leadT1ad

ঢাকায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা

প্রতিবন্ধীদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ৩২
ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলন’। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না করে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশি-বিদেশি গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে দুই দিনব্যাপী ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলন’ শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অধিবেশন ও প্রথম দিনের আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মুনশী সুলায়মান কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতার ওপর নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে হবে। তাঁদের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

মূল প্রবন্ধে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. মরগান ব্যাংকস বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এখনো শ্রমবাজারে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। নীতিগত অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিস্যাবিলিটির একজন গবেষক।

ব্রিটিশ হাইকমিশন ঢাকার সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা তাহেরা জাবিন বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি শুধু মানবাধিকার নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

উদ্বোধনী অধিবেশনের প্রধান অতিথি ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৈয়দ ফেরহাত আনোয়ার। তিনি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূলধারায় আনা সম্ভব নয়।

সম্মেলনের প্রথম দিনে বিভিন্ন অধিবেশনে একাধিক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবিকা উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও শিশুদের প্রতিবন্ধিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, করপোরেট খাতে নিয়োগ বৈষম্য এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির ভূমিকা প্রাধান্য পায়।

প্যানেল আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি অংশ নেন। একজন প্রতিবন্ধী সন্তানের মা হিসেবে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কোনো মানুষই একা জীবন চালাতে পারে না। প্রতিবন্ধীদের সামাজিক সহযোগিতা আরও বেশি প্রয়োজন। তাই সবার আগে প্রতিবন্ধীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বর্তমানে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা নগণ্য। প্রতিবন্ধীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে তাঁদের দক্ষতার উন্নয়ন প্রয়োজন। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আগামী বাজেট থেকেই সরকারকে এই উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিআইজিডির অধ্যাপক ফেলো ড. সেলিম জাহান বলেন, প্রতিবন্ধীদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পশ্চাদপদ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। এ ক্ষেত্রে সমাজ প্রায়ই তাঁদের নিরুৎসাহিত করে। অথচ এটি মৌলিক মানবাধিকার। সমাজ প্রতিবন্ধীদের প্রতি করুণা দেখাতে চায়, কিন্তু স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করতে চায় না। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

প্লেনারি সেশনে ব্র্যাকের প্রতিবন্ধীবান্ধব ‘আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ও উগান্ডার গবেষণা ফলাফল উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবিকায়ন উদ্যোগের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।

ব্র্যাকের এই কর্মসূচির সিনিয়র ম্যানেজার মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের পথে কুসংস্কার একটি বড় বাধা। সমাজে এখনো বিশ্বাস করা হয় যে বাবা-মায়ের অতীত পাপের ফলে প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম হয়। আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

দুপুরের পর সমান্তরাল সেশনগুলোতে নানা গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে শিশু ও তরুণ প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধিতার উপস্থাপন এবং করপোরেট নিয়োগে কোটা ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ উল্লেখযোগ্য। ‘রিসার্চ টু প্র্যাকটিস’ শীর্ষক পোস্টার সেশনে দুর্যোগ ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যে প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্তির বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নীতিগত কাঠামো রয়েছে। তবে কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। এজন্য তাঁরা সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রয়োগের ওপর জোর দেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন আগামীকাল (১৯ জানুয়ারি) যুব প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চাকরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি, মোবাইলভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ভাতা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হবে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, বিআইজিডি, আইসিইডি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে।

বিষয়:

আলোচনা
Ad 300x250

সম্পর্কিত