বাংলাদেশে যেভাবে গড়ে উঠল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ২২: ২৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে একজন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিক্ষাঙ্গনে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমিতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলি কোচিং সেন্টার। নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যা গবেষণা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার কানাকড়িও করে না।’ এই বক্তব্যকে কেউকেউ দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত মান ও গবেষণার তুলনামূলক প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচনা করছেন। কেউবা মনে করছেন এ ধরনের তর্ক কাম্য নয়। প্রতিমন্ত্রী ইতিমধ্যে তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ৫৮টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চশিক্ষায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে তাদের সমকক্ষ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছাল—সেই ইতিহাস অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। ভাড়া করা ভবনের কয়েকটি কক্ষ থেকে শুরু করে একরের পর একর জমিতে গড়ে ওঠা বিশাল ক্যাম্পাস পর্যন্ত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিবর্তনের গল্পটি মূলত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রেক্ষাপট: কেন প্রয়োজন হলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের?

আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, বুয়েট ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই ছিল উচ্চশিক্ষার ভরসাস্থল। কিন্তু সে সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভয়াবহ সেশনজট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চরম শিকার হয়। তিন বছরের স্নাতক শেষ করতে শিক্ষার্থীদের ৬ থেকে ৭ বছর সময় লেগে যেত।

জনসংখ্যার তুলনায় আসন সংখ্যা ছিল নগণ্য। ফলে মেধার তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এবং সেশনজটের ভয়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা দলে দলে ভারত, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাতে শুরু করে। এতে একদিকে যেমন ‘মেধাপাচার’ বা ব্রেইন ড্রেইন হচ্ছিল, তেমনি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছিল বিদেশে। সরকার ও শিক্ষাবিদরা অনুধাবন করেন, রাষ্ট্রের একার পক্ষে উচ্চশিক্ষার এই বিপুল চাহিদা মেটানো আর সম্ভব নয়। প্রয়োজন বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ।

প্রথম প্রজন্মের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের পর ২০০০ সাল থেকে এই খাতে প্রবল জোয়ার আসে। রাজনৈতিক প্রভাব ও নিছক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতে থাকে।

১৯৯২ সালের আইন ও প্রথম দিকের পথচলা

উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের আইনি ভিত্তি তৈরি হয় তৎকালীন সরকারের পাস করা ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২’-এর মাধ্যমে। এটি ছিল দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এই আইনের অধীনে ১৯৯২ সালেই ‘ফাউন্ডেশন ফর প্রমোশন অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ ট্রাস্টের অধীনে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায় ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ)’। প্রায় একই সময়ে ড. এম আলিমউল্যা মিয়ানের উদ্যোগে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)’-ও স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর একে একে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি (আইইউবি), আহসানউল্লাহ (এইউএসটি), ইস্ট ওয়েস্ট এবং এআইইউবি (এআইইউবি)-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাত্রা শুরু করে।

শুরুর দিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব কোনো ক্যাম্পাস ছিল না। বনানী, মহাখালী ও ধানমন্ডি এলাকার বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনের ফ্লোর ভাড়া করে তাদের কার্যক্রম চলত। সে সময় তাদের প্রধান মনোযোগ ছিল সময়োপযোগী বিষয়গুলোর দিকে—যেমন বিবিএ, কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইংরেজি। সেশনজটমুক্ত পরিবেশে দ্রুত ডিগ্রি লাভের এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

বাণিজ্যিকীকরণের অন্ধকার যুগ ও সনদ বাণিজ্য

প্রথম প্রজন্মের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের পর ২০০০ সাল থেকে এই খাতে প্রবল জোয়ার আসে। রাজনৈতিক প্রভাব ও নিছক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতে থাকে।

এই দশকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়। বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ‘সনদ বাণিজ্য’ বা টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি বিক্রির অভিযোগ ওঠে। ‘দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়’ ছিল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ; আদালতের রায়ে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া মূল ক্যাম্পাসের বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘আউটার ক্যাম্পাস’ খুলে নিম্নমানের শিক্ষা দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়। নিজস্ব ক্যাম্পাস, ল্যাব, লাইব্রেরি বা পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক ছাড়াই চলা এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি চরম সংকটে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছিল।

নতুন বাঁক: ২০১০ সালের আইন

এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে সরকার ১৯৯২ সালের আইনটি বাতিল করে। এর বদলে অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে।

নতুন আইনে স্পষ্ট করে দেওয়া হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি চলবে অলাভজনক ট্রাস্টের অধীনে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ক্যাম্পাসের ক্ষেত্রে—আইন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভাড়া করা ভবন ছেড়ে নিজস্ব বা স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর বাধ্যতামূলক করা হয়। একইসঙ্গে সমাজের পিছিয়ে পড়া, মেধাবী এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৬% কোটায় সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, যা উচ্চশিক্ষায় এক নতুন সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করে।

বেশ কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এখন বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিউএস এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন-এর মতো বিশ্বখ্যাত র‍্যাংকিংগুলোতে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সগৌরবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে।

স্থায়ী ক্যাম্পাসের যুগে প্রবেশ এবং গুণগত উত্তরণ

২০১০ সালের আইনের পর ইউজিসি কঠোর অবস্থান নেয়। ফলে টিকে থাকার স্বার্থে প্রথম সারির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশাল অংকের বিনিয়োগ করে নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণ শুরু করে।

আজ রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, আফতাবনগর, পূর্বাচল, আশুলিয়া এবং সাভার এলাকায় চোখে পড়ে ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, ড্যাফোডিল, আইইউবি বা ইউআইইউ-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক সব ক্যাম্পাস। একসময় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘পার্ট-টাইম’ বা খণ্ডকালীন ক্লাসের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আজ দৃশ্যপট বদলেছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শত শত ফুল-টাইম পিএইচডিধারী নিজস্ব শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে খণ্ডকালীন ও অতিথি শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ।

বেশ কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এখন বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিউএস এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন-এর মতো বিশ্বখ্যাত র‍্যাংকিংগুলোতে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সগৌরবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জুলাই অভ্যুত্থান

দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান আজ অনস্বীকার্য। কর্পোরেট সেক্টর, ব্যাংকিং, তৈরি পোশাক খাত এবং আইটি খাতে দক্ষ জনশক্তি সরবরাহের প্রধান কারিগর এখন এসব প্রতিষ্ঠান। মেধা ও অর্থ পাচার রোধে তারা ঢালের মতো কাজ করেছে।

কেবল পড়াশোনাই নয়, জাতীয় সংকটেও এই শিক্ষার্থীরা পিছপা হয়নি। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ‘জুলাই বিপ্লবে’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারা প্রমাণ করেছে যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেবল ক্যারিয়ার-সচেতন নয়, তারা দেশপ্রেমিক এবং অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর।

বর্তমান চিত্র ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ

ইউজিসির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৪টি, যার মধ্যে ১১০টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন, যা দেশের মোট উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীর একটি বিশাল অংশ।

এত অর্জনের পরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। শীর্ষস্থানীয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফি অনেক বেশি, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। এছাড়া শীর্ষ ১৫-২০টি বাদে তালিকার নিচের দিকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান আজও প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করা সত্ত্বেও কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো পিএইচডি বা এমফিল ডিগ্রি প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়নি; অনেকে মনে করেন উচ্চশিক্ষার প্রসারে এটি বড় বাধা।

মাত্র তিন দশকের পথচলায় বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় যারা ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়ায় থাকা ‘বিকল্প’ মাত্র, আজ তারা অনেক ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও বিশ্বায়নের যুগে টিকে থাকতে হলে পাবলিক-প্রাইভেট বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত