ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহর সাক্ষাৎকার
ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটিতে উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক (ভিজিটিং)। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মাস্টার্স ও পিএইচডি অর্জন করেন। অধ্যাপনা করেছেন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়া (২০১৪-২২) ও মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে (২০২২-২৪)। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস) এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি প্রফেসরিয়াল ফেলো হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তাসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও ‘শিক্ষার মান’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে—সে বিষয়ে স্পষ্টতা কম। আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার মান বলতে আসলে কী বোঝানো উচিত?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: তিনটি দলই মূলত ‘কুইক উইন’ বা দ্রুত দৃশ্যমান ফলাফল এবং অবকাঠামোর ওপর জোর দিয়েছে, কিন্তু পরিমাপযোগ্য শিখন ফলের বিষয়টি এখানে চরমভাবে উপেক্ষিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘শিক্ষার মান’ বলতে সনদের চেয়ে দক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। আমার দৃষ্টিতে এখানে তিনটি বিষয় থাকা জরুরি। প্রথমত, আমাদের মৌলিক সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার জন্য সময়াবদ্ধ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে; উদাহরণস্বরূপ, ২০৩০ সালের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণির ৭৫% শিক্ষার্থী যেন চতুর্থ শ্রেণির পাঠ্য পড়ার সক্ষমতা অর্জন করে—এমন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বর্তমান শিক্ষা নেতৃত্ব যেহেতু বাংলাদেশকে বৈশ্বিক রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তাই আমাদের শিখন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অবশ্যই বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে। (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম এ্যাসেসমেন্ট - পিআইএসএ) বা (দ্য ট্রেন্ড ইন ইন্টারন্যাশনার ম্যাথমেটিকস এ্যন্ড সায়েন্স স্টাডি - টিআইএমএসএস) এর মতো আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতি না রাখলে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা প্রতিযোগিতামূলক, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। তৃতীয়ত, আমাদের পরিমাপযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপির ইশতেহারে উল্লিখিত “আনন্দের সাথে শিক্ষা” বা “শিক্ষার্থীর মর্যাদা”র মতো ধারণাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও এগুলো স্মার্ট মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না। সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা না গেলে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা কিংবা নেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা অসম্ভব।
স্ট্রিম: ইশতেহারগুলোতে অবকাঠামো, ডিজিটাল শিক্ষা ও নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষণ–শিখন প্রক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো কি মূল সমস্যাটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: দুর্ভাগ্যবশত, কোনো রাজনৈতিক দলই আন্তর্জাতিক একাডেমিক গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত আমলে নেয়নি। দলগুলোর ইশতেহারে অবকাঠামো-কেন্দ্রিক চিন্তা বা ‘হার্ডওয়্যার মুখী প্রবণতা’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা গত ১৫ বছরের ক্ষমতাসীনদের কৌশলেরই প্রতিফলন। রাজনৈতিকভাবে ট্যাবলেট কিংবা নতুন ভবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বেশ ফটোজেনিক বা দৃষ্টিনন্দন, কিন্তু এগুলো শিক্ষার মূল লক্ষ্য নয় বরং লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম মাত্র। শিক্ষার প্রকৃত ‘সফটওয়্যার’ অর্থাৎ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়া, তা এখানেও চরমভাবে অবহেলিত রয়ে গেছে। একইভাবে, শিক্ষকদের হাতে লেসন প্ল্যান টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক কিংবা ডিজিটাল ট্র্যাকিং টুলস সম্বলিত ট্যাবলেট তুলে দেওয়ার আগে আমাদের একটি মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষের সংস্কৃতি আমূল পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য যে প্রাক-চাকরি ও ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো দলের ইশতেহারেই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আমি দেখছি না। তারা মূলত শিক্ষার প্রকৃত রোগ অর্থাৎ সেকেলে শিক্ষাদান পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে কেবল বাহ্যিক উপসর্গের চিকিৎসা করছে।
স্ট্রিম: বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—তিন দলেরই ইশতেহারে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও আদর্শিক শিক্ষার ওপর জোর দেখা যায়। আপনার মতে, মূল্যবোধ শিক্ষা আর আধুনিক দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব? মাদ্রাসা শিক্ষা কি যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: মূল্যবোধ এবং আধুনিক দক্ষতার ভারসাম্য রক্ষা করার সূত্রটি নিহিত আছে ‘সার্বজনীন নৈতিকতা’ বা ‘ইউনিভার্সাল এথিক্স’-এর মধ্যে। সততা, সহানুভূতি এবং নাগরিক কর্তব্যের মতো এই গুণাবলিগুলো ইউনেস্কোর ‘একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা’ এবং ম্যাকিনসে-র ‘৫৬ ডেল্টা’র অবিচ্ছেদ্য অংশ। নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রচ্ছন্ন সংস্কার বা পক্ষপাতগুলো দূর করতে হবে। সাধারণ স্কুলগুলো আসলে মাদরাসা শিক্ষার সেই দিকগুলো থেকে ‘সার্বজনীন নৈতিকতা’ শিখতে পারে যেগুলোতে মাদরাসারা ঐতিহাসিকভাবেই সফল; কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ও খণ্ডিত পরিকল্পনা এই জ্ঞানবিনিময়ের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে। দুর্ভাগ্যবশত, সব দলের ইশতেহারেই ‘মাদরাসা সাইলো’ বা মাদরাসাকে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের নীতিগত চিন্তাগুলো এখনো খণ্ডিত; এখানে মাদরাসা শিক্ষাকে হয় উপেক্ষা করা হচ্ছে, নয়তো একেবারে আলাদা একটি বিষয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রয়োজন মানদণ্ডের সমতা। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন একজন মাদরাসা গ্র্যাজুয়েট সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীর মতোই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে, যাতে তারা আধুনিক অর্থনীতি থেকে ছিটকে না পড়ে।
স্ট্রিম: নারী শিক্ষা ও জেন্ডার সমতার প্রশ্নে তিনটি দলের অবস্থানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। আপনার মতে, শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনটি?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: বাংলাদেশে নারী শিক্ষার আসল চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার স্তরগুলোর মধ্যে নিরাপদ উত্তরণ নিশ্চিত করা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণে আমরা জেন্ডার সমতা অর্জন করলেও মাধ্যমিক স্তরে এসে ঝরে পড়ার হার ব্যাপক; যার অন্যতম মূল কারণ বাল্যবিবাহ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন করতে হলে আমাদের শুধু ক্লাসরুমের কথা ভাবলে চলবে না; বরং দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, ‘বিবাহ সংক্রান্ত সামাজিক প্রথা বা রীতির ব্যবধান’ ঘুচিয়ে আনা। জামায়াতে ইসলামী একটি নারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএনপি স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও, এগুলো কেবল জনতোষণমূলক বা খণ্ডিত পদক্ষেপ হিসেবেই থেকে যাবে যদি না আমরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের সামাজিক ‘ব্যয়’ বা মূল্য দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করি। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মানেই হলো বাল্যবিবাহের সামাজিক প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করা, যা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন। সামাজিক রীতির পরিবর্তনের পাশাপাশি সরকারকে মেয়েদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই সামাজিক ও কাঠামোগত বাধাগুলো দূর করার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া ‘বিনামূল্যে শিক্ষা’ কেবল একটি চমকপ্রদ শিরোনাম হিসেবেই থেকে যাবে, যা সেইসব মেয়েদের কাছে পৌঁছাবে না যাদের এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
স্ট্রিম: তিনটি দলই শিক্ষায় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বেশি টাকা মানেই কি ভালো শিক্ষা? নাকি ব্যয়ের কাঠামো ও জবাবদিহিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন, তবে আমাদের বর্তমান শিক্ষা সংকটের প্রধান কারণ হলো ব্যয়ের অদক্ষতা। এটি একটি ট্র্যাজেডি যে, যখন হাজার হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে আছে, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের বাজেটের বড় অংশ খরচই করতে পারছে না। গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে গেছে। এছাড়া বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে অপচয় হয়। শুধুমাত্র টাকার অঙ্ক বাড়ানোর চেয়ে সামাজিক অডিট এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক অর্থায়নের মতো জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও পাবলিক প্রজেক্ট বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে এখনো কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। তাই শিক্ষায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, বরং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন। সবশেষে, আমাদের উন্নয়ন ব্যয়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, ডিজিটাল ল্যাব তৈরি কিংবা মূল্যায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে কতটুকু খরচ করা হবে—সেই সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই এই উদ্যোগগুলো ‘শিখন ফলে’ কতটা প্রভাব ফেলছে তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে নিতে হবে।
স্ট্রিম: শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও মর্যাদার প্রশ্নটি সব ইশতেহারেই আছে, কিন্তু শিক্ষককে এখনো মূলত একজন ‘সরকারি কর্মচারী’ হিসেবে দেখা হয়। আপনার মতে, শিক্ষককে কীভাবে একজন ‘লার্নিং প্রফেশনাল’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শিক্ষককে একজন ‘কেরানি’ থেকে ‘প্রফেশনাল’ বা পেশাদার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে আমাদের তিনটি প্রধান দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগের রাজনৈতিকীকরণ বন্ধ করা। গত ১৫ বছর ধরে ‘সরকারি কর্মচারী’ তকমাটি মূলত দলীয় নিয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে আমাদের স্কুলগুলো এমন অনেক অযোগ্য দলীয় লোক দিয়ে ভরে গেছে যাদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়াও কঠিন, কারণ তারা এই পেশায় এসেছিলেন ভুল উদ্দেশ্যে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। পেশাদারিত্বের জন্য প্রয়োজন শিক্ষককে তার শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠদান পদ্ধতি পরিবর্তনের স্বাধীনতা দেওয়া; তিনি কেবল সরকারি মেমোর আজ্ঞাবহ বাস্তবায়নকারী হবেন না। সবশেষে, শিক্ষকদের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা পেশাদার সার্ভিস ক্যাডার এবং স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো তৈরি করা। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগের জন্য একটি আলাদা পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যাতে রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে মেধা প্রতিফলিত হয়।
স্ট্রিম: জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির ইশতেহারে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি কতটা যথাযথ?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এটি একটি দুধারী তলোয়ারের মতো। একদিকে, দৃঢ় নৈতিকতা দুর্নীতিজনিত বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে; অন্যদিকে, কেবল ‘আদর্শিক শুদ্ধতার’ ওপর মাত্রাতিরিক্ত জোর দেওয়া ভিন্নমত এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা উদ্ভাবনের জন্য অপরিহার্য। তবে, এই মূল্যবোধগুলোকে যদি ম্যাকিনসে-র ‘ডেল্টা’ ফ্রেমওয়ার্কের আলোকে নতুনভাবে সাজানো হয়, তবে সেগুলো ‘সেলফ-লিডারশিপ’ এবং ‘এথিক্স’-এর সমার্থক হয়ে ওঠে—যা একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হবে এটি নিশ্চিত করা যে, তাদের দেওয়া মূল্যবোধের শিক্ষা যেন আধুনিক উচ্চ-প্রযুক্তির বিশ্ব অর্থনীতির উপযোগী মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে প্রতিস্থাপন না করে বরং তার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
স্ট্রিম: বিএনপির ইশতেহারে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইঙ্গিত রয়েছে। আপনার মতে, স্কুল পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসন শিক্ষার মান উন্নয়নে কতটা কার্যকর হতে পারে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: স্বায়ত্তশাসন বা বিকেন্দ্রীকরণ তখনই কার্যকর হয় যখন ক্ষমতা সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায়। বাংলাদেশে স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলো দীর্ঘকাল ধরে চরমভাবে রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছে। এখন স্বায়ত্তশাসনের নামে যদি ক্ষমতা আবারও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে তা ব্যর্থ হবে এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে। প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন হওয়া উচিত আর্থিক এবং শিক্ষাক্রম সংক্রান্ত, যা প্রধান শিক্ষক এবং অভিভাবকদের স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার ঘাটতিগুলো মোকাবিলায় ক্ষমতায়ন করবে। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের পরামর্শটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; তারা প্রস্তাব করেছেন যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটিগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিবর্তে সরকারি কর্মকর্তাদের রাখা উচিত। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে স্কুল পরিচালনা ব্যবস্থাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা, যাতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আনুকূল্যের বদলে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়।
স্ট্রিম: তিনটি ইশতেহারেই কারিগরি ও দক্ষতা শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো একাডেমিক ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এই কাঠামোগত দ্বন্দ্ব কীভাবে সমাধান করা যেতে পারে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এই কাঠামোগত দ্বন্দ্ব নিরসনে আমাদের প্রথম কাজ হলো শিল্পখাত বা ইন্ডাস্ট্রিকে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা। শিল্পখাতকে কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সুযোগ দিতে হবে; এতে বর্তমানের সংকীর্ণ ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ধারার অবসান ঘটবে এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী শিক্ষা পাবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের ‘মানবিক উপাদান’ বা হিউম্যান এলিমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা যেন কারিগরি শিক্ষাকে কেবল বাজারজাতযোগ্য কিছু ‘হার্ড স্কিল’ বা যান্ত্রিক দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে দ্রুত যান্ত্রিক দক্ষতাগুলোর স্থান দখল করে নিচ্ছে, তাতে উদারনৈতিক শিক্ষার মূল ভিত্তি ‘সফট স্কিল’ বা সূক্ষ্ম দক্ষতাগুলোই ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে ‘লার্নিং ক্রাইসিস’ বা শেখার ঘাটতির বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আপনার মতে, এই সংকট কি রাজনৈতিক ইশতেহারগুলোতে যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: একেবারেই না। এটি একটি ‘নীরব জরুরি অবস্থা’ যা ইশতেহারগুলোতে চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার মূলত বিভিন্ন ‘ইনপুট’ বা শিক্ষা উপকরণের (যেমন অবকাঠামো ও সরঞ্জাম) ওপর আলোকপাত করেছে, কিন্তু শিক্ষার্থীর প্রকৃত অর্জনের বিষয়টি সেখানে অনুপস্থিত। শিখন ফলের সাথে এই উদ্যোগগুলোর সম্পর্ক কী হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা—মূলত ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের যে ব্যাপক শিখন ঘাটতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কোনো ‘জাতীয় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা’ ইশতেহারে দেখা যাচ্ছে না। এই ‘তথ্য-প্রমাণহীন চিন্তা’ বা এভিডেন্স-ফ্রি থিংকিং প্রমাণ করে যে, আমাদের শিখন ঘাটতি কতটা গভীরে এবং এটি জাতির ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার জন্য কতটা হুমকিস্বরূপ, সে সম্পর্কে দলগুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির অভাব রয়েছে। নতুন সরকারের থেকে আমার প্রত্যশা যে এই অতীতের প্রমান ব্যাতিরেখে নীতিপ্রণয়নের অপসংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না করা ।
স্ট্রিম: ইশতেহারগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হলেও ডিজিটাল বৈষম্যের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম এসেছে। প্রযুক্তি কি শিক্ষায় বৈষম্য কমাবে, না বাড়াবে—আপনার মূল্যায়ন কী?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: একটি শক্তিশালী ‘সাম্য কাঠামো’ ছাড়া প্রযুক্তি শিক্ষার বৈষম্য কমানোর বদলে উল্টো বৈষম্যের এক বিশাল গুণক হিসেবে কাজ করবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আমাদের শিক্ষকদের অপ্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা। শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসকদের প্রস্তুত না করে কেবল ডিজিটাল এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাওয়া এক ধরনের ‘নকল’ বা লোকদেখানো কর্মসূচি ছাড়া আর কিছু নয়। এর ফলে আমরা হয়তো শিক্ষকদের হাতে ট্যাবলেট তুলে দেব, কিন্তু সেটি ব্যবহারের সক্ষমতা বা সঠিক নির্দেশনার অভাবে প্রকৃত শিখনের কোনো উন্নতি হবে না। এটি মূলত শহুরে উচ্চবিত্ত এবং প্রান্তিক গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। গত মাসে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আমার ‘আইসিটি হোয়াইট পেপার টাস্কফোর্স’ রিপোর্টে আমি এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি এবং জোর দিয়েছি যে, প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি কেবল প্রতীকি হলে চলবে না, একে হতে হবে পদ্ধতিগত।
স্ট্রিম: যুব বেকারত্ব ও শিক্ষার মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, ইশতেহারগুলো তা স্বীকার করলেও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ কম। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের এই বিচ্ছিন্নতা কীভাবে কমানো যায়?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শ্রেণিকক্ষ এবং কর্মক্ষেত্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব ঘোচাতে আমাদের দেশে বর্তমানে কোনো ‘জাতীয় শিক্ষানবিশ আইন’ নেই। এছাড়া, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত বিপুল সংখ্যক ‘লিবারেল আর্টস’ বা মানবিক শাখার গ্র্যাজুয়েট আমাদের অর্থনীতির জন্য এখন টেকসই নয়। এই সমস্যা সমাধানে আমাদের দ্বিমুখী কৌশল নিতে হবে: প্রথমত, যেসব বিষয়ের বাজার চাহিদা কম এবং যেখানে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, সেসব বিষয়ে আসন সংখ্যা সীমিত করতে হবে; এবং দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং কারিগরি ট্রেড সেক্টরগুলোতে বড় ধরনের ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ফলাফলকে প্রকৃত বাজার চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক টিকে থাকার স্বার্থে এটি এখন অপরিহার্য।

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটিতে উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক (ভিজিটিং)। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মাস্টার্স ও পিএইচডি অর্জন করেন। অধ্যাপনা করেছেন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়া (২০১৪-২২) ও মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে (২০২২-২৪)। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস) এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি প্রফেসরিয়াল ফেলো হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তাসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্ট্রিম: তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও ‘শিক্ষার মান’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে—সে বিষয়ে স্পষ্টতা কম। আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার মান বলতে আসলে কী বোঝানো উচিত?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: তিনটি দলই মূলত ‘কুইক উইন’ বা দ্রুত দৃশ্যমান ফলাফল এবং অবকাঠামোর ওপর জোর দিয়েছে, কিন্তু পরিমাপযোগ্য শিখন ফলের বিষয়টি এখানে চরমভাবে উপেক্ষিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘শিক্ষার মান’ বলতে সনদের চেয়ে দক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। আমার দৃষ্টিতে এখানে তিনটি বিষয় থাকা জরুরি। প্রথমত, আমাদের মৌলিক সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার জন্য সময়াবদ্ধ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে; উদাহরণস্বরূপ, ২০৩০ সালের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণির ৭৫% শিক্ষার্থী যেন চতুর্থ শ্রেণির পাঠ্য পড়ার সক্ষমতা অর্জন করে—এমন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বর্তমান শিক্ষা নেতৃত্ব যেহেতু বাংলাদেশকে বৈশ্বিক রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তাই আমাদের শিখন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অবশ্যই বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে। (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম এ্যাসেসমেন্ট - পিআইএসএ) বা (দ্য ট্রেন্ড ইন ইন্টারন্যাশনার ম্যাথমেটিকস এ্যন্ড সায়েন্স স্টাডি - টিআইএমএসএস) এর মতো আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতি না রাখলে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা প্রতিযোগিতামূলক, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। তৃতীয়ত, আমাদের পরিমাপযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপির ইশতেহারে উল্লিখিত “আনন্দের সাথে শিক্ষা” বা “শিক্ষার্থীর মর্যাদা”র মতো ধারণাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও এগুলো স্মার্ট মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না। সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা না গেলে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা কিংবা নেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা অসম্ভব।
স্ট্রিম: ইশতেহারগুলোতে অবকাঠামো, ডিজিটাল শিক্ষা ও নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষণ–শিখন প্রক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো কি মূল সমস্যাটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: দুর্ভাগ্যবশত, কোনো রাজনৈতিক দলই আন্তর্জাতিক একাডেমিক গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত আমলে নেয়নি। দলগুলোর ইশতেহারে অবকাঠামো-কেন্দ্রিক চিন্তা বা ‘হার্ডওয়্যার মুখী প্রবণতা’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা গত ১৫ বছরের ক্ষমতাসীনদের কৌশলেরই প্রতিফলন। রাজনৈতিকভাবে ট্যাবলেট কিংবা নতুন ভবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বেশ ফটোজেনিক বা দৃষ্টিনন্দন, কিন্তু এগুলো শিক্ষার মূল লক্ষ্য নয় বরং লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম মাত্র। শিক্ষার প্রকৃত ‘সফটওয়্যার’ অর্থাৎ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়া, তা এখানেও চরমভাবে অবহেলিত রয়ে গেছে। একইভাবে, শিক্ষকদের হাতে লেসন প্ল্যান টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক কিংবা ডিজিটাল ট্র্যাকিং টুলস সম্বলিত ট্যাবলেট তুলে দেওয়ার আগে আমাদের একটি মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষের সংস্কৃতি আমূল পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য যে প্রাক-চাকরি ও ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো দলের ইশতেহারেই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আমি দেখছি না। তারা মূলত শিক্ষার প্রকৃত রোগ অর্থাৎ সেকেলে শিক্ষাদান পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে কেবল বাহ্যিক উপসর্গের চিকিৎসা করছে।
স্ট্রিম: বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—তিন দলেরই ইশতেহারে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও আদর্শিক শিক্ষার ওপর জোর দেখা যায়। আপনার মতে, মূল্যবোধ শিক্ষা আর আধুনিক দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব? মাদ্রাসা শিক্ষা কি যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: মূল্যবোধ এবং আধুনিক দক্ষতার ভারসাম্য রক্ষা করার সূত্রটি নিহিত আছে ‘সার্বজনীন নৈতিকতা’ বা ‘ইউনিভার্সাল এথিক্স’-এর মধ্যে। সততা, সহানুভূতি এবং নাগরিক কর্তব্যের মতো এই গুণাবলিগুলো ইউনেস্কোর ‘একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা’ এবং ম্যাকিনসে-র ‘৫৬ ডেল্টা’র অবিচ্ছেদ্য অংশ। নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রচ্ছন্ন সংস্কার বা পক্ষপাতগুলো দূর করতে হবে। সাধারণ স্কুলগুলো আসলে মাদরাসা শিক্ষার সেই দিকগুলো থেকে ‘সার্বজনীন নৈতিকতা’ শিখতে পারে যেগুলোতে মাদরাসারা ঐতিহাসিকভাবেই সফল; কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ও খণ্ডিত পরিকল্পনা এই জ্ঞানবিনিময়ের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে। দুর্ভাগ্যবশত, সব দলের ইশতেহারেই ‘মাদরাসা সাইলো’ বা মাদরাসাকে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের নীতিগত চিন্তাগুলো এখনো খণ্ডিত; এখানে মাদরাসা শিক্ষাকে হয় উপেক্ষা করা হচ্ছে, নয়তো একেবারে আলাদা একটি বিষয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রয়োজন মানদণ্ডের সমতা। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন একজন মাদরাসা গ্র্যাজুয়েট সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীর মতোই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে, যাতে তারা আধুনিক অর্থনীতি থেকে ছিটকে না পড়ে।
স্ট্রিম: নারী শিক্ষা ও জেন্ডার সমতার প্রশ্নে তিনটি দলের অবস্থানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। আপনার মতে, শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনটি?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: বাংলাদেশে নারী শিক্ষার আসল চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার স্তরগুলোর মধ্যে নিরাপদ উত্তরণ নিশ্চিত করা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণে আমরা জেন্ডার সমতা অর্জন করলেও মাধ্যমিক স্তরে এসে ঝরে পড়ার হার ব্যাপক; যার অন্যতম মূল কারণ বাল্যবিবাহ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন করতে হলে আমাদের শুধু ক্লাসরুমের কথা ভাবলে চলবে না; বরং দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, ‘বিবাহ সংক্রান্ত সামাজিক প্রথা বা রীতির ব্যবধান’ ঘুচিয়ে আনা। জামায়াতে ইসলামী একটি নারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএনপি স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও, এগুলো কেবল জনতোষণমূলক বা খণ্ডিত পদক্ষেপ হিসেবেই থেকে যাবে যদি না আমরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের সামাজিক ‘ব্যয়’ বা মূল্য দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করি। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মানেই হলো বাল্যবিবাহের সামাজিক প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করা, যা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন। সামাজিক রীতির পরিবর্তনের পাশাপাশি সরকারকে মেয়েদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই সামাজিক ও কাঠামোগত বাধাগুলো দূর করার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া ‘বিনামূল্যে শিক্ষা’ কেবল একটি চমকপ্রদ শিরোনাম হিসেবেই থেকে যাবে, যা সেইসব মেয়েদের কাছে পৌঁছাবে না যাদের এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
স্ট্রিম: তিনটি দলই শিক্ষায় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বেশি টাকা মানেই কি ভালো শিক্ষা? নাকি ব্যয়ের কাঠামো ও জবাবদিহিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন, তবে আমাদের বর্তমান শিক্ষা সংকটের প্রধান কারণ হলো ব্যয়ের অদক্ষতা। এটি একটি ট্র্যাজেডি যে, যখন হাজার হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে আছে, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের বাজেটের বড় অংশ খরচই করতে পারছে না। গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে গেছে। এছাড়া বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে অপচয় হয়। শুধুমাত্র টাকার অঙ্ক বাড়ানোর চেয়ে সামাজিক অডিট এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক অর্থায়নের মতো জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও পাবলিক প্রজেক্ট বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে এখনো কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। তাই শিক্ষায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, বরং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন। সবশেষে, আমাদের উন্নয়ন ব্যয়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, ডিজিটাল ল্যাব তৈরি কিংবা মূল্যায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে কতটুকু খরচ করা হবে—সেই সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই এই উদ্যোগগুলো ‘শিখন ফলে’ কতটা প্রভাব ফেলছে তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে নিতে হবে।
স্ট্রিম: শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও মর্যাদার প্রশ্নটি সব ইশতেহারেই আছে, কিন্তু শিক্ষককে এখনো মূলত একজন ‘সরকারি কর্মচারী’ হিসেবে দেখা হয়। আপনার মতে, শিক্ষককে কীভাবে একজন ‘লার্নিং প্রফেশনাল’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শিক্ষককে একজন ‘কেরানি’ থেকে ‘প্রফেশনাল’ বা পেশাদার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে আমাদের তিনটি প্রধান দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগের রাজনৈতিকীকরণ বন্ধ করা। গত ১৫ বছর ধরে ‘সরকারি কর্মচারী’ তকমাটি মূলত দলীয় নিয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে আমাদের স্কুলগুলো এমন অনেক অযোগ্য দলীয় লোক দিয়ে ভরে গেছে যাদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়াও কঠিন, কারণ তারা এই পেশায় এসেছিলেন ভুল উদ্দেশ্যে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। পেশাদারিত্বের জন্য প্রয়োজন শিক্ষককে তার শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠদান পদ্ধতি পরিবর্তনের স্বাধীনতা দেওয়া; তিনি কেবল সরকারি মেমোর আজ্ঞাবহ বাস্তবায়নকারী হবেন না। সবশেষে, শিক্ষকদের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা পেশাদার সার্ভিস ক্যাডার এবং স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো তৈরি করা। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগের জন্য একটি আলাদা পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যাতে রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে মেধা প্রতিফলিত হয়।
স্ট্রিম: জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির ইশতেহারে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি কতটা যথাযথ?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এটি একটি দুধারী তলোয়ারের মতো। একদিকে, দৃঢ় নৈতিকতা দুর্নীতিজনিত বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে; অন্যদিকে, কেবল ‘আদর্শিক শুদ্ধতার’ ওপর মাত্রাতিরিক্ত জোর দেওয়া ভিন্নমত এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা উদ্ভাবনের জন্য অপরিহার্য। তবে, এই মূল্যবোধগুলোকে যদি ম্যাকিনসে-র ‘ডেল্টা’ ফ্রেমওয়ার্কের আলোকে নতুনভাবে সাজানো হয়, তবে সেগুলো ‘সেলফ-লিডারশিপ’ এবং ‘এথিক্স’-এর সমার্থক হয়ে ওঠে—যা একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হবে এটি নিশ্চিত করা যে, তাদের দেওয়া মূল্যবোধের শিক্ষা যেন আধুনিক উচ্চ-প্রযুক্তির বিশ্ব অর্থনীতির উপযোগী মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে প্রতিস্থাপন না করে বরং তার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
স্ট্রিম: বিএনপির ইশতেহারে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইঙ্গিত রয়েছে। আপনার মতে, স্কুল পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসন শিক্ষার মান উন্নয়নে কতটা কার্যকর হতে পারে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: স্বায়ত্তশাসন বা বিকেন্দ্রীকরণ তখনই কার্যকর হয় যখন ক্ষমতা সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায়। বাংলাদেশে স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলো দীর্ঘকাল ধরে চরমভাবে রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছে। এখন স্বায়ত্তশাসনের নামে যদি ক্ষমতা আবারও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে তা ব্যর্থ হবে এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে। প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন হওয়া উচিত আর্থিক এবং শিক্ষাক্রম সংক্রান্ত, যা প্রধান শিক্ষক এবং অভিভাবকদের স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার ঘাটতিগুলো মোকাবিলায় ক্ষমতায়ন করবে। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের পরামর্শটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; তারা প্রস্তাব করেছেন যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটিগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিবর্তে সরকারি কর্মকর্তাদের রাখা উচিত। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে স্কুল পরিচালনা ব্যবস্থাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা, যাতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আনুকূল্যের বদলে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়।
স্ট্রিম: তিনটি ইশতেহারেই কারিগরি ও দক্ষতা শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো একাডেমিক ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এই কাঠামোগত দ্বন্দ্ব কীভাবে সমাধান করা যেতে পারে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এই কাঠামোগত দ্বন্দ্ব নিরসনে আমাদের প্রথম কাজ হলো শিল্পখাত বা ইন্ডাস্ট্রিকে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা। শিল্পখাতকে কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সুযোগ দিতে হবে; এতে বর্তমানের সংকীর্ণ ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ধারার অবসান ঘটবে এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী শিক্ষা পাবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের ‘মানবিক উপাদান’ বা হিউম্যান এলিমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা যেন কারিগরি শিক্ষাকে কেবল বাজারজাতযোগ্য কিছু ‘হার্ড স্কিল’ বা যান্ত্রিক দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে দ্রুত যান্ত্রিক দক্ষতাগুলোর স্থান দখল করে নিচ্ছে, তাতে উদারনৈতিক শিক্ষার মূল ভিত্তি ‘সফট স্কিল’ বা সূক্ষ্ম দক্ষতাগুলোই ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে ‘লার্নিং ক্রাইসিস’ বা শেখার ঘাটতির বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আপনার মতে, এই সংকট কি রাজনৈতিক ইশতেহারগুলোতে যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: একেবারেই না। এটি একটি ‘নীরব জরুরি অবস্থা’ যা ইশতেহারগুলোতে চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার মূলত বিভিন্ন ‘ইনপুট’ বা শিক্ষা উপকরণের (যেমন অবকাঠামো ও সরঞ্জাম) ওপর আলোকপাত করেছে, কিন্তু শিক্ষার্থীর প্রকৃত অর্জনের বিষয়টি সেখানে অনুপস্থিত। শিখন ফলের সাথে এই উদ্যোগগুলোর সম্পর্ক কী হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা—মূলত ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের যে ব্যাপক শিখন ঘাটতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কোনো ‘জাতীয় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা’ ইশতেহারে দেখা যাচ্ছে না। এই ‘তথ্য-প্রমাণহীন চিন্তা’ বা এভিডেন্স-ফ্রি থিংকিং প্রমাণ করে যে, আমাদের শিখন ঘাটতি কতটা গভীরে এবং এটি জাতির ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার জন্য কতটা হুমকিস্বরূপ, সে সম্পর্কে দলগুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির অভাব রয়েছে। নতুন সরকারের থেকে আমার প্রত্যশা যে এই অতীতের প্রমান ব্যাতিরেখে নীতিপ্রণয়নের অপসংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না করা ।
স্ট্রিম: ইশতেহারগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হলেও ডিজিটাল বৈষম্যের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম এসেছে। প্রযুক্তি কি শিক্ষায় বৈষম্য কমাবে, না বাড়াবে—আপনার মূল্যায়ন কী?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: একটি শক্তিশালী ‘সাম্য কাঠামো’ ছাড়া প্রযুক্তি শিক্ষার বৈষম্য কমানোর বদলে উল্টো বৈষম্যের এক বিশাল গুণক হিসেবে কাজ করবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আমাদের শিক্ষকদের অপ্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা। শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসকদের প্রস্তুত না করে কেবল ডিজিটাল এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাওয়া এক ধরনের ‘নকল’ বা লোকদেখানো কর্মসূচি ছাড়া আর কিছু নয়। এর ফলে আমরা হয়তো শিক্ষকদের হাতে ট্যাবলেট তুলে দেব, কিন্তু সেটি ব্যবহারের সক্ষমতা বা সঠিক নির্দেশনার অভাবে প্রকৃত শিখনের কোনো উন্নতি হবে না। এটি মূলত শহুরে উচ্চবিত্ত এবং প্রান্তিক গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। গত মাসে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আমার ‘আইসিটি হোয়াইট পেপার টাস্কফোর্স’ রিপোর্টে আমি এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি এবং জোর দিয়েছি যে, প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি কেবল প্রতীকি হলে চলবে না, একে হতে হবে পদ্ধতিগত।
স্ট্রিম: যুব বেকারত্ব ও শিক্ষার মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, ইশতেহারগুলো তা স্বীকার করলেও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ কম। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের এই বিচ্ছিন্নতা কীভাবে কমানো যায়?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শ্রেণিকক্ষ এবং কর্মক্ষেত্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব ঘোচাতে আমাদের দেশে বর্তমানে কোনো ‘জাতীয় শিক্ষানবিশ আইন’ নেই। এছাড়া, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত বিপুল সংখ্যক ‘লিবারেল আর্টস’ বা মানবিক শাখার গ্র্যাজুয়েট আমাদের অর্থনীতির জন্য এখন টেকসই নয়। এই সমস্যা সমাধানে আমাদের দ্বিমুখী কৌশল নিতে হবে: প্রথমত, যেসব বিষয়ের বাজার চাহিদা কম এবং যেখানে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, সেসব বিষয়ে আসন সংখ্যা সীমিত করতে হবে; এবং দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং কারিগরি ট্রেড সেক্টরগুলোতে বড় ধরনের ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ফলাফলকে প্রকৃত বাজার চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক টিকে থাকার স্বার্থে এটি এখন অপরিহার্য।

পৃথিবীর নানা প্রান্তের মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা বিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে গবেষণা চালিয়ে ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞানের ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেন।
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত নানা রাজনৈতিক জটিলতা ও ক্রান্তিকালের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশকে জাতি গঠনের নানা জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এ সময় আমাদের যেমন নানাবিধ সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে, তেমনি দেশ গঠনের অনেক সুযোগও আমাদের সামনে এসেছে।
১ দিন আগে
বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ বর্তমানে এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বহু বছরের অবহেলার চূড়ান্ত পরিণতি। অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাব এবং নীতি নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ধারাবাহিক অবক্ষয় এই পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
১ দিন আগে
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে পারেন তারেক রহমান। তবে পাকিস্তানি গণমাধ্যমে এমন বয়ানও ছাড়া হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ সবসময় ভারতপন্থী আর বিএনপি পাকিস্তানের মিত্র।
২ দিন আগে