দ্রোহের জুলাই

অভ্যুত্থানের স্ফুলিঙ্গ যাদের হাতে, কী ভাবছেন তারা

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৭
জুলাই গণঅভ্যুত্থান। স্ট্রিম গ্রাফিক

বুধবার, ১ জুলাই। দুই বছর আগের দিনটি ছিল দ্রোহের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে উচ্চারিত হয়েছিল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নাম। সেদিন হয়তো কেউ ভাবেননি, কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু এই সংগঠনের আন্দোলন রূপ নেবে অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে; পতন ঘটাবে সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের।

হ্যাঁ, দ্রোহের জুলাইয়ে টানা ৩৬ দিনের আন্দোলন, সংঘাত, শত শত প্রাণক্ষয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনার। পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন তিনি। এরপর গেছে দুই বছর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ঘটেছে নানা বদল।

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন থেকে ফিরে এসেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের মাটিতে পা দিয়ে তিনি হারান মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। তার আগে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হন তরুণ রাজনীতিক ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির হাত ধরে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নতুন যাত্রা শুরু করেছে।

কী ভাবছেন আন্দোলনের ছাত্রনেতারা

আন্দোলনের পর রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছাত্রনেতাদের বড় অংশ গঠন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলটিতে বিভক্তি দেখা দেয়। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপি জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে, প্রতিষ্ঠাকালীন অনেকে পদত্যাগ করেন।

নতুন দল গঠন ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব এবং শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ শান্ত স্ট্রিমকে বলেন, ‘জুলাই হলো এই ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতিফলন। এটি ছিল বৈষম্যহীন, মানবিক ও আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। বিরোধী মতের ওপর নির্যাতন, গুম, খুনের মতো সংস্কৃতি রাজনীতি থেকে উৎখাত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।’

জোট গঠনের প্রতিবাদে দল ছাড়া এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক-উস-সালেহীন বলেন, ‘দীর্ঘদিনের বাইনারি রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে এনসিপি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু তারা যখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কার্যত সেই বাইনারি রাজনীতিরই একটি পক্ষ হয়ে যায়। ফলে সব পক্ষকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।’

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দুই নেতাই বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে বৃহত্তর স্বপ্ন তরুণেরা দেখেছিলেন, তা কার্যত থমকে রয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও, কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে পুরোনো রাজনৈতিক ধারা আবার ফিরে আসছে– এই সংশয় মানুষের মনে। অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু জোটের রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণে সেই স্বপ্ন এখন ফিকে হতে চলেছে বলে মনে করছেন তারা।

ফিরে দেখা ১ জুলাই

২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলে ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীরা। জুনজুড়ে বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ চললেও, ৩০ জুনের মধ্যে দাবি মানার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার সাড়া না দেওয়ায় ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। সেদিনই প্রথম তাদের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল— আয়োজক: ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’।

সেদিনের সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ৪ জুলাইয়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় দাবির সুরাহা করতে হবে। পাশাপাশি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়। এরপর আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফায়। ২০২৫ সালেও ১ জুলাইকে ঘিরে মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।

রাষ্ট্র সংস্কারে ঢিমেতাল

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার। দুই বছর পর সেই আকাঙ্ক্ষার কতটুকু বাস্তবায়িত হলো, তা নিয়ে হতাশা রয়েছে ছাত্রনেতাদের। মুশফিক-উস-সালেহীনের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় সংস্কারের বিষয়টি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের টানাপড়েনে এক ধরনের দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যে সংস্কারের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা অনেকটাই থমকে গেছে। সংস্কার শুধু সংবিধান সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা, আমলাতন্ত্র, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এসব এখন আর অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে নেই। সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারে আসা বিএনপিকেও যথেষ্ট আন্তরিক মনে হচ্ছে না।’

ফয়সাল মাহমুদ শান্ত মনে করেন, অনেক কিছু অধরা রয়ে গেছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকার কিছু উদ্যোগ নিলেও নানা বাস্তবতায় অনেক কিছুই অধরা রয়ে গেছে। একইসঙ্গে বিএনপি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা করে সরকারে এলেও, তাদের দ্বিচারিতা স্পষ্ট।’ অবশ্য জুলাই-পরবর্তী প্রজন্ম পরিবর্তনের লড়াই জারি রাখবে বলে আশাবাদী শান্ত।

বড় প্রাপ্তি ভোটাধিকার

সব মিলিয়ে দেশে আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন কিছুটা পিছিয়ে গেলেও, জুলাই আন্দোলনের বড় অর্জনকে স্বীকার করে নিচ্ছেন সবাই। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর পর মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন।

এ বিষয়ে মুশফিক-উস-সালেহীন বলেন, ‘জনগণ যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, সেই গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে আমরা এগোতে পেরেছি। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন। হয়তো একসঙ্গে সব পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরিবর্তনের যে ধারা শুরু হয়েছে, সেটিকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত