leadT1ad

প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে ইসির ‘দ্বিচারিতা’

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ২৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠেছে। মনোনয়ন বাতিল হওয়া অনেক প্রার্থীর ভাষ্য, দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে একই ধরনের নথিপত্র দাখিল করলেও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা মুখ দেখে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে সারাদেশে ৩০০ আসনে ৭২৩ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির ২৫, জামায়াতে ইসলামীর ১০, এনসিপির ৩, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯, জাতীয় পার্টির (জাপা) ৫৯, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ২৫ ও স্বতন্ত্র ৩৩৮ জন রয়েছেন। বাকিরা অন্যান্য দলের।

দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় কতজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। নির্বাচন পরিচালনা অধিশাখা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তারা এটি সংগ্রহ করতে পারেনি। তবে সিলেট, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম ও শেরপুরে জামায়াতে ইসলামীর চারজন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একজন ও বিএনপির চার প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের তথ্য পেয়েছে ইসি।

নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনীতিকদের অভিযোগ

গত রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, বিশেষ মহলের ইন্ধনে বিভিন্ন জেলায় তুচ্ছ ও অহেতুক কারণে তাঁদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে হচ্ছে, কোনো একটি মহলের ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে। এমন চলতে থাকলে আগামী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না, তা নিয়ে দেশবাসীর মনে প্রশ্ন জাগছে।’

অন্যদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের আচরণ একপাক্ষিক হলে নির্বাচনের কোনো প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। গতকাল সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত শেষে ‘আজাদির যাত্রা’র সময় সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বিএনপি গণতন্ত্র রক্ষা করতে চাইলে প্রশাসনের নগ্ন আচরণের বিরুদ্ধে তাদেরও কথা বলতে হবে।’

হবিগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান ইসির দ্বৈত নীতি নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘কুড়িগ্রাম-৩ আসনে মাহবুব সালেহী ভাইয়ের মনোনয়ন বাতিলে ডিসির অজ্ঞতা এবং ফ‍্যাসিবাদি আচরণ দেখে মনে হল ফ‍্যাসিবাদ এখনো রয়ে গেছে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মাহবুব সালেহী ভাই ব্রিটেনের পদ্ধতি অনুসরণ করেই ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত‍্যাগের আবেদন করেছেন। একই পদ্ধতি অনুসরণ করে সিলেট-৩ আসনে বিএনপির এম এ মালেক, ফেনীর একটি আসনে আবদুল আওয়াল মিন্টু, দিনাজপুরের একটি আসনে বিএনপির আরেক প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব ত‍্যাগ করেছেন। আমার জানামতে এমন আরও ৫/৭ জন একই পদ্ধতিতে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত‍্যাগের আবেদন জমা দিয়েছেন। তাদের সবার (মনোনয়ন) বৈধ হয়েছে। একমাত্র কুড়িগ্রামের ডিসি ব‍্যতিক্রম আচরণ করেছেন।’

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আবদুর রহমানেল মাছউদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘এখানে দুইটা জিনিস, ইলেকশন কমিশনের সকল রিটার্নিং অফিসারের ওপর কন্ট্রোল রয়েছে। রিটার্নিং অফিসাররা আমাদের পক্ষ থেকে সকল কাজ করে থাকেন। একটা বিষয়ে তাঁরা শুধু ইন্ডিপেন্ডেন্ট (স্বাধীন), সেটি হলো, প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা। কারণ এটা আইনের বিষয়।

ইসির জবাব

মনোনয়নপত্র বাছাই প্রক্রিয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ভঙের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আজ মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আবদুর রহমানেল মাছউদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘এখানে দুইটা জিনিস, ইলেকশন কমিশনের সকল রিটার্নিং অফিসারের ওপর কন্ট্রোল রয়েছে। রিটার্নিং অফিসাররা আমাদের পক্ষ থেকে সকল কাজ করে থাকেন। একটা বিষয়ে তাঁরা শুধু ইন্ডিপেন্ডেন্ট (স্বাধীন), সেটি হলো, প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা। কারণ এটা আইনের বিষয়। এর বিরুদ্ধে যে কেউ আপিলও করতে পারে। তখন আমরা সেটাকে আমাদের মতো করে ঠিক করে দেবো।’

দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে ইসি দ্বৈত নীতি বাস্তবায়ন করছে এমন অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি বলছেন যে, এক জায়গায় এক্সেপ্ট (গ্রহণ) করেছে আরেক জায়গায় বাতিল করেছে, তাহলে ইউনিফরমিটি ভঙ্গ হয়ে গেল, ইনকনসিস্টেন্ট (অসঙ্গতি) হয়ে গেল। নোয়াখালীরজন করে দিলো, আবার চিটাগাংগের রিটার্নিং অফিসার করে নাই, তাহলে এটা একটা এনামলি (অনিয়ম), ইনকনসিস্টেন্ট হয়ে গেল। এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে যে, যেখানে এক্সেপ্ট করেছে বা যেখানে রিজেক্ট (বাতিল) করেছে, তাদের তো আপিল করার এখতিয়ার আছে। কমিশনে আপিল করলে আমরা ওটা আমাদের মতো ইউনিফর্ম করব। ইনকনসিস্টেন্টকে এক রকম করার চেষ্টা করব। যে সমস্ত জায়গায় আপিল কোনোটাই হবে না সেক্ষেত্রে কী করা যায় সেটাও আমরা চিন্তা করছি।’

এর আগে গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও প্রায় একই কথা জানিয়েছেন। ওইদিন সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে মনোনয়নপত্র বাতিল ও বৈধতার বিরুদ্ধে আপিলের জন্য স্থাপিত বুথ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, যাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে কিংবা যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে—উভয় ক্ষেত্রেই আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করা যাবে। এসব আপিলের শুনানি ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত কমিশনের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।

দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার অভিযোগ প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, ‘গণমাধ্যমে যদি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই এর বিরুদ্ধে আপিল হবে। আমরা ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করি।’

দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় যাদের মনোনয়ন বাতিল

সিলেট-১ আসনের প্রার্থী এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক এহতেশাম হকের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায়। একই জটিলতায় চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে জামায়াত প্রার্থী ড. এ কে এম ফজলুল হক ও কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে একই দলের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। একই জটিলতায় শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনে বিএনপি–মনোনীত প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। তাঁর অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ছিল।

তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা থাকার পরেও কয়েকটি আসনে বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল না করা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরা। তাঁরা বলছেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ফেনী-৩ আসনের মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, সিলেট-৩ আসনের এমএ মালেক ও সুনামগঞ্জ-৩ আসনের মোহাম্মদ কয়ছর আহমদের ব্যাপারে একই রকম অভিযোগ থাকার পরেও তাঁদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়নি।

সারওয়ার আলমকে ইঙ্গিত করে এহতেশাম হক বলেন, ‘এটা অবিচার। এটা তো হতে পারে না। আমার ক্ষেত্রে আপনি প্রত্যাশা করেন ছুটির দিনে আমি জোর করে হোম অফিস খুলে নিয়ে আসব। আবার বিএনপির প্রার্থীর ক্ষেত্রে বলেন, হোম অফিস বন্ধ, আজকে লাস্ট ডেট—আপনার এই যে সদয় “মানবিক” দৃষ্টিভঙ্গি এটা কেন আমি পেলাম না?’

মনোনয়ন বাতিলের পরে সিলেট–১ আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী এহতেশাম হক আজ মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সিলেটে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন। সেখানে তিনি জানান, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ইউকে বিএনপির সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট এম এ মালেকের মতো তিনিও যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের নথিপত্র রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিয়েছেন। কিন্তু মালেকের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও তাঁর মনোনয়ন বাতিল করে দ্বৈত নীতির বাস্তবায়ন করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম।

সারওয়ার আলমকে ইঙ্গিত করে এহতেশাম হক বলেন, ‘এটা অবিচার। এটা তো হতে পারে না। আমার ক্ষেত্রে আপনি প্রত্যাশা করেন ছুটির দিনে আমি জোর করে হোম অফিস খুলে নিয়ে আসব। আবার বিএনপির প্রার্থীর ক্ষেত্রে বলেন, হোম অফিস বন্ধ, আজকে লাস্ট ডেট—আপনার এই যে সদয় “মানবিক” দৃষ্টিভঙ্গি এটা কেন আমি পেলাম না?’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এহতেশাম হক বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের হোম অফিস কর্তৃপক্ষ রিটার্নিং অফিসারকে নিশ্চিত করবেন কার আবেদন পেয়েছেন বা কার আবেদন পান নাই। রিটার্নিং কর্মকর্তাকে মালেক সাহেবের আবেদন পাওয়ার তথ্য কি যুক্তরাজ্যের হোম অফিস নিশ্চিত করেছে? রিটার্নিং অফিসার হোম অফিস থেকে কোনো কনফার্মেশন পেয়েছেন? পান নাই, উনি (সারওয়ার আলম) বলেছেন হোম অফিস বন্ধ। এহতেশাম হকের জন্য কি হোম অফিস খোলা?’

কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী মনোনয়ন বাতিলের পরে অভিযোগ করেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাঁর কোনো কথা না শুনেই মনোনয়ন বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘কোনো কাগজ না দেখেই কুড়িগ্রামের ডিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

তিনি জানান, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার ব্যাপারে তিনি যেসব নথিপত্র দাখিল করেছেন একই রকম নথিপত্র দাখিল করেছেন আরও অনেকে। তাঁদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও তাঁর মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করে দ্বৈত ভূমিকা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ফখরুদ্দীন মানিক দাবি করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। নাগরিকত্ব পরিত্যাগের কোনো প্রমাণপত্র জমা না দেওয়ার পরও মিন্টুর মনোনয়নপত্রটি বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

স্ট্রিমকে ফখরুদ্দীন মানিক বলেছেন, ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো ডুকুমেন্টস সাবমিট করা ছাড়াই মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়েছেন ফেনী-৩ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু।’

আব্দুল আউয়াল মিন্টুর বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে ফোন ধরেন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী হুমায়ুন। বিষয়টি নিয়ে স্ট্রিমকে ইসির সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেন তিনি। তিনি এ-ও বলেন, ‘এ ব্যাপারে স্যারের কাছে কোনো তথ্য নেই।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত