leadT1ad

বিমানের এমডির বাসায় নির্যাতন: বাথরুমে থাকতে হতো শিশুটিকে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০: ০৭
এখনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে মেয়েটি। সংগৃহীত ছবি

ঠিকমতো খাবার না দিলেও নিয়মিত জুটত মারধর। কখনো ভাত দিলেও শিশুটি প্লেট নিয়ে বাথরুমে চলে যেত, খেত সেখানে বসে। মাঝেমধ্যে তাকে বাথরুমেই থাকতে বাধ্য করা হতো।

বুধবার বিকালে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের বিমানের সাবেক এমডির প্রতিবেশী, নিরাপত্তাকর্মী ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

তারা স্ট্রিমকে জানান, নির্যাতনের শিকার শিশুকে নেওয়া হয়েছিল ওই বাসায় থাকা বিমানের সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানের শতবর্ষী মা ও তার দুই সন্তানের দেখাশোনার জন্য। কিন্তু ১১ বছরের মেয়েটি কাজ বুঝত না। এ জন্যই তাঁকে মারধর ও খুন্তি গরম করে ছ্যাকা দিতেন এমডির স্ত্রী বিথী আক্তার। চড়, থাপ্পড়, ধমক—এগুলো ছিল নিয়মিত ঘটনা।

ভবনটির দ্বিতীয় তলার এক ভাড়াটে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, ‘মাস দুয়েক আগে মেয়েটির কান্না শুনে আমি দারোয়ানকে বলেছিলাম, মেয়েটি থাকতে না চাইলে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দিতে। কিন্তু সেই কথা তাঁরা শোনেননি।’

ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিমানের এমডি সাফিকুর রহমান ভবনের ষষ্ঠ তলায় দক্ষিণদুয়ারী নিজের কেনা ফ্ল্যাটে থাকতেন। সবার সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলতেন। তার বাসায় যে এমন ঘটনা ঘটবে—বিশ্বাসই করতে পারছি না।’

ভবনের আরেক বাসিন্দা স্ট্রিমকে জানান, সাফিকুর রহমান-বিথী আক্তারের দুটি শিশু সন্তান রয়েছে। ছোট বাচ্চাটি মায়ের কোল ছাড়েনি। বাবা-মা কারাগারে থাকায় ছোট ছোট শিশু দুটি এখন তাদের নানি ও দাদির কাছে রয়েছে।

ওই বাসিন্দা আরও জানান, যেদিন নির্যাতনের শিকার গুরুতর আহত শিশুটিকে তার বাবা ও দাদির কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, সেদিন রাতে তাঁদের প্রথম বাচ্চার জন্মদিন উপলক্ষে বাসায় অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল।

বাসার নিরাপত্তাকর্মী নূরুল আলম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি বছরখানেক ধরে এই বাসায় চাকরি করছি। একদিন মেয়েটি তার বাবা ও দাদির সঙ্গে বাসার সামনে আসেন এবং তাঁদের মেয়েকে বাসায় রাখার বিষয়ে প্রস্তাব করেন। তারপর ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলে মেয়েটিকে রেখে দিই। ওইদিন মেয়েটির বাবা ও দাদিকে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া মাঝেমধ্যেই মেয়েটির বাবা ম্যাডামের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যেতেন।’

নুরুল আলম আরও বলেন, ‘যেদিন ম্যাডাম মেয়েটিকে তার বাবা ও দাদির কাছে বুঝিয়ে দেন, সেদিন একটি সাদা কাগজে সই রেখে দিয়েছিলেন ম্যাডাম। আমি ওই কাগজের ২ নম্বর সাক্ষী ছিলাম। ওইদিন মেয়েটির পুরো শরীর কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। যার কারণে তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখিনি।’

নুরুল আলম আরও বলেন, পরের দিন মোবাইলে মেয়েটির নির্যাতনের খবর জানতে পারি। এরপর তো পুলিশ রাতে এসে সবাইকে ধরে নিয়ে যায়।

যে দুই গৃহকর্মীকে পুলিশ ধরেছে, তাঁরা ‘ছোটা’ কাজ করতেন, সকালে এসে সন্ধ্যার আগেই চলে যেতেন জানিয়ে নুরুল আলম বড় বাচ্চাটির জন্মদিনের আয়োজন থাকায় ওই রাতে দুই মহিলাকে কাজের জন্য রেখে দিয়েছিলেন বীথি।

ভবনের আরেক নিরাপত্তাকর্মী নূরনবী। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘যেদিন মেয়েটিকে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, ওইদিন সন্ধ্যার দিকে মেয়েটির বাবা ও দাদিকে ভবনের গ্যারেজে বসিয়ে রাখা হয়। সাদা কাগজে সই রেখে আমার হাতে ৫ হাজার ৫ শ টাকা দেন। মেয়েটির চিকৎসার জন্য ৫ হাজার আর যাতায়াতের ৫ শ। চিকিৎসা করিয়ে মেয়েটিকে আবারও ম্যাডামের কাছে রেখে যাওয়ার জন্য বলে দেন।’

ভবনের সামনেই কথা হয় উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. রুবেলের সঙ্গে। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি এসেছিলাম তদন্তের কাজে, বাসার ম্যাপিং করতে। বাসায় নির্যাতনে ব্যবহৃত কোনো আলামত এখনো পাইনি। তবে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে এ বিষয়ে জানা যাবে।’

মো. রুবেল বলেন, ‘আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করা হয়েছে, তবে রিমান্ড আবেদন শুনানির তারিখ ফেলেননি আদালত, ফলে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারিনি।’

মেয়েটির শারিরীক অবস্থা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এই তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, মেয়েটিকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। তার শরীরে পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। গাজীপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের কর্মী নাসির উদ্দিন এলান এ বিষয়ে স্ট্রিমকে বলেন, উত্তরায় ১১ বছরের শিশুর মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিত্তশালীদের কাছে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এটা প্রতিরোধ করার জন্য এখনই সরকারের উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে। আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা যেন অর্থের প্রভাবে ভিকটিমের বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় শ্রম সংস্কার কমিশন ২০২৪-এর প্রধান ও বিললের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আহত শিশুর উন্নত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ১১ বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলার আসামি হিসাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও ড. মো. সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার আরও দুই গৃহকর্মীকে (সুফিয়া ও রুপালি) ২ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা-পুলিশ। আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারের পর ৩ ফেব্রুয়ারি সরকার সাফিকুর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে অতিরিক্ত সচিব ড. হুমায়রা সুলতানাকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী শিশুর বাবা গোলাম মোস্তফা মামলার এজাহারে অভিযোগ করেন, গত ৭ মাস ধরে তাঁর মেয়ের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। শিশুটির শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা ও অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে থানায় দেওয়া গোলাম মোস্তফার মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। গতকাল মোবাইল ফোন খোলা থাকলেও আজ ফোনটি বন্ধ রয়েছে, যার কারণে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত