জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ডের ২ বছর, কী ঘটেছিল সেদিন

মাহজাবিন নাফিসা
মাহজাবিন নাফিসা

ভয়াল স্মৃতির নীরব ও কঙ্কালসার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিন কোজি কটেজ। স্ট্রিম ছবি

হাসি, আড্ডা, গল্প আর সঙ্গে মজার খাবার। ভবনের প্রায় প্রতিটি তলায়ই ছিল এই দৃশ্য। হঠাৎ এক মুহূর্তেই থেমে যায় সব। আগুন কেড়ে নেয় ৪৬টি প্রাণ, পুড়ে কঙ্কালসার হয়ে যায় পুরো ভবন।

২০২৪ এর ২৯ ফেব্রুয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। পরদিন ছুটি হওয়ায় অনেকেই বের হয়েছিলেন একটু আনন্দ উপভোগ করতে, কেউ গিয়েছিলেন রাতের খাবার বাইরে খেতে। কিন্তু রাত দশটার দিকে পুরো ভবন আগুন ও ধোয়ায় ঢেকে যায়। ভবনের নিচতলায় জড়ো করে রাখা গ্যাসের সিলিন্ডার থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত।

গ্রিন কোজি কটেজ নামের ওই ভবনের প্রবেশপথ ছিল খুবই সরু। পাশাপাশি একটি লিফট ও সরু একটি সিঁড়ি ছাড়া সেখান থেকে বের হওয়া বা ঢোকার কোনো রাস্তা ছিল না। তাই আগুন লাগার পরপরই তা টের পেলেও শতশত মানুষের পক্ষে ধোঁয়া ও ছাইয়ের ভেতর দিয়ে বের হওয়া অসম্ভব ছিল। যারা সেদিন মারা গেছেন তাদের বেশির ভাগেরই শরীরে পোড়া দাগ ছিল না, শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ও বিষাক্ত গ্যাসে মারা গেছেন তারা।

সেদিন ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভানোর পর হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে রাতেই জানানো হয়, মারা গেছেন ৪৫ জন। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও ইউনিটপ্রধান (অরেঞ্জ) প্রবীর চন্দ্র দাস সাংবাদিকদের জানান, তাঁদের মৃত্যুর কারণ মূলত কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং। তিনি আরও বলেন, আহত ব্যক্তিরা আধা ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট বদ্ধ ঘরে কালো ধোঁয়ার মধ্যে আটকে ছিলেন।

তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেনও মনোক্সাইড পয়জনিংয়ের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘বদ্ধ ঘর থেকে তারা বের হতে পারেনি, তখন ওই ধোঁয়া শ্বাসনালিতে ঢুকে গেছে।’

ঢাকার বেইলি রোডের সাত তলা ওই ভবনটির বেশিরভাগ ফ্লোরেই খাবারের দোকান৷ দোকানগুলোতে ভিড় লেগেই থাকত৷ তবে পরবর্তীতে রাজউক জানায়, এসব কিছুই অবৈধ। ভবন বা দোকান, কোনোটিরই অনুমতি ছিল না।

দুই বছর ধরে পোড়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে কোজি কটেজ। স্ট্রিম ছবি
দুই বছর ধরে পোড়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে কোজি কটেজ। স্ট্রিম ছবি

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন ভবনটি নিয়ে বলেন, ভবনটির কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল না৷ ভবনটি যে ঝুঁকিপূর্ণ তা জানিয়ে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল কর্তৃপক্ষকে৷

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, ভবনের অধিকাংশ রেষ্টুরেন্টে কোনো অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা ছিল না৷ এছাড়াও বহুতল ভবনটিতে কোনো ভ্যান্টিলেশন ব্যবস্থা ছিল না৷ ভবনের ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ধোঁয়ার কারণেই বেশিরভাগ মানুষ মারা গেছেন৷

রাজউক যা বলছে

রাজজউকের প্রধান প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিক জানান, ভবনটির বাণিজ্যিক নকশা পাঁচ তলা পর্যন্ত ৷ তবে উপরের দুই তলাও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করেছেন৷ রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘তাদের অফিস কাম রেসিডেন্সের অনুমোদন থাকলেও হোটেল রেস্টুরেন্টের কোনো অনুমোদন ছিল না৷ মালিক পক্ষ অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ করেছে৷’

রাজউক সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে বেজমেন্টসহ আট তলার বাণিজ্যিক কাম আবাসিক ভবনটির নকশা অনুমোদন দেয় রাজউক৷ ভবনের মালিকের নাম হামিদা খাতুন৷ আর ভবনটির নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন৷

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

তৎকালীন ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলি আহমদ খান জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেছিলেন, ‘আমি যা দেখেছি, ওই ভবনটির যে কমার্শিয়াল কমপ্লায়েন্স থাকার কথা, তা নাই৷ পুরো ভবনটি কাঁচে ঘেরা৷ ফলে সিঁড়িতে আগুন দ্রুত ট্র্যাভেল করে৷ বিকল্প সিঁড়ি ছিল না৷ ফলে কেউ আর বের হতে পারেনি৷’

আর নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘আমি যা দেখেছি তাতে বিল্ডিং কোড মানা হয়নি৷ আবাসিক ভবনের চেয়ে বাণিজ্যিক ভবনের নিরাপত্তা আরও বেশি থাকা প্রয়োজন৷ কিন্তু তা ছিল না। এখানে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, সিটি কর্পোরেশন সবার দায় আছে৷ কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয়নি৷’

কয় তলা হলে বহুতল

রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ফায়ার আইনে ছয় তলার বেশি হলেই সেটা বহুতল ভবন৷ তবে রাজউক আইনে ১০ তলার বেশি হলে বহুতল৷ এখানে আইনটি সাংঘর্ষিক৷ ফায়ার আইনে থাকলেও আমাদের আইনে ওই ভবনের আলাদা ফায়ার সিঁড়ি দরকার নেই৷ কিন্তু বাণিজ্যিক ভবনের জন্য ছয় তলার বেশি হলে ডাবল সিঁড়ি থাকা উচিত৷ আর ওই ভবনটিতে অনুমোদন না নিয়ে রেষ্টুরেন্ট করা হয়েছে৷ অনেক গ্যাস সিলিন্ডার বসানো হয়েছে৷ তাই সব ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা থাকা উচিত ছিল৷’

আগুনে প্রাণ যায়, বিচার হয় না

প্রতি বছর বহু অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২৬ এর শুরুতেই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মিরপুরসহ কয়েকটি স্থানে বড় আকারের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। গত কয়েক বছরে বঙ্গবাজার, নিউমার্কেটসহ ঢাকায় বেশ কয়েকটি বড় আগুনের ঘটনা ঘটেছে৷ প্রতিটি ঘটনার পরই অনেক কথা হয়, কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় না৷ দায়ীরা আসে না বিচারের আওতায়৷

২০১০ সালের ৩ জুন রাতে ঢাকার নিমতলীতে আগুনে মারা যান ১২৪ জন, আহত হন প্রায় অর্ধশতাধিক, পুড়ে যায় ২৩টি বসতবাড়ি, দোকান ও কারখানা৷ নিমতলীতে কেমিকেল গোডাউন থাকায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে৷ নিমতলীর ওই গোডাউনগুলো এতো বছরেও সরানো যায়নি৷

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় আগুনে ৭১ জন মারা যান, আহত হন কয়েকশ মানুষ৷ ওই আগুন নেভাতে ১৪ ঘন্টা সময় লেগেছিল৷ কারণ ওই এলাকা এতই ঘিঞ্জি ছিল যে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়িই সেখানে যেতে পারেনি৷

প্রতিটি আগুনের ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনো তদন্তই আলোর মুখ দেখেনি৷ কোনো ঘটনার জন্যই কারো শাস্তি হওয়ার নজির নেই৷ যাদের এগুলো দেখার দায়িত্ব, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি৷ রাজউক, ফায়াার সার্ভিস, সিটি কর্পোরেশন, ভবন মালিকদের- সকলেরই দায় আছে৷ তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার৷

আইন থাকলেও অর্থের বিনিময়ে ভবন মালিকরা ত্রুটিপূর্ণ ভবনের অনুমোদন নেন৷ আবার নির্মাণ শেষ হলেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আইন লঙ্ঘন করে পার পেয়ে যান৷

সম্পর্কিত