সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরকারি দলের মনোনয়ন পেতে শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। সাধারণ নির্বাচনের পরপরই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই আসনগুলো নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। মূলত দলের নারী নেতাকর্মীদের সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ ব্যবস্থার প্রবর্তন। তবে সাধারণ আসনের মতো এই নির্বাচন প্রত্যক্ষ ভোটে হয় না; বরং এর মনোনয়ন ও সিলেকশন প্রক্রিয়া নির্ভর করে বেশ কিছু গাণিতিক হিসাব ও দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর।
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয় নিয়ে সরকার গঠন করেছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮ আসন। বিধি অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আসন বণ্টনের গাণিতিক সূত্র
সংবিধান ও ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ অনুযায়ী, সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন ৩০০টি সাধারণ আসনের ওপর ভিত্তি করে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। সহজ কথায় বলতে গেলে, প্রতি ৬ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের বিপরীতে একটি দল ১টি করে সংরক্ষিত নারী আসন পায়। এই সূত্র অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হওয়ায় তারা ৩৫টি সংরক্ষিত আসন পাবে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পাওয়ায় তাদের ভাগে জুটবে ১১টি আসন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১টি আসন। বাকি তিন আসন নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা জোট করলে এবং নিজস্ব প্রতীকে জয়ী দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছালে তারা পাবেন।
মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও দলের ভূমিকা
সংরক্ষিত আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার একক ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে থাকে। আইন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন প্রতি দলের প্রাপ্ত আসনের সংখ্যা জানিয়ে দেয় এবং সেই অনুযায়ী দলগুলোকে প্রার্থীতালিকা জমা দিতে বলে। দলের নীতিনির্ধারকরা তখন তাঁদের দলের নারী কর্মীদের মধ্য থেকে যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করেন।
বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী এবং মহিলা দলের নেত্রীরা নিজেদের বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের ফিরিস্তি তুলে ধরে বায়োডাটা বা জীবনবৃত্তান্ত জমা দিচ্ছেন। কেউ কেউ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগও করছেন। দলের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এবার মনোনয়নে নবীন ও প্রবীণের সমন্বয় ঘটানো হবে। আফরোজা আব্বাস, সুলতানা আহমেদ, শিরিন সুলতানা, নিপুণ রায় চৌধুরীর মতো পুরনো মুখের পাশাপাশি অনেক তরুণ নেত্রীকেও দেখা যেতে পারে। এমনকি কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীনের নামও আলোচনায় রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীও তাদের মহিলা বিভাগ থেকে পরামর্শ নিয়ে একটি খসড়া তালিকা তৈরি করছে। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানিয়েছেন, তাঁরা সংসদে ভূমিকা রাখতে পারবেন এমন যোগ্য নারীদেরই মনোনয়ন দেবেন।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ‘ডামি’ নির্বাচনে জিতে সংরক্ষিত নারী আসনে ১৫৪৯টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছিল আওয়ামী লীগ।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও ভোটাভুটি
আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে মনোনয়ন দাখিল, বাছাই ও প্রত্যাহারের সময়সীমা ঠিক করে দেয়। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রতিটি প্রার্থীর জামানত হিসেবে ২০ হাজার টাকা জমা দিতে হয়।
যেহেতু দলগুলো তাদের প্রাপ্য কোটা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয়, তাই সাধারণত ভোটের প্রয়োজন হয় না। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনেই একক প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। সাধারণত দল যাকেই মনোনয়ন দেয়, তিনিই শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
সংসদে ভূমিকা ও সুযোগ-সুবিধা
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতোই সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। তাঁদের বেতন, ভাতা, শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা এবং প্লট বরাদ্দের অধিকার সাধারণ সংসদ সদস্যের মতোই। তবে কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা থাকে। একজন সংরক্ষিত নারী এমপি সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন না; বরং তাঁকে জেলাভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সর্বোচ্চ দুটি জেলার উন্নয়ন কাজ তদারকি করতে পারেন।
সমালোচকরা অবশ্য বলেন, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় সংরক্ষিত নারী এমপিদের জবাবদিহি ও ক্ষমতায়নের জায়গা কিছুটা দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা দলীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কথা বলতে পারেন না। পারিবারিক পরিচয় বা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথের লড়াকু নেত্রীদের মূল্যায়ন করার প্রবণতা বাড়ছে, যা ইতিবাচক।
সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যদিও এর মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আছে, তবুও এই ব্যবস্থা সংসদে নারীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। এবারের সংসদে বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলগুলো কাদের মনোনয়ন দেয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী। নবীন ও মেধাবী নারীদের অংশগ্রহণ সংসদের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে।