খননেও প্রাণ ফেরেনি, পলি জমে ভরাট হচ্ছে কপোতাক্ষ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ১৩: ৩৮
একসময়ের খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদ এখন পরিণত হয়েছে সরু খালে। ছবি : স্ট্রিম

খুলনার কয়রা উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা এক সময়ে খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদ এখন মৃতপ্রায়। দুই দফায় ৮১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে খননের পরও নাব্যতা ফেরেনি নদটিতে। এখন তৃতীয় দফায় খনন চলমান, যা শেষ হবে আগামী ৩০ জুন। এরপরও নদের নাব্যতা ফেরা নিয়ে সন্দিহান পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

এদিকে নদের নাব্যতা হারানোর ফলে দুই পাড়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এতে নদীভাঙনসহ নানা কারণে প্রতিবছর ঘরবাড়ি হারাচ্ছে শত শত পরিবার। টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায় এ সমস্যা প্রতিবছর বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় জেলে ও কৃষকদের জীবনে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, খুলনার কপিলমুনি, চাঁদখালী ও কয়রা, যশোরের কেশবপুর, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও তালা এলাকা নদীকেন্দ্রিক বসতি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের খুলনা, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরা— এই চার জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬৭ কিলোমিটার। তবে এর বড় অংশ কয়রা উপজেলা হয়ে সুন্দরবনের মধ্যে আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের মালঞ্চ মোহনায় পড়েছে। তবে বাস্তবে সেই অংশে এখন নদের চেয়ে ডুবোচর বেশি। কোথাও কোথাও নদের প্রস্থ কমে ৭৫০ মিটার থেকে মাত্র ১৫০ মিটারে ঠেকেছে।

কপোতাক্ষ নদ পুনরুদ্ধারে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে পাউবো। সংস্থাটি সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালে শুরু হওয়া ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ শেষ হয় ২০১৭ সালে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। পরে ২০২০ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প শুরু হয়, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩১ কোটি টাকা। দুই দফায় মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮১৭ কোটি টাকা। বর্তমানে যশোরের তাহেরপুর থেকে মনিরামপুর এবং খুলনার পাইকগাছা থেকে কয়রার আমাদী পর্যন্ত নদী খনন, তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। প্রকল্পটি চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা। এতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে তা জানাতে চাননি পাউবো কর্মকর্তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদে খনন শুরু হওয়ার পর তারা অনেক আশাবাদী হলেও সুফল টেকসই হচ্ছে না। কিছুদিন পরে পলি জমে নদ আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বারবার প্রকল্প হচ্ছে, টাকা খরচ হচ্ছে।

কোথাও খাল, কোথাও চর

সম্প্রতি কয়রার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদের দুই পাশজুড়ে বিশাল চর ও দখলের চিহ্ন নিয়ে টিকে কোনোমতে অস্তিত জানান দিচ্ছে কপোতাক্ষ। এ অবস্থা স্থানীয় কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও পরিবেশের ওপর এর মারাত্মকভাবে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

কয়রার আমাদী ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, নদের তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে বড় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভাটার সময় পানির গভীরতা এক থেকে দেড় ফুটে নেমে আসে। পাইকগাছা থেকে কয়রার আমাদীর মসজিদকুড় পর্যন্ত খননের চিহ্ন থাকলেও স্বাভাবিক রূপ নেই; বরং সরু খালের মতো দেখায়। দুই পাড়ে জেগে ওঠা জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বসতঘর, ইটভাটা ও চিংড়িঘের।

এদিকে ভাটার সময় কয়রার কাঠমারচর এলাকায় গিয়ে নদে বিস্তীর্ণ বালুচর দেখা যায়। এক সময় যেখানে মাছের সমারোহ ছিল, এখন সেখানে বালু উড়ছে। কয়রার খুটিঘাটা, গোবরা, মদিনাবাদ, লোকা ও দশহালিয়া এলাকায় নদের মধ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে। চর জেগে ওঠায় স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এছাড়া পাইকগাছার কপোতাক্ষ পাড়ের দেয়াড়া, রহিমপুর, সলুয়া, হাবিবনগর, রামচন্দ্রনগর, বোয়ালিয়ার মালোপাড়া, হিতামপুর ও বাঁকা মালোপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, ওই এলাকায় নদীভাঙন রয়েছে। বোয়ালিয়ার মালোপাড়ার বাসিন্দা সুশান্ত বিশ্বাস বলেন, অব্যাহত নদীভাঙনে প্রাচীন জেলেপল্লীগুলো এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে।

কয়রার গোবরা গ্রামের বাসিন্দা মোজাম গাজী বলেন, আগে ভরা জোয়ারেও পানি বাঁধ ছুঁতো না। এখন নদের নিচে পলি জমে বাঁধ উপচে পানি পড়ে। প্রতিবছর লোনা পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হচ্ছে। এতে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

মোজাম বলেন, খননের এক বছরের মধ্যেই নদ আবার ভরাট হয়ে গেছে। শুধু খনন করলেই হবে না, নদে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এ খনন করে লাভ কী।

প্রাকৃতিক পদ্ধতির প্রস্তাব পরিবেশকর্মীদের

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, নদী তীরবর্তী কৃষকদের শত বছরের পুরোনো নিজস্ব উদ্ভাবিত পদ্ধতির ‘জোয়ারাধার’। বর্তমানে যা ‘টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট’ (টিআরএম) পদ্ধতির সঙ্গে মিলে যায়। এই পদ্ধতিতে মূল নদীসংলগ্ন একটি বিলের তিনদিকে বাঁধ দিয়ে আরেকদিকের উন্মুক্ত করে জোয়ার-ভাটা করানো হতো। কৃষকেরা তখন আষাঢ়ি পূর্ণিমায় আট মাসের জন্য নদ-নদীর মুখে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতেন, যাতে জোয়ারের লোনাপানি জমিতে ঢুকতে না পারে। আবার মাঘী পূর্ণিমায় বাঁধ সরিয়ে ফেলতেন। এটাই ‘অষ্টমাসী বাঁধ’। মাঝের চার মাসে সাগর থেকে জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি পর্যায়ক্রমে এলাকার একটি করে বিলে ফেলে বিল উঁচু করা হতো। আর ভাটার সময় স্বচ্ছ পানি সাগরে ফিরে যাওয়ার সময় স্রোতের টানে নদী নাব্য থাকত। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না।

পরিবেশবাদী সংগঠন সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, একসময় নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও ঠিক রেখে ছয় বা আট মাস মেয়াদি অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে কৃষিকাজ চালানো হতো। কিন্তু ষাটের দশকে তৎকালীন ইপি-ওয়াপদার ‘কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্টের’ মাধ্যমে পোল্ডার বা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পর সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। জোয়ারের পানি বিলে ঢুকতে না পারায় নদীর মধ্যেই পলি জমতে থাকে। একই সঙ্গে নদ-নদী দখল করে চলতে থাকে ভরাট।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার বিভাগীয় সমন্বয়ক আইনজীবী বাবুল হাওলাদার বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী নদী ‘জীবন্ত সত্তা’। কিন্তু কোনোভাবেই নদ-নদ রক্ষা করা যাচ্ছে না। আমরা চাই, উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় খুলনা অঞ্চলের কপোতাক্ষ, শিবসা, শোলমারীসহ মৃতপ্রায় নদ-নদী, খাল পরিকল্পিতভাবে স্বচ্ছতার সাথে খনন করা হোক। একই সঙ্গে সেগুলো অবৈধ দখলমুক্ত করে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হোক।

নদীর জায়গা ইজারা বাতিল ও টিআরএমের প্রস্তাব

কপোতাক্ষের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পাউবো যশোরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ হোসেন বলেন, খুলনার পাইকগাছা থেকে কয়রা পর্যন্ত সাতটি প্যাকেজে খনন সম্পন্ন হলেও প্রায় ৭৫ লাখ ঘনমিটার পলি এসে নদীর ৭০ থেকে ৭৮ শতাংশ আবার ভরাট হয়ে গেছে।

প্রকৌশলী ফিরোজ বলেন, শুধু খনন করে এ অঞ্চলের নদ-নদী সচল রাখা সম্ভব নয়। যেখানে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) কার্যকর হয়েছে, সেখানে নদী সচল আছে। এটি না থাকলে দ্রুত পলি জমে নদী মরে যায়। দক্ষিণাঞ্চলের নদী সচল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি।

নদী দখলের বিষয়ে পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ বলেন, খননের সময় মাটি ৩০ ফুট দূরে রাখা হলেও নদীর অনেক জায়গা আগে ইজারা দেওয়া ছিল। প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু ইজারা বাতিল করা সম্ভব হয়েছে। তবে খননের পর আবার দখলের চেষ্টা চলছে। নদী রক্ষায় এসব ইজারা স্থায়ীভাবে বাতিল জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

পাউবো খুলনার উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন বলেন, উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও পলি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাই কপোতাক্ষের নাব্যতা সংকটের মূল কারণ। মূলত পদ্মা-গড়াই হয়ে উজানের প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি, না হলে পলি সমুদ্রে যেতে না পেরে নদী ভরাট হতেই থাকবে। টেকসই সমাধানে টিআরএমও কার্যকর হতে পারে। তবে এটি ব্যয়বহুল এবং বড় আকারে জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত