সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ১৬: ৩৬
সৃজনশীল অর্থনীতিতে নজর সরকারের। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে সৃজনশীল অর্থনীতিকে (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) গুরুত্ব দিয়ে আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেটে এক হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সৃজনশীল শিল্প, সংস্কৃতি, পর্যটন, ক্রীড়া এবং উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করে কর্মসংস্থান, আয় ও রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা থেকে জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব পেশ শুরু করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরি। তার বক্তৃতায় এসব বিষয়ে স্পষ্ট প্রস্তাবনা রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন উৎস থেকে মোট এক হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি সরকারি বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে অতিরিক্ত ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবারের বাজেটে সরকারি, বেসরকারি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সৃজনশীল শিল্প খাতের বিকাশ ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পূর্বাচলে গড়ে উঠবে বিশ্বমানের ক্রিয়েটিভ হাব

সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হচ্ছে পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে একটি বিশ্বমানের ‘সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব’ প্রতিষ্ঠা। এটি দেশের সৃজনশীল শিল্প, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবন কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির বিদ্যমান অবকাঠামোকেও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন হাব, গ্রামে গ্রামে সৃজনশীল পণ্য উন্নয়ন

সৃজনশীল অর্থনীতিকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোতে ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও সৃজনশীল পণ্য চিহ্নিত করে বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে হস্তচালিত তাঁতের কাপড়, মৃৎশিল্প, বয়নশিল্প, শীতলপাটি, শতরঞ্জি, কাঠের খেলনা, হস্তনির্মিত অলংকার এবং টেরাকোটা শিল্পপণ্য।

দেশীয় সৃজনশীল শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করতে ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনারস’ গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ডিজাইন সেন্টারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক স্থাপনা ও হেরিটেজ ভবনগুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোকে আন্তর্জাতিক উৎসব আয়োজনের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

একই সঙ্গে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত উৎসব ক্যালেন্ডার প্রণয়নের কাজ চলছে।

সৃজনশীল অর্থনীতির সঙ্গে পর্যটন খাতের সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক হসপিটালিটি প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন কর্মসূচি চালু এবং একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং কর্মসূচি

বাংলাদেশের সৃজনশীল সক্ষমতাকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি জাতীয় ব্র্যান্ডিং কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় সৃজনশীল পণ্য, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করা হবে।

পাশাপাশি নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্টুডিও সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ওটিটি শিল্পের বিকাশেও সহায়ক হবে।

সরকার ক্রীড়াকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী একটি অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এ কারণে সৃজনশীল অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে ক্রীড়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি ডিসিপ্লিনে বৃত্তি প্রদান করা হবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে সারা দেশে এ কর্মসূচিতে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬২২ জন কিশোর-কিশোরী নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার ৪৯২ জন ছেলে এবং ৪৭ হাজার ১৩০ জন মেয়ে।

ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেশের ৬৪টি জেলাতেই স্পোর্টস ভিলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ক্রীড়া কূটনীতি জোরদার করা, বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য প্রস্তাবিত এক হাজার কোটি টাকার এই বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে সংস্কৃতি, সৃজনশীল শিল্প, পর্যটন, ডিজাইন, কনটেন্ট নির্মাণ ও ক্রীড়া খাতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সৃজনশীল সক্ষমতাকে বৈশ্বিক পরিসরে নতুনভাবে তুলে ধরার পথও উন্মুক্ত হবে।

সম্পর্কিত