তারেক-সি বৈঠক

বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডরের আলোচনা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ১৪: ১৫
তারেক রহমান ও সি চিন পিং। ছবি পিএমও

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর স্থাপন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

শুক্রবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এই বৈঠক হয়। পরে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সি চিন পিংয়ের আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের ‘দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব’ নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। সি চিন পিং আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পাশে থাকবে।

হুমায়ুন কবির বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন বাংলাদেশকে জোরালো সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে যুক্ত হতে চাইলে চীন স্বাগত জানাবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা অন্তত আরও তিন বছর অব্যাহত রাখতে বেইজিং সমর্থন দেবে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।

এই সফরে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এর মধ্যে দুই দেশের সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ১৩টি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩টি এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা সই হয়েছে। খুব শিগগিরই দুই দেশের সম্মতির ভিত্তিতে ১৬ দফাসংবলিত একটি যৌথ ইশতেহারও প্রকাশ করা হবে।

করিডর, রোহিঙ্গা ও ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, কানেক্টিভিটি নিয়ে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনকে নিয়ে একটি ‘ইকোনমিক করিডর’তৈরির প্রস্তাব এসেছে। এর উদ্দেশ্য হবে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক লেনদেন ও বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। চীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো সংলাপে তারা মধ্যস্থতা করবে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বিগত ১৫ বছরের একটি দুর্বল সরকারের কারণে এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার একটি শক্তিশালী অবস্থান (পজিশন অব স্ট্রেংথ) থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলবে। আর চীনের মতো শক্তিশালী বন্ধু এই সংকট সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালু করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন থেকে নিয়মিত ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ হবে।

মাহদী আমিন জানান, বাংলাদেশের বহুল প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়। নদীশাসন ও পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দেশটির ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। ঝাও লেজি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে তারেক রহমান একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে চীনের বিপ্লবী বীরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন প্রমুখ।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে গত বুধবার বিকেলে বেইজিং পৌঁছান তারেক রহমান। এর আগে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোসে অংশ নিতে চীনের দালিয়ানে যান।

দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২১ জুন প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখান থেকে সরাসরি চীনে যান তিনি। আজ বিকেল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা।

Ad 300x250

সম্পর্কিত