ধানে লাভ নগণ্য, আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন নওগাঁর কৃষক

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
নওগাঁ

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০৯: ৩৮
নওগাঁর হাঁট-বাজারে ধান কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। ছবি : স্ট্রিম

নওগাঁর মান্দা উপজেলার তুলসিরামপুর গ্রামের কৃষক হামিদুর রহমান। এবার ৫ বিঘা জমিতে স্বর্ণা-৫ জাতের ধানের আবাদ করেছিলেন। চার মাস শেষে প্রতি বিঘায় ধান পেয়েছেন ২২ মণ হারে। এতে বিঘায় তাঁর লাভ হয়েছে আট থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা।

তিনি জানান, উৎপাদন ও সময় হিসাব করলে এই লাভ সামান্য। এতে ফের আবাদ করায় আগ্রহ পাচ্ছেন না।

হামিদুর বলেন, ‘২২ মণ ধান বিক্রি করে পেয়েছি ২৬ হাজার ৬২০ টাকা। কিন্তু সার, সেচ, কাটা-মাড়াই, কীটনাশক, শ্রমিকসহ উৎপাদন খরচ বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পড়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ মাত্র সাড়ে ৮ হাজার টাকা। এ দিয়ে কীভাবে আবার আবাদ করব, কীভাবে পরিবার চালাব?’

হামিদুরের মতোই এবার ৬ বিঘা জমিতে জিরাশাইল ধানের আবাদ করেছিলেন সদর উপজেলার বর্ষাইল গ্রামের রুবেল হোসেন। তিনি বলেন, ‘এবার ধানের দাম গতবারের চেয়ে প্রতি মণে প্রায় ১০০ টাকা কম। তাতে প্রতি বিঘায় লাভ হয় মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা। এত অল্প টাকায় সংসার চালিয়ে ধানের আবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই কিছু ধান বিক্রি করে বাকিটা সংরক্ষণ করেছি।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় ১ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার ৬৫ টন। এবার প্রতি বিঘায় ২২ থেকে ২৪ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদন হয়েছে বলে জানান কৃষকরা।

কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রতি বিঘা জমিতে বোরো আবাদে চাষ বাবদ ১ হাজার ৬০০ টাকা ও চারা রোপণ বাবদ আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেই সঙ্গে সেচ খরচ বাবদ এলাকা ভেদে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা, ৩৫-৪৫ কেজি ইউরিয়া সার ১ হাজার ২০০, ২০ কেজি ডিএপি সার ৬০০, ১৫ কেজি এমওপি সার ৩০০, ৪ ডোজ কীটনাশক প্রয়োগে ২ হাজার, দেড় থেকে ২ কেজি জিংক ৩৭৫-৫০০ টাকা খরচ হয়। পরে ধান কাটা বাবদ মাড়াই মেশিনে ৫-৬ হাজার টাকা ও শ্রমিক দিয়ে ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এতে মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮-২০ হাজার টাকা।

বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, জেলার রাণীনগরের আবাদপুকুর হাটে গুটি স্বর্ণা ধান প্রতি মণ ১ হাজার ১৬০ টাকা, স্বর্ণা-৫ ধান ১ হাজার ২১০ টাকা, মিনিকেট ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং কাটারি ধান ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে, জেলার মহাদেবপুরের চকগৌরি হাটে জিরাশাইল ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং সুফলতা ধান ১ হাজার ২৬০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়।

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারিভাবে ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। নয়তো ভবিষ্যতে অনেক কৃষক ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।

জেলার রাণীনগর উপজেলার ভেনলা গ্রামের কৃষক প্রদীব কুমার বলেন, ‘বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। কিন্তু সব ধরনের ধামের দাম এবছর ৮০ থেকে ১০০ টাকা কমেছে। প্রকারভেদে প্রতিমণ ধান ১,৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হলে আমরা পুষিয়ে নিতে পারতাম। নয়তো আগামীতে অন্য কিছু ভাবতে হবে।’

বাসদ নওগাঁ জেলা কমিটির আহ্বায়ক ও কৃষক নেতা কমরেড জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, বর্তমানে ধানের দাম কম। তাই ধান বিক্রি করে যা লাভ হচ্ছে, তা দিয়ে কৃষকদের সংসার ও পরবর্তী আবাদে ব্যয়ের সংকুলান হচ্ছে না। কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পায় সেদিকে সরকারের নজর দিতে হবে। নইলে ধানের আবাদ থেকে অনেক প্রান্তিক কৃষক মুখ ফিরিয়ে নেবে। এতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, অনেক কৃষক ধান কাটার পরপরই বিক্রি করে দেন, ফলে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পান না। বাজারে ভালো দাম পেতে হলে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ধানগুলো কিছুদিন নিজ সংরক্ষণে রেখে বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যায়। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষি বিভাগ বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত