leadT1ad

পল্লবীতে দুই সন্তানসহ দম্পতির মরদেহ উদ্ধার: নেপথ্যে কি অভাব-অনটন

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩: ৩৩
রাজধানীর পল্লবীতে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

রাজধানীর পল্লবীতে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতদের মধ্যে অটোরিকশা চালক মো. মাসুমের (৩৪) লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। বিছানায় পড়ে ছিল তাঁর স্ত্রী ফাতেমা আক্তার সুমি (৩২) এবং তাঁদের দুই শিশু সন্তান—চার বছরের মিনহাজ ও দুই বছরের আসহাবের নিথর দেহ। অভাব-অনটনের জেরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন স্বজনরা।

আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। তবে এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে পুলিশ এখনও নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পল্লবীর মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের তিন নম্বর ওয়াপদা ভবনের নিচতলায় মাসুম তাঁর পরিবার নিয়ে থাকতেন। এই চারতলা ভবনের একটি কক্ষে মাসুম, তাঁর স্ত্রী ও ছোট দুই ছেলে থাকতেন। পাশের অন্য কক্ষগুলোতে মাসুমের দুই ভাই ও তাঁদের বাবা-মা বসবাস করেন।

বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) মাঠকর্মী নাসিমা ওই বাসায় যান। মাসুমের স্ত্রী সুমি প্রতিদিন ক্ষুদ্রঋণের কিস্তির জন্য টাকা করে সঞ্চয় করতেন। সেই টাকা নিতেই নাসিমা সেখানে গিয়েছিলেন। দরজায় ধাক্কা দিলে সেটি খুলে যায় এবং তিনি মাসুমকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে চিৎকার শুরু করেন। তাঁর চিৎকারে প্রতিবেশী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা ছুটে আসেন। ঘরে চারজনের মরদেহ দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।

নিহত মাসুমের মা জরিনা বেগম জানান, সকালে তাঁর মনে হয়েছিল ছেলে অসুস্থ হওয়ার কারণে দেরি করে ঘুমাচ্ছে, তাই তিনি ডাকেননি। পরে হট্টগোল শুনে গিয়ে এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখেন। তাঁর দাবি, বাইরে থেকে কেউ বাসায় ঢুকেছে বলে তাঁর মনে হয়নি এবং কারও সঙ্গে তাঁদের কোনো শত্রুতাও ছিল না। তাই তিনি এই মৃত্যুর কারণ বুঝতে পারছেন না।

তবে মাসুমের ফুফাতো ভাই শাহ মান্না অভাব-অনটনকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমাদের মনে হচ্ছে, অভাব-অনটনের কারণেই এমনটা ঘটে থাকতে পারে।” তিনি আরও জানান, মাসুমের বড় মেয়ে মাহফুজা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট দুই ছেলের পড়াশোনা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাসুম তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন। সেই চাপের কারণেই হয়তো তিনি স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার পর নিজে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।

পল্লবী থানার ওসি এ কে এম আলমগীর জাহান বলেন, “প্রাথমিক অনুসন্ধানে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃত্যুর পর মাসুম আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।” তিনি জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং সিআইডির ফরেন্সিক ও রাসায়নিক ল্যাবের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক সংকটে থাকলেও মাসুম তা কাউকে বলতেন না। তাঁদের বড় কোনো ঋণ ছিল কি না, সে বিষয়েও কেউ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

বিস্ময় আহাজারি
ঘটনার পর থেকেই মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের ওয়াপদা কলোনির ওই ভবনটি ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড় দেখা গেছে। নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী এবং ক্যাম্পের বাসিন্দাদের চোখেমুখে ছিল বিস্ময় ও আতঙ্ক। অবুঝ দুই শিশুর এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। প্রতিবেশী জুলু জানান, বুধবার রাতেও মাসুম ও তাঁর স্ত্রীকে স্বাভাবিক দেখা গেছে।

নিহত মাসুমের বড় ভাই ফিরোজের বন্ধু ইকবাল জানান, পরিবারটি এক সময় সচ্ছল ছিল। মাসুমের দাদা ও বাবা ছিলেন জামদানি শাড়ির কারিগর ও মহাজন। তাঁদের বাড়িতেই শাড়ি তৈরির ৬টি তাঁত ছিল। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মাসুম ছিলেন সবার ছোট। ইকবাল বলেন, মাসুম ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। অভাব কাটাতে তিনি কখনো ভ্যানে কাপড় বিক্রি করেছেন, কখনো রিকশা চালিয়েছেন। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন এবং কারও সাথে তাঁর বিরোধ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে কেন এমন ঘটল, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

ওয়াপদা বিহারি ক্যাম্পের এই জমিগুলো সরকারি। স্বাধীনতার পর থেকেই তাঁরা এখানে বসবাস করছেন। এই ঘটনায় পুরো কলোনিতে শোকের আবহ বিরাজ করছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত