ফ্রিজ আসার আগে যেভাবে কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা হতো

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ১৪: ০১
স্ট্রিম গ্রাফিক

কোরবানির ঈদ আসে ত্যাগ আর মহানুভবতার বার্তা নিয়ে। সঙ্গে নিয়ে আসে একরাশ ব্যস্ততাও। এই ঈদের অন্যতম আনুষ্ঠানিকতা পশু জবাই, গোশত কাটা এবং তা ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী সঠিকভাবে বিতরণ করা।

এরপরই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, এত মাংস একসঙ্গে সংরক্ষণের বিষয়টি। ঠিকঠাকভাবে না রাখলে ফ্রিজের মাংস আবার বেশিদিন সতেজ থাকবে না।

এখন বাড়িতে বাড়িতে ফ্রিজ-ডিপফ্রিজ থাকলেও, নব্বই দশক পর্যন্তও অধিকাংশ বাড়িতে কোনো ফ্রিজ ছিল না, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। কখনো কি ভেবে দেখেছেন ফ্রিজ আসার আগে কীভাবে কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করা হতো?

মাংস জ্বাল দেওয়া

ফ্রিজ ছাড়া মাংস ভালো রাখার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রাচীনতম উপায় ছিল মাংস রোদে শুকানো। মাংস কাটার পর চর্বিহীন সলিড অংশগুলো আলাদা করা হতো। এরপর সেই মাংসের টুকরোগুলোতে পরিমাণমতো হলুদ, লবণ এবং সামান্য মরিচ ভালো করে মাখানো হতো।

বিভিন্ন বাড়িতে এই মসলা মাখানো মাংসের টুকরোগুলো মোটা সুতোয় গেঁথে লম্বা তারে বা শিকের মধ্যে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। আবার অনেকে বাঁশের তৈরি বড় বড় চালুনিতে মেলে উঠোনের কড়া রোদে মাংস শুকাতে দিতেন।

মাংস শুকানোর পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ভর করত আবহাওয়ার ওপর। যদি কড়া রোদ বা গরমের দিন হতো, তবে দুই থেকে তিন দিনেই মাংস শুকানোর কাজ শেষ হয়ে যেত। রোদ ভালো না হলে মাংস নষ্ট হওয়ার ভয় থাকত। রোদ পেয়ে মাংসের ভেতরের সব পানি শুকিয়ে যখন তা কাঠের মতো শক্ত হয়ে যেত, তখন সেটাকে বলা হতো মাংসের শুঁটকি।

আগেকার দিনে আচার বানিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতেন কেউ কেউ। এতে মাংস দীর্ঘ সময় পর্যন্ত খাওয়া যায় আর স্বাদও ভালো থাকে।

অনেক পরিবারে মাংস কড়াইয়ে সংরক্ষণ করে প্রতিদিন জ্বাল দেওয়া হতো, আবার অনেকে মাংস শুকিয়ে শুঁটকি বানিয়ে রাখতেন।

জাহানারা ইমাম তাঁর স্মৃতিকথামূলক বই 'অন্যজীবন'-এ মাংস শুকানোর স্মৃতিচারণা করেছেন: 'সেকালে ত' ফ্রিজ ছিল না। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা বউ-বিবিদের মস্তবড় কাজই ছিল বিরাট বিরাট ডেকচি-কড়াইতে রাখা গোশত ভাল করে জ্বাল দেওয়া। এটা বড়ই খাটনির কাজ ছিল, বিরক্তিকর তো বটেই। জ্বাল দেওয়ার দোষে অনেক সময় গোশত নষ্ট হয়ে যেত। সে জন্য খুব দায়িত্বশীল এবং জাঁহাবাজ ধরনের একজন মুরুব্বি এসবের তদারকিতে থাকতেন। কোরবানির গোশত মহরমের চাঁদে খাওয়া নাকি খুব পুণ্যের কাজ—তাই কিছুটা গোশত খুব যত্নসহকারে জ্বাল দিয়ে দিয়ে রাখা হত।'

মাংস শুকিয়ে শুটকি বানানো

ছোটোবেলায় ঈদের সময় তানভীর রহমানও মাংস শুকানোর নানা কায়দা দেখেছেন। তিনি জানান, 'গ্রামের বাড়িতে তখনও ফ্রিজ আসেনি। বাড়ির মা-চাচীরা মিলে মাংস শুকাতেন। সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। মাংসের সঙ্গে হলুদ, লবণ, মরিচ দিয়ে আধাসেদ্ধ করত প্রথম দিন। এরপর সেই মাংস রোদে শুকাতে হতো তারে বা শিকে গেঁথে। এভাবে মাংস অনেকদিন সংরক্ষণ করা যেত।’

তিনি আরও জানান, ‘,আরেকটা পদ্ধতি দেখেছিলাম এক বিহারি পরিবারে। তারা মাটি পুঁতে তার ভেতর মাটির পাত্র রাখত। সে পাত্রে মাংস ভিনেগার দিয়ে মাখিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখত। কিন্তু এটি তারা কীভাবে খেত বা কয়দিন রাখতো জানি না। এই প্রক্রিয়া তেমন জনপ্রিয় নয়।’

স্মোকিং পদ্ধতিতে মাংস সংরক্ষণ

এ পদ্ধতিতে মাংস সংরক্ষণ করা বেশ প্রাচীনতম উপায়। এখানে মাংসের ভেতরে পানি বা আর্দ্রতা কমিয়ে ধোঁয়ার সুবাস মেশানো হয়। প্রথমে মাংসের টুকরাগুলো ধুয়ে পানি ঝরিয়ে লবণ, হলুদ, মরিচের মসলা দিয়ে মাংস মেখে কিছু সময় রেখে দেওয়া হয়।

এরপর চুলার ওপর মাংস রেখে খুব কম তাপে ধীরে ধীরে ধোঁয়ায় শুকিয়ে নিতে হয়। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগে। তারপর এই মাংস বাতাস ঢুকবে না এমন জায়গায় রেখে সংরক্ষণ করা হয়। সঠিকভাবে স্মোকিং ও সংরক্ষণ করা হলে কয়েক মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

আচার তৈরির মাধ্যমে সংরক্ষণ

আগেকার দিনে আচার বানিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতেন কেউ কেউ। এতে মাংস দীর্ঘ সময় পর্যন্ত খাওয়া যায় আর স্বাদও ভালো থাকে। প্রথমে মাংসের টুকরাগুলো ধুয়ে পানি ঝরিয়ে, পছন্দমতো মসলা দিয়ে মাংস মাখিয়ে তারপর গরম তেলে মাংসের টুকরাগুলো ভেজে ন্তে হয়। ভাজা মাংস ঠান্ডা হলে কাচের জারে রেখে তাতে সরিষার তেল দিয়ে ডুবিয়ে রাখা হয়। এভাবে রাখলে মাংস অনেকদিন ভালো থাকে।

সম্পর্কিত