কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা-অগ্নিসংযোগ, পীর নিহত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড়ে শামীম বাবার দরবার শরিফে হামলা চালায় স্থানীয়রা। স্ট্রিম ছবি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে একটি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মাজারের প্রধান আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে (৬৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড়ে শামীম বাবার দরবার শরিফে এ হামলা হয়।

শামীম রেজা ফিলিপনগর গ্রামের মৃত জেছের আলী মাস্টারের ছেলে। দৌলতপুর থানার ওসি আরিফুর রহমান জানান, স্থানীয়দের হামলায় গুরুতর আহত হন শামীম রেজা। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা সাড়ে ৪টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শামীম রেজা রাজধানীতে মাস্টার্স শেষ করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। পরে এলাকায় ফিরে ফিলিপনগরে আস্তানা গড়েন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ২০২১ সালে দৌলতপুর থানার মামলায় গ্রেপ্তার হন শামীম। দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে সম্প্রতি মুক্তি পেয়ে তিনি আবারও আস্তানা চালু করেন। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার সকালে সামাজিক মাধ্যমে একটি একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শামীমকে কুরআন সম্পর্কে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। কিন্তু একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে শামীমসহ অন্তত চারজন আহত হন। পরে পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, গুরুতর অবস্থায় শামীম রেজাকে হাসপাতালে আনা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শামীম রেজা জাহাঙ্গীরের লাশ ঘিরে স্বজনের আহাজারী। স্ট্রিম ছবি
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শামীম রেজা জাহাঙ্গীরের লাশ ঘিরে স্বজনের আহাজারী। স্ট্রিম ছবি

ফিলিপনগরের বাসিন্দা মাসুম হোসেন জানান, শামীম রেজার কর্মকাণ্ডে স্থানীয়রা বিরক্ত ছিলেন। নিষেধ করা হলেও তিনি তা মানেননি। শনিবার সকালে তাঁর একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা আস্তানায় হামলা চালায়। কুরআন নিয়ে কথা বলার কারণে উত্তেজিত জনতা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান একরামুল হক।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেছেন, পুরোনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়। খবর পেয়ে শামীম রেজাকে উদ্ধার করা হলেও বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশের সদস্য কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

তিনি বলেন, শামীম রেজাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে, সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হামলায় জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জড়িতদের শাস্তির দাবি এনসপি ও মাকামের

মাজারে হামলা ও শামীম রেজা নিহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) সালেহ উদ্দিন সিফাতের সই করা বিবৃতিতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়েছে।

এনসিপি মনে করে, ধর্ম অবমাননা বা এ ধরনের যেকোনো অভিযোগের তদন্ত ও বিচারের একমাত্র আইনানুগ কর্তৃপক্ষ আদালত। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অগ্নিসংযোগ ও হত্যা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। স্থানীয় ক্ষমতার ছত্রছায়া ব্যতীত এ ধরনের ‘মব-সহিংসতা’ সম্ভব নয়। সরকার বারবার ‘মব সংস্কৃতি’ বন্ধের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করতে পারছে না। বরং রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ নামের সংগঠন বিবৃতিতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি সারা দেশের মাজার ও দরগাহ সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে এখন পর্যন্ত দেশের ৯৭টি মাজারে হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে মাকাম। তাদের তথ্যে, এসব হামলায় তিনজন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন। ১১টি ঘটনায় মামলা হলেও একটিরও বিচার কাজে অগ্রগতি নেই।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত