leadT1ad

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন কীভাবে হয়ে ওঠে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রথম পাঠ

স্ট্রিম গ্রাফিক

হাল আমলের বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলাপচারিতার ভাষায় ‘অন্তর্ভুক্তিমূলকতা’ (inclusiveness) একটা চেনা শব্দ। কিন্তু খুব কম সময়ই এই ভূখণ্ডের জনমানুষ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সাক্ষাৎ পেয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্ভুক্তিমূলকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আছে; আর তা হলো ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ও তৎপরবর্তী একুশের পরম্পরাগত চেতনা।

একুশের ফেব্রুয়ারি ও একুশের চেতনার অনন্য হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ দিক এর অন্তর্ভুক্তিমূলকতা। যে আন্দোলনটি ১৯৪৭-৪৮ সালে শুরু হয় কেবল ভাষা-প্রশ্নে, ১৯৫২ সালে তা পরিণত হয় এক সামূহিক রূপে। অব্যবহিত পরবর্তী বছরগুলোতে এটি বাড়িয়ে নিতে থাকে নিজের ব্যাপ্তি ও পরিধি। বায়ান্নর বাইরে থাকা পক্ষগুলোও ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে একুশের ফেব্রুয়ারির শক্তিশালী রাজনৈতিক চেতনার পরিসরে।

এই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্পষ্ট ইশারা পাওয়া যায় একুশের প্রথম উদ্‌যাপনে; অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে, যেখানে প্রতিবাদী মানুষ ভাষা শহিদদের কবর জিয়ারত করে, মোনাজাত করে, একই সঙ্গে খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে যায়, অস্থায়ী শহিদ মিনার বানায় এবং বেদিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে। এসবের মধ্যে কোনো বিরোধ তৈরি হয় না। বরং যারা ১৯৫২ সালের আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হতে পারেনি, তারাও পরের বছর যুক্ত হয় একুশের মহাস্রোতে।

যেকোনো সফল রাজনৈতিক আন্দোলনকে সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সঙ্গে অব্যবহিত সময়ে তার উদ্‌যাপনের ধরন, তাকে আবর্ত করে সাহিত্যসৃজন এবং বৃহত্তর রাজনীতিতে তার আবেদনের মাত্রার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপনের অপরাপর অনেক বিষয়ের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে একুশের প্রথম সাহিত্য-সংকলনগ্রন্থ ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’। একুশের শোক, ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও সামূহিক সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত হয় একদল দুঃসাহসী তরুণের রক্তের অক্ষরে লেখা সংকলনগ্রন্থ `একুশে ফেব্রুয়ারী’। সম্পাদক হিসেবে ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালন করেন পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩)।

১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপনকে ঘিরে সাহিত্য-সংকলন প্রকাশ ওই কালে একুশের অন্তর্ভুক্তিমূলক মাত্রাকে চিহ্নিত করে; এর লেখক তালিকা ও তাঁদের লেখার পাঠবিশ্লেষণ সেকথাই বলে। সেই সময় খুব সহজ ছিল না এমন একটি সাহিত্য-সংকলনগ্রন্থ প্রকাশ করা। একদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, অপরদিকে অনিঃশেষ প্রতিবাদী সত্তা। শেষ পর্যন্ত আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভার মতো বেরিয়ে আসে ওই সময়ের তরুণপ্রাণ কবি-সাহিত্যিকদের রক্তস্নাত শব্দাবলি ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’।

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ প্রকাশ করতে প্রথমত ও প্রধানত সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন হাসান হাফিজুর রহমান। জানা যায়, সংকলন প্রকাশের খরচ মেটাতে তিনি জামালপুরের কুলকান্দি গ্রামে পৈতৃক জমি বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করেছিলেন।

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন। ছবি: সংগৃহীত
‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন। ছবি: সংগৃহীত

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে। প্রকাশের পরপরই তৎকালীন সরকার একে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে ও সরকার গঠন করে। তাদের শাসনামলে, ১৯৫৬ সালে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ প্রকাশ করে পুঁথি পত্র প্রকাশনী। প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতান (১৯২৬-১৯৮৩)। প্রচ্ছদ এঁকেছেন আমিনুল ইসলাম (১৯৩১-২০১১) এবং ভেতরে বেশ কয়েকটি রেখাঙ্কন ও ছাপচিত্র এঁকেছেন মুর্তজা বশীর (১৯৩২-২০২০)। সংকলনটির প্রথম সংস্করণ ক্রাউন সাইজে তৈরি করা হয়েছিল। পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১৮৩। দাম দু টাকা আট আনা। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এর একাধিক সংস্করণ প্রকাশ করেছে। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনের উৎসর্গপত্রে হাতের লেখায় মুদ্রিত ছিল: ‘যে অমর দেশবাসীর মধ্যে থেকে জন্ম নিয়েছে একুশের শহীদেরা, যে অমর দেশবাসীর মধ্যে অটুট হয়ে রয়েছে একুশের প্রতিজ্ঞা, তাঁদের উদ্দেশ্যে’। এটি কার হস্তাক্ষর, তার উল্লেখ না থাকলেও পরে জানা যায় লেখাটি ছিল আনিসুজ্জামানের (১৯৩৭-২০২০), তখন তাঁর বয়স ষোল।

সম্পাদকীয় অংশে হাসান হাফিজুর রহমান সংহত ভাষায় একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে লিপিবদ্ধ করেন, সেখানে স্পষ্ট করেন সংকলনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন কেবল ওই সময়ের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি বরং অনেকখানি ভবিষ্যৎমুখী, তা তাঁর উচ্চারণে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। তিনি লেখেন: ‘একুশে ফেব্রুয়ারী পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রথম ব্যাপক পশ্চাদপসরণের সূচনা করেছে। সূচনা করেছে জনতার ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয়াভিযান এবং সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক নবজাগরণের। একুশে ফেব্রুয়ারী তাই পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি অশেষ গৌরবমণ্ডিত ক্রান্তিকালের দিন।’

এই সংকলনের একমাত্র প্রবন্ধ ‘সকল ভাষার সমান মর্যাদা’ প্রবন্ধে লেখক আলী আশরাফ স্বৈরাচারী মনোভঙ্গির বিপরীতে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে একুশের চেতনা কেবল বাংলার মর্যাদা রক্ষার দীক্ষায় দীক্ষিত করে না, বরং সকল ভাষার মর্যাদা রক্ষার শিক্ষাও দেয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষার অধিকার রক্ষাও একুশের চেতনার অংশ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, কেবল বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবিও হবে স্বৈরাচারী ও গণতন্ত্রবিরোধী। তাই একুশের চেতনায় উজ্জীবিত বাঙালিকে হতে হবে আরও উদার ও প্রগতিমুখী। বোঝা যায়, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি একুশের আন্দোলনের প্রধান বিষয় হলেও ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ তখন পর্যন্ত ‘একুশের চেতনা’র সঙ্গে আরোপণমূলকভাবে সম্পর্কিত ছিল না। প্রতিবাদী সত্তার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলকতা একুশের চেতনাকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে।

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনে মোট এগারোটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এদের আলাদা কোনো শিরোনাম ছিল না। সে হিসেবে প্রতিটি কবিতাকে ‘একুশের কবিতা’ বলা যায়। তবে এগারোতম কবিতা—হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতাটির নাম ‘অমর একুশে; যা রচিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের মার্চ/এপ্রিলের দিকে। এই সংকলনে যাঁদের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে, তাঁরা হলেন—(সূচিপত্রের ক্রমানুসারে) শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (১৯৩৬-২০২০), আবদুল গণি হাজারী (১৯২৫-১৯৭৬), ফজলে লোহানী (১৯২৯-১৯৮৫), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), আনিস চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯০), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ (১৯৩৪-২০০১), জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান (১৯২৭-১৯৯৯), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) ও হাসান হাফিজুর রহমান। এই কবি-তালিকা দেখে বোঝা যায়, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কবিতায় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁরা প্রায় সবাই ‘একুশে ফেব্রয়ারী’-উৎসারিত।

হাসান হাফিজুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
হাসান হাফিজুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

১৯৫২ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা দ্রুততার সঙ্গে একুশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। পাকিস্তানি পুলিশ ২৬ তারিখ স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে ফেলে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলাউদ্দিন আল আজাদ ওই দিনই লেখেন প্রতিবাদী শব্দমালা—‘স্মৃতিস্তম্ভ’ (পরবর্তীকালে নামকরণকৃত)। এই কবিতার মধ্যে আছে সঙ্ঘশক্তির জাগরণ কামনা; আছে জাতীয়তাবাদী চেতনার সুর। কবির পঙ্ক্তিমালায় প্রকাশ পায় তৎকালীন পূর্ববাংলার চারকোটি জনতার জেগে উঠার অনুভূতি: ‘স্মৃতি মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো/চারকোটি পরিবার/.../ইটের মিনার/ভেঙেছে ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী/ চারকোটি পরিবার \’ এই উচ্চারণে জাতীয়তাবোধের অন্তর্ভুক্তিমূলক আহ্বান স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্‌র বহু পরিচিত ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনে। পরবর্তীকালে তাঁর ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) কবিতার বইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। উড়কি ধানের মুড়কি নিয়ে অপেক্ষারত মায়ের কাছে মায়ের স্বপ্নের কাছে সন্তানের ফিরে না আসা, পুত্রের রক্তভেজা চিঠি, একজন প্রান্তিক নারীর মধ্যকার প্রতিবাদের স্ফূলিঙ্গ ও আবেগ সহৃদয় পাঠককে দারুণভাবে আলোড়িত করে।

১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপনের অপরাপর অনেক বিষয়ের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে একুশের প্রথম সাহিত্য-সংকলনগ্রন্থ ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’। একুশের শোক, ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও সামূহিক সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত হয় একদল দুঃসাহসী তরুণের রক্তের অক্ষরে লেখা সংকলনগ্রন্থ `একুশে ফেব্রুয়ারী’।

বাংলা কথাসাহিত্যে, বিশেষত গল্পসাহিত্যে ভাষা-আন্দোলনের প্রভাব বহুমাত্রিক। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনগ্রন্থ ধারণ করেছে পাঁচজন লেখকের পাঁচটি গল্প—শওকত ওসমানের (১৯১৯-১৯৯৮) ‘মৌন নয়’, সাইয়িদ আতিকুল্লাহর (১৯৩৩-১৯৯৮) ‘হাসি’, আনিসুজ্জামানের ‘দৃষ্টি’, সিরাজুল ইসলামের ‘পলিমাটি’ এবং আতোয়ার রহমানের ‘অগ্নিবাক’। গল্পগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের প্রায় সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ আছে। একুশে ফেব্রুয়ারির মতো একটা রাজনৈতিক ঘটনা কীভাবে সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের সমর্থন পায়, তৈরি হয় অন্তর্ভুক্তিমূলকতা, তার ভাষ্য নির্মিত হয়েছে এই পাঁচ গল্পে। যেমন, ‘মৌন নয়’ একুশে ফেব্রুয়ারি-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক চলন্ত বাসের যাত্রীদের অন্তর-বাহির প্রতিক্রিয়ায় রচিত। এখানে নিনাদিত হয় এক শহিদ-বাবার সন্তানের আর্তনাদ ও উত্তরহীন প্রশ্ন: ‘কী দোষ করেছিল আমার ছেলে? ওরা কেন তাকে গুলি করে মারল? কী দোষ—কী দোষ করেছিল সে?’

এভাবেই কেন্দ্র থেকে প্রান্তে ছড়িয়ে যায় একুশে ফেব্রুয়ারি। ‘হাসি’ গল্পের কেন্দ্রে অবস্থান করে ভাষা-আন্দোলনের নিবেদিত কর্মী আবু। আবুর নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিরন্তর আন্তরিকতা দিয়ে শঙ্কাকুল মনে সমর্থন দিয়ে যাওয়া মানুষটি একজন ঘরের মানুষ, আবুর নীহার খালা। রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মানুষকেও রাজনীতির অনিবার্য অংশ করে তোলে একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনকেও আলোড়িত করেছিল। একজন দৃষ্টিহীন পিতার কাছে একুশের শহিদ-সন্তানের মৃতদেহ কত গভীরতর শোকের জন্ম দেয়, সেই পিতাকে পতিত করে নিঃসীম হাহাকারে, তারই গল্পভাষ্য আনিসুজ্জামানের ‘দৃষ্টি’ গল্প।

মূর্তজা বশীরের (১৯৩৩-২০২০) ‘একটি বেওয়ারিশ ডায়েরীর কয়েকটি পাতা’ ও সালেহ্ আহমেদের ‘অমর একুশে’ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত স্বাক্ষর শীর্ষক রচনা দুটিকে ‘একুশের নকশা’ অংশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলোও এক ধরনের গল্প। একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে আরও জীবন্ত ও চলিষ্ণু করে উপস্থাপন করা হয়েছে রচনা দুটিতে।

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনগ্রন্থ থেকে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী (১৯৩৪-২০২২) রচিত একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’। এই গান ও একুশে ফেব্রুয়ারি আজ অভিন্ন সুতোয় গাঁথা। একুশের সংকলনগ্রন্থে প্রকাশ পাওয়ার আগেই গানটিতে সুরারোপ করেন আবদুল লতিফ (১৯২৭-২০০৫)। তাতে ছিল রণসংগীতের সুর। পরবর্তীকালে সংগীত পরিচালক, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে শহিদ আলতাফ মাহমুদ (১৯৩৩-১৯৭১)। তাতে খ্রিস্টীয় প্রার্থনা-সংগীতরীতির সুর দিয়ে করে গানের ব্যঞ্জনাকে আমাদের সত্তায় গেঁথে দেন।

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ একটা সাহিত্য-সংকলনমাত্র নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পাঠে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি জরুরি এবং তা ইতিবাচক ফলদায়ী, তার দলিল হয়ে আছে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় এই ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন। এই সংকলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, একটা রাজনৈতিক আন্দোলনের সফলতাকে ধরে রাখার জন্য অব্যাহত পরিচর্যা কতটা জরুরি। জরুরি বিভক্তির পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি। একুশের চেতনা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক চেতনা, তার প্রথম শিল্পপ্রকাশ ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’।

  • ড. রাফাত আলম: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত