হরমুজ দিয়ে আসার অনুমতি পায়নি ‘বাংলার জয়যাত্রা’

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ৩৫
বাংলার জয়যাত্রা। সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার তিন দিন পরেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে উল্লেখযোগ্য বাধা অব্যাহত রয়েছে। ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ নামের একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি পায়নি।

জাহাজটি শুক্রবার (১০ এপ্রিল) হরমুজ প্রণালির কাছে পৌঁছানোর পরও ইরানের অনুমোদন পায়নি। জাহাজটি এখনও আটকে আছে বলে জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমোডর মাহমুদুল মালেক। অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহর দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এর আগে ৪০ দিন ধরে আটকে থাকার পর ‘বাংলার জয়যাত্রা’ গত বুধবার সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন ফসফেট সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দরের উদ্দেশে রওয়ানা করে। কিন্তু প্রায় ৪০ ঘণ্টা চলার পর শুক্রবার সকালে হরমুজের কাছাকাছি এসে ইরান সরকারের কাছে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি চাইলে তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে।

কমোডর মাহমুদুল মালেক স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাংলার জয়যাত্রা হরমুজের কাছে আসার পর ইরানের আইআরজিসি এর গতিরোধ করে। জাহাজটি এখনও হরমুজের কাছেই নিরাপদে অবস্থান করছে। ইরানের সঙ্গে আমাদের কুটনৈতিক চ্যানেলগুলো সব খোলা আছে এবং আলোচনা চলছে। অনুমতি মিললে হয়তো জাহাজটি আসতে পারবে। আর নয়তো জাহাজটিকে আবারও আরব আমিরাতে ফিরে যেতে হবে। তবে আলোচনা চলতে থাকবে। অনুমতি মিললেই সেটি আবার হরমুজ পাড়ি দিতে পারবে।’

তিনি আরও জানান, ‘জাহাজে যে সার রয়েছে তার গুণগত মান দুই মাস পরও অটুট থাকবে। এই সময়ের মধ্যে আশা করি সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।’

হরমুজ হয়ে বাংলাদেশের আর কোনও জাহাজ আসার কথা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের তো মাত্র আর একটা জাহাজ আটকে আছে সৌদি আরবের রাস তানুরায়। এ ছাড়া আর কোনও জাহাজ আসার কথা আমার জানা নেই। ওই জাহাজটিতে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন তেল নিয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখনও অনুমতি মেলেনি। এ ছাড়া এখন আর কোনও জাহাজ যেতেও পারছে না, আসতেও পারছে না।’

জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান সাংবাদিকেদের বলেন, ‘সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে আমরা দাম্মাম বন্দরের বহির্নোঙরে ছিলাম। যুদ্ধবিরতির পর নোঙর তোলা হয়। হরমুজ পার হয়ে জাহাজটির দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে ইরান হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি না দেওয়ায় পুনরায় ফিরে যেতে হচ্ছে।’

বিএসসি’র তথ্যমতে, ভারত থেকে পণ্য বহন করে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে কাতারে যায় এমভি বাংলার জয়যাত্রা। এরপার কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি। এর পরদিনই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

পরে গত ১১ মার্চ জেবেল আলি বন্দরে জাহাজটি থেকে পণ্য খালাস শেষ হয়। এরপর কুয়েতের একটি বন্দরে নতুন করে পণ্য বোঝাই করার সূচি ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদে জাহাজটি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি। যুদ্ধবিরতি আলোচনার পর এটি সম্ভব হবে বলে মনে করেছিল তারা। কিন্তু ফের আটকে যায় জাহাজটি।

এর আগে গত ১ এপ্রিল ইরান বাংলাদেশের ছয়টি জ্বালানিবাহী জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি কাতার থেকে এলএনজি এবং একটি সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেল বহন করছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পর আর কোনও জাহাজ অনুমতি পায়নি। এর ফলে যুদ্ধবিরতি হলেও বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

কারণ এই যুদ্ধবিরতিকে এখনো ভঙ্গুর হিসেবে দেখা হচ্ছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। ইসরায়েল-লেবানন উত্তেজনাও পুরো পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে আটটিরও কম জাহাজ চলাচল করছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কম। যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলে দিনে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব জাহাজ চলাচল করেছে, তার বেশির ভাগই ইরান-সংশ্লিষ্ট অথবা ইরানের প্রতি বৈরী নয়—এমন দেশের জাহাজ।

ইরানের বর্তমান অবস্থান হলো, জাহাজগুলোকে দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে। আন্তর্জাতিক নৌপথের পরিবর্তে ইরানি জলসীমার বিকল্প পথ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জলসীমার পথগুলোতে মাইন থাকায় ঝুঁকি এখনও বহাল রয়েছে। ফলে তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজের বড় ধরনের চলাচল এখনও শুরু হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শান্তি বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব অংশ নিচ্ছেন। পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।

তবে গভীর অবিশ্বাস, ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রম এবং লেবানন ইস্যু এই আলোচনার প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কোনো চূড়ান্ত সমাধান পাওয়া কঠিন হলেও যুদ্ধবিরতি ধরে রাখা এবং আংশিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর হয়তো হরমুজ দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে।

সম্পর্কিত