leadT1ad

এরদোয়ান মিত্র হাকানের ঢাকা সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ

হাকান ফিদানের ঢাকা সফর। স্ট্রিম গ্রাফিক

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ঢাকা সফরে দুই দেশের কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, বিনিয়োগ এবং ইরান যুদ্ধও ছিল আলোচনায়।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হাকান ফিদান। দেশটির জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির সাবেক এই প্রধানকে দেশটির পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির অন্যতম স্থপতি বিবেচনা করা হয়। এই কারণে তাঁর ঢাকা সফরকে পর্যবেক্ষকরা কেবল কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছেন।

সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্ক দীর্ঘদিন স্বতন্ত্র ও কৌশলগত মর্যাদা ভোগ করছে। সামরিক সরঞ্জাম কিনতে বাংলাদেশ যে বহুমুখী উৎসের দিকে যাচ্ছে, সে কারণেই তাঁর এই সফর বেশি গুরুত্বপূর্ণ বহন করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগে মনোযোগ দেয় তুরস্ক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ে। এমনকি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে সভাপতি পদে বাংলাদেশের জয়ের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আঙ্কারা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, হাকান ফিদানের সফরে মোটা দাগে সামরিক, কৌশলগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটও ছিল। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগে তুরস্ককে আহ্বান জানানো হয়েছে। আঙ্কারা প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।

৫ জুন রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর হাকান ফিদান বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর, শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখছি।’ বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৩০ থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উদ্যোগ খুঁজে দেখছেন বলে জানান তিনি।

বৈঠকে দুই দেশ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলোতে অভিন্ন অবস্থান এবং সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানান হাকান ফিদান। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ এবং সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংহতি ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে পরবর্তী ধাপে নিতে তিনটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো– দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘টু-প্লাস-টু’ বৈঠক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বৈঠক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি পরামর্শক কমিটি গঠন।

টু-প্লাস-টু বৈঠকে দুই পক্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও ভারত– বিশ্বের চারটি দেশের সঙ্গে এই কাঠামোর আওতায় নিয়মিত বৈঠক করে তুরস্ক। তালিকায় পঞ্চম দেশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। অবশ্য অনিয়মিতভাবে ইউক্রেন এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও তুরস্ক টু-প্লাস-টু বৈঠক করে।

সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তুরস্কের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বাংলাদেশে এসেছিলেন। এর পাঁচ বছর পর বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ৪ জুন থেকে তিন দিন ঢাকা ঘুরে যান হাকান ফিদান।

কেন এই সফর গুরুত্বপূর্ণ

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতিতে তুরস্ককে গুরুত্বপূর্ণ ‘চরিত্র’ উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে তুরস্ককে ঘনিষ্ঠ অংশীদ্বার হিসেবে পাওয়া বাংলাদেশের জন্য উপকারী হবে। আমার কাছে এটিকে ‘টু-প্রংড স্ট্র্যাটেজি’ মনে হয়।

‘যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সফর। তবুও তুরস্কের দিক থেকে এটি একটি হাই-প্রোফাইল ভিজিট। তাঁকে আমরা যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছি, যেসব বৈঠক তিনি করেছেন, তা থেকেই সফরের গুরুত্ব স্পষ্ট’, যোগ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই শিক্ষক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর যে বিবৃতি হাকান ফিদান দিয়েছেন, তা খুবই ইতিবাচক। তিনি বলেছেন– ‘কৌশলগত সম্পর্ককে আরও উন্নত পর্যায়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ এটি’। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক কেমন হবে, এটি তারই একটি সংকেত। সম্ভাবনাময় এই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উচিত বাংলাদেশের।

তিনি বলেন, তা ছাড়া তুরস্ক নিয়ে ভারতের তেমন আপত্তি থাকার কথা নয়। আমরা এমন কিছু করছি না যে, ভারত থেকে সরে তুরস্কের দিকে যাচ্ছি। ভারতের বেশি স্পর্শকাতরতা চীন বা পাকিস্তান নিয়ে। তুরস্ক নিয়ে তেমন সেনসিটিভিটি নেই। তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ালে উইন-উইন সম্ভাবনা আছে আমাদের।

আস্থাভাজন বন্ধু

ওবায়দুল হক বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্ক দীর্ঘদিন স্বতন্ত্র এবং কৌশলগত মর্যাদা ভোগ করছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক অংশীদ্বার থাকা জরুরি। সেই প্রেক্ষাপটে তুরস্ককে একটি সম্ভাবনাময় ও আস্থাভাজন বন্ধু বিবেচনা করা হচ্ছে।

দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে আমাদের ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ ছিল। কিন্তু অর্থ থাকলেও অনেক সামরিক সরঞ্জাম কেনা (প্রকিউরমেন্ট) সম্ভব হয়নি। কাজেই এখানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন (রি-আর্মামেন্ট) এবং অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সহযোগিতাও প্রয়োজন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রসারিত ও গভীর হচ্ছিল। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে সেটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে।

তিনি বলেন, আলাপ-আলোচনার জন্য দুই দেশ একটি কাঠামো তৈরি করেছে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা– এই দুই বিষয় নিয়ে একটি কমিটি করা হবে। এর মাধ্যমে তারা এখন ফরমাল আলোচনায় বসবে এবং সম্পর্ককে সামনের দিকে কীভাবে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করবে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বহুমুখীকরণ

পুরোনো বন্ধু চীনের সঙ্গে ঢাকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকলেও, তা নিয়ে পশ্চিমাদের আপত্তি রয়েছে। ওবায়দুল হক বলেন, আমাদের দিক থেকেও একটি উৎসের ওপর অতিনির্ভরশীল থাকা ভালো নয়। এক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ হিসেবে তুরস্ক খুবই সম্ভাবনাময়। তাদের অস্ত্রের মানও ভালো।

তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়াও আমাদের ভালো প্রতিরক্ষা সহযোগী হতে পারত। তারা ফ্রিগেট, যুদ্ধবিমান, ট্যাংকসহ আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষম। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া অনেক ব্যয়বহুল। সেই হিসাবে তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যায়। এছাড়া তুরস্কের অস্ত্রের বাজার অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়– ড্রোন থেকে শুরু করে আর্টিলারি গান, ট্যাংক– সবই তৈরি করে তারা। তুরস্কের এই দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা (ইন্ডিজেনাইজেশন) গড়ে তোলার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা খাতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

এম হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ করে সামরিক প্রযুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে তুরস্ক। বাংলাদেশও অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। তারই অংশ হিসেবে তুরস্ক একটি ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

তিনি বলেন, তারা ব্যবসা করতে চায়। আর আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সহায়তা– এখানে একটি পারস্পরিক সাযুজ্য রয়েছে। বাংলাদেশ যে অস্ত্র তৈরি করে, সেটিকে আরও আধুনিকায়ন ও উন্নত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিস্তৃত ও গভীরতর হতে পারে। এই সফর নতুন গতি দিয়েছে।

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, আমরা এতদিন কেবল চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বহুমুখীকরণের দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। সেখানে চীন ও তুরস্ক উভয়ে ভূমিকা রাখতে পারে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত