভিত্তি। এই কারণেই বিবৃতিটি একটি দিনের প্রতিক্রিয়া নয়; বরং ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন নীতির ওপর দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনো কেবল সরকারের নীতি নয়। এটি জাতীয় আত্মপরিচয়েরও প্রতিফলন। একটি রাষ্ট্র নিজেকে কীভাবে দেখে, প্রতিবেশীর সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক চায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়– সবকিছুর প্রতিফলন ঘটে তার কূটনৈতিক ভাষায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতি সেই কারণেই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
বিবৃতিতে শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। সেখানে একটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিত রয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে অঙ্গীকার করেছে যে, দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে, বাংলাদেশ কখনোই বশ্যতা স্বীকারকারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
এই বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখলে তার গভীরতা বোঝা যাবে না। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূলনীতি ছিল– সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সেই নীতি আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু ‘বন্ধুত্ব’ মানে আত্মসমর্পণ নয়। সহযোগিতা মানে নীরব সমর্থনও নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলে, টেকসই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর।
বিখ্যাত মার্কিন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিজ্ঞানী এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন এম. ওয়াল্ট দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, রাষ্ট্রগুলো স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু তৈরি করে না; তারা স্থায়ীভাবে অনুসরণ করে নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ। সেই কারণেই পররাষ্ট্রনীতি আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; হয় বাস্তবতা দিয়ে। বাংলাদেশের এই বিবৃতিকেও সেই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এমনিতেই জটিল। এখানে ইতিহাস, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, অভিবাসন, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা সবকিছু একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ, ভারতও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। দুই দেশের মধ্যে বিস্তৃত অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সংযোগে উভয় দেশই পরস্পরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্পর্কের অবনতি কোনো পক্ষেরই দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নয়।
ঠিক এ কারণেই এই বিবৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কঠোর ভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি সম্পর্কের দরজাও খোলা রাখা। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি গঠনমূলক, পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে।
এই ভারসাম্যই একটি পরিণত কূটনীতির লক্ষণ। একদিকে আপত্তি জানানো হয়েছে; অন্যদিকে ভবিষ্যতের সহযোগিতার পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এ ধরনের অবস্থানকে অনেক সময় Principled Engagement বলা হয়। অর্থাৎ নীতির প্রশ্নে দৃঢ় থাকা, কিন্তু সংলাপের পথ বন্ধ না করা।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্যের প্রসঙ্গও তুলেছে এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি অস্বীকারের সমালোচনা করেছে। এর মাধ্যমে সরকার শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়নি; বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে যে বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটিও স্পষ্ট করেছে। আধুনিক কূটনীতিতে ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে রাষ্ট্র নিজের ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে অনেক ক্ষেত্রেই কূটনৈতিক সুবিধা অর্জন করে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ– এই দৃঢ় ভাষাকে ধারাবাহিক নীতিতে রূপ দেওয়া। একটি বিবৃতি আলোচনার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডে। যদি সার্বভৌম সমতা, আইনের শাসন, পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থ সত্যিই পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হয়, তাহলে সেই নীতির প্রতিফলন সব দেশের ক্ষেত্রেই সমানভাবে হওয়া উচিত। পররাষ্ট্রনীতির শক্তি তার ধারাবাহিকতায়।
সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট। ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি সরকারি বিবৃতি কেবল প্রশাসনিক নথি থাকে না; সময়ের রাজনৈতিক দলিল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতিকে অনেকেই সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। কারণ এতে শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নেই; আছে রাষ্ট্রের ভাষার পরিবর্তন, কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নীতিগত ভিত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বার্তা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে এখন বড় সুযোগ। জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তনকে যদি সত্যিই নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে পররাষ্ট্রনীতিতেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। কারও বিরুদ্ধে নয়। কারও অনুগতও নয়। বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক– নিজ স্বার্থ ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে। দিল্লির জন্যও এটি একটি বার্তা। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য প্রত্যাশার প্রতিফলন। বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়। কিন্তু বশ্যতা নয়। সহযোগিতা চায়। কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়। সম্পর্ক চায়। কিন্তু মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নয়। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন অভিধান সম্ভবত এই তিনটি বাক্যেই সবচেয়ে সংক্ষিপ্তভাবে লেখা যায়।
সময়ই বলে দেবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতির ভাষা স্থায়ী কূটনৈতিক নীতি হয়ে উঠবে কিনা। তবে এটুকু বলা যায়, এই বিবৃতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রের মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের প্রশ্নে যে ভাষা এতে ব্যবহৃত হয়েছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

বাংলাদেশের কূটনীতিতে কিছু বিবৃতি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কারণ সেগুলো কেবল একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নীতির ঘোষণা। গত ৫ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিটি সেই ধরনের একটি দলিল। এটি দৈনন্দিন প্রেস রিলিজ নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। এর পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটি ভাষা, শব্দ চয়ন ও রাজনৈতিক বার্তা—তিন দিক থেকেই ব্যতিক্রমী। বিবৃতিতে বলা হয়, পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে অভিযোগ করা হয়, তিনি ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন।
কূটনৈতিক বিবৃতির শক্তি তার শব্দে। পররাষ্ট্র দপ্তর সাধারণত সংযত ভাষা ব্যবহার করে। কারণ কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো পরিমিতি। কিন্তু যখন কোনো রাষ্ট্র মনে করে তার মর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ বা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তখন ভাষাও বদলে যায়। এই বিবৃতিতে সেই পরিবর্তিত ভাষার স্পষ্ট উপস্থিতি দেখা যায়।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে একটি শব্দ—‘জুলাই বিপ্লব’। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক পরিসরে ‘আন্দোলন’, ‘অভ্যুত্থান’ কিংবা ‘গণঅভ্যুত্থান’—বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ‘জুলাই বিপ্লব’ শব্দের ব্যবহার নিছক ভাষাগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি রাষ্ট্রের সরকারি অভিধানে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিভাষার অন্তর্ভুক্তি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিপ্লব বলতে শুধু সরকার পরিবর্তন বোঝায় না। রাজনৈতিক বৈধতার উৎস, ক্ষমতার কাঠামো ও রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটলে তাকে বিপ্লব হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্নাহ আরেন্ট লিখেছিলেন, বিপ্লবের মূল লক্ষ্য কেবল শাসক পরিবর্তন নয়; নতুন রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ। আবার স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার ‘পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বিপ্লব তখনই ঐতিহাসিক তাৎপর্য পায়, যখন তা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও বৈধতার নতুন কাঠামো সৃষ্টি করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শব্দ চয়নকে কেবল অলঙ্কার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাজনৈতিক অবস্থানও নির্দেশ করে।
বিবৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। সেখানে বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান। এই বক্তব্যের কূটনৈতিক তাৎপর্য গভীর। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলো সার্বভৌম সমতা। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তি চুক্তি থেকে শুরু করে জাতিসংঘ সনদ পর্যন্ত এই নীতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে, অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে; তাহলে সেটিকে সে কেবল রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে নয়, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে পারে। বাংলাদেশের বিবৃতিতে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী ধারার জনক হিসেবে পরিচিত হান্স জে মরগেনথো বলেছিলেন, প্রতিটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে থাকে জাতীয় স্বার্থ। বন্ধুত্ব কিংবা বিরোধ দুটিই পরিবর্তনশীল। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ স্থায়ী। একইভাবে কেনেথ ওয়াল্ট তার নব্য বাস্তববাদ তত্ত্বে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভাষা এই বাস্তববাদী দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে হচ্ছে। সেখানে আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কখনোই বশ্যতা স্বীকারকারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। এই একটি বাক্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ভাষার সবচেয়ে আলোচিত অংশ। কারণ এটি কেবল ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় সম্পর্কে একটি ঘোষণা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ছোট বা মাঝারি শক্তির দেশগুলো প্রায়ই বড় শক্তির প্রভাবের মধ্যে থাকে। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; অন্য কারও কৌশলগত সুবিধার ভিত্তিতে নয়। সেই অর্থে এই বাক্যটিকে একটি নীতিগত অবস্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ভাষারও ইতিহাস আছে। কখনো একটি বাক্য, কখনো একটি শব্দই দীর্ঘ সময়ের নীতিগত পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের এই বিবৃতি তেমন কোনো পরিবর্তনের সূচনা কিনা, তার চূড়ান্ত উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কূটনৈতিক ভাষায় এত স্পষ্ট, দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান খুব বেশি দেখা যায়নি। এই কারণেই বিবৃতিটি একটি দিনের সংবাদ নয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা বদলের সম্ভাব্য সূচনাপত্র হিসেবেও আলোচনার দাবি রাখে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, এটি কেবল একটি ঘটনার নিন্দা জানিয়ে থেমে থাকেনি। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। সেটি হলো, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে হবে; নাকি এক পক্ষের রাজনৈতিক সুবিধাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে।
বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি গঠনমূলক, ভবিষ্যতমুখী এবং উভয় দেশের জন্য লাভজনক সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি।
এই বাক্যগুলোকে সাধারণ কূটনৈতিক সৌজন্য মনে করার সুযোগ নেই। কারণ এর পরেই বিবৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও ভারত এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। অথচ একই সময়ে তাকে ভারতের মাটিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুই অবস্থানের মধ্যে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে।
এখানেই বিবৃতিটি নতুন কূটনৈতিক মাত্রা পায়। কারণ এটি প্রথমবারের মতো একই নথিতে প্রত্যর্পণ চুক্তি, রাজনৈতিক আশ্রয়, গণমাধ্যমে বক্তব্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক– এই চারটি বিষয়কে একই কাঠামোয় এনে বিশ্লেষণ করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনে প্রত্যর্পণ চুক্তি কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজমাত্র নয়। এটি রাষ্ট্রের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি। একই সঙ্গে এটিও সত্য, প্রত্যর্পণ প্রশ্নে অনেক রাষ্ট্র রাজনৈতিক, মানবাধিকার কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে। ফলে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হবে, এমন বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নেই। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার অনুরোধ ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে, তাহলে সেই অসন্তোষ প্রকাশও কূটনীতির স্বীকৃত অংশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঠিক সেটিই করেছে। তারা শুধু অসন্তোষ জানায়নি; এটিও বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অর্থাৎ বিবৃতির ভাষা আবেগনির্ভর নয়; এটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক পরিণতিরও ইঙ্গিত বহন করছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক হেডলি বুল তার ‘দ্য অ্যানার্কিক্যাল সোসাইটি’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে কেবল শক্তি নয়; কিছু অভিন্ন নিয়ম ও পারস্পরিক প্রত্যাশা জরুরি। যখন একটি রাষ্ট্র মনে করে সেই অলিখিত নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে, তখন সম্পর্কের ভেতর অবিশ্বাস তৈরি হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে সেই অবিশ্বাসের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের বিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট কিওহ্যান দেখিয়েছেন, পারস্পরিক নির্ভরশীলতার যুগেও রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ কিংবা আঞ্চলিক সহযোগিতা– সব ক্ষেত্রেই আস্থা একটি বড় উপাদান। আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সহযোগিতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাসে সহযোগিতা যেমন আছে, তেমনি মতপার্থক্য আছে। সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ– এসব প্রশ্ন অনেক বছর ধরেই আলোচনার বিষয়।
সাম্প্রতিক বিবৃতির তাৎপর্য এখানেই যে, বাংলাদেশ তার অসন্তোষ প্রকাশে এবার অনেক বেশি স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে ‘সার্বভৌমত্ব’, ‘জুলাই বিপ্লব’, ‘বশ্যতা স্বীকারকারী রাষ্ট্র নয়’, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি’– এই শব্দগুলো একই বিবৃতিতে একত্রে এসেছে।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ভারত সরকারকে আগে থেকেই তাদের উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ ঘটনাটি ঘটার আগে কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছিল বলেই সরকারি বক্তব্যে উল্লেখ করা হলো। তারপরও অনুষ্ঠানটি হওয়ায় ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কূটনীতির ভাষায় এটিকে পূর্ব-সতর্কতার পর প্রকাশ্য আপত্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এই বিবৃতি তাই শুধু শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করার দৃঢ় ঘোষণা। বাংলাদেশের সরকার বলতে চেয়েছে, ভবিষ্যতের সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস নয়, বরং স্পষ্ট অবস্থানই হবে কূটনীতির ভিত্তি। এই কারণেই বিবৃতিটি একটি দিনের প্রতিক্রিয়া নয়; বরং ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন নীতির ওপর দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনো কেবল সরকারের নীতি নয়। এটি জাতীয় আত্মপরিচয়েরও প্রতিফলন। একটি রাষ্ট্র নিজেকে কীভাবে দেখে, প্রতিবেশীর সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক চায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়– সবকিছুর প্রতিফলন ঘটে তার কূটনৈতিক ভাষায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতি সেই কারণেই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
বিবৃতিতে শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। সেখানে একটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিত রয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে অঙ্গীকার করেছে যে, দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে, বাংলাদেশ কখনোই বশ্যতা স্বীকারকারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
এই বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখলে তার গভীরতা বোঝা যাবে না। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূলনীতি ছিল– সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সেই নীতি আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু ‘বন্ধুত্ব’ মানে আত্মসমর্পণ নয়। সহযোগিতা মানে নীরব সমর্থনও নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলে, টেকসই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর।
বিখ্যাত মার্কিন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিজ্ঞানী এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন এম. ওয়াল্ট দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, রাষ্ট্রগুলো স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু তৈরি করে না; তারা স্থায়ীভাবে অনুসরণ করে নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ। সেই কারণেই পররাষ্ট্রনীতি আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; হয় বাস্তবতা দিয়ে। বাংলাদেশের এই বিবৃতিকেও সেই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এমনিতেই জটিল। এখানে ইতিহাস, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, অভিবাসন, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা সবকিছু একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ, ভারতও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। দুই দেশের মধ্যে বিস্তৃত অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সংযোগে উভয় দেশই পরস্পরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্পর্কের অবনতি কোনো পক্ষেরই দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নয়।
ঠিক এ কারণেই এই বিবৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কঠোর ভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি সম্পর্কের দরজাও খোলা রাখা। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি গঠনমূলক, পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে।
এই ভারসাম্যই একটি পরিণত কূটনীতির লক্ষণ। একদিকে আপত্তি জানানো হয়েছে; অন্যদিকে ভবিষ্যতের সহযোগিতার পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এ ধরনের অবস্থানকে অনেক সময় Principled Engagement বলা হয়। অর্থাৎ নীতির প্রশ্নে দৃঢ় থাকা, কিন্তু সংলাপের পথ বন্ধ না করা।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্যের প্রসঙ্গও তুলেছে এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি অস্বীকারের সমালোচনা করেছে। এর মাধ্যমে সরকার শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়নি; বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে যে বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটিও স্পষ্ট করেছে। আধুনিক কূটনীতিতে ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে রাষ্ট্র নিজের ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে অনেক ক্ষেত্রেই কূটনৈতিক সুবিধা অর্জন করে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ– এই দৃঢ় ভাষাকে ধারাবাহিক নীতিতে রূপ দেওয়া। একটি বিবৃতি আলোচনার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডে। যদি সার্বভৌম সমতা, আইনের শাসন, পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থ সত্যিই পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হয়, তাহলে সেই নীতির প্রতিফলন সব দেশের ক্ষেত্রেই সমানভাবে হওয়া উচিত। পররাষ্ট্রনীতির শক্তি তার ধারাবাহিকতায়।
সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট। ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি সরকারি বিবৃতি কেবল প্রশাসনিক নথি থাকে না; সময়ের রাজনৈতিক দলিল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতিকে অনেকেই সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। কারণ এতে শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নেই; আছে রাষ্ট্রের ভাষার পরিবর্তন, কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নীতিগত ভিত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বার্তা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে এখন বড় সুযোগ। জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তনকে যদি সত্যিই নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে পররাষ্ট্রনীতিতেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। কারও বিরুদ্ধে নয়। কারও অনুগতও নয়। বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক– নিজ স্বার্থ ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে। দিল্লির জন্যও এটি একটি বার্তা। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য প্রত্যাশার প্রতিফলন। বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়। কিন্তু বশ্যতা নয়। সহযোগিতা চায়। কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়। সম্পর্ক চায়। কিন্তু মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নয়। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন অভিধান সম্ভবত এই তিনটি বাক্যেই সবচেয়ে সংক্ষিপ্তভাবে লেখা যায়।
সময়ই বলে দেবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতির ভাষা স্থায়ী কূটনৈতিক নীতি হয়ে উঠবে কিনা। তবে এটুকু বলা যায়, এই বিবৃতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রের মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের প্রশ্নে যে ভাষা এতে ব্যবহৃত হয়েছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
.png)

মেট্রোরেল তার আধুনিক অবকাঠামো, সিসিটিভি নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক টিকিটিং ব্যবস্থার কারণে শুরুতে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ গণপরিবহন হিসেবে গণ্য হলেও, সাম্প্রতিক কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা এই নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অভূতপূর্ব ও জটিল সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভারতের দ্বিমুখী অবস্থান এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যে খারাপ এবং তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট শাসক যে কমই হয়, সেটা নতুন করে বর্ণনার কিছু নেই। নিকৃষ্ট ছিলেন বলেই তাদেরকে ক্ষমতা থেকে নামাতে অকাতরে জীবন দিতে হয়েছে ছাত্র-জনতাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের মানুষ যেন আত্মাহুতির উৎসবে মেতেছিল।
১৯ ঘণ্টা আগে
২২ জুলাই ২০২৪। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত উত্তপ্ত। প্রতিদিনই আহত ও নিহতের সংবাদ সবাইকে গভীরভাবে ব্যথিত করছিল। সেদিন আমি জানতাম না পরবর্তী দুই সপ্তাহে কী ঘটতে যাচ্ছে। আমি জানতাম না রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিণতি কী হবে।
২০ ঘণ্টা আগে