কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে মাসের পর মাস শিডিউল বিপর্যয়, যাত্রীদের ভোগান্তি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কুড়িগ্রাম

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ২১
কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। ছবি: সংগৃহীত
কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রামের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের একমাত্র আন্তনগর ট্রেন কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ইঞ্জিন সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটিতে কখনো তিন থেকে চার ঘণ্টা দেরি হচ্ছে। মাঝপথে ট্রেন বদলে শাটলেও যেতে হচ্ছে যাত্রীদের।

চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টজুড়ে শিডিউল বিপর্যয়ের পর সেপ্টেম্বরেও কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ইঞ্জিন বিকল, ইঞ্জিন সংকট, ট্রেন পরিবর্তন এবং বিকল্প শাটল ট্রেনে যাত্রী পরিবহনের ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা না থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা।

কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে আসা কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের কুড়িগ্রাম স্টেশনে পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় সকাল ৫টা ১০ মিনিট। এরপর একই ট্রেন সকাল ৭টা ১০ মিনিটে ঢাকা অভিমুখে কুড়িগ্রাম ছাড়ার কথা। কিন্তু গত কয়েক মাসে এই সময়সূচি ধরে রাখা রেলওয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই ট্রেনটির শিডিউল বিপর্যয় প্রকট আকার ধারণ করে। কোনো দিন এক ঘণ্টা, আবার কোনো দিন তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়। গত ১ আগস্ট পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সেদিন কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস পার্বতীপুর পর্যন্ত পৌঁছানোর পর আর কুড়িগ্রাম যেতে পারেনি। পরে কুড়িগ্রাম থেকে শাটল ট্রেন পাঠিয়ে যাত্রীদের আনা হয়। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ায় যাত্রীদের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ইঞ্জিনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি রংপুরে ইঞ্জিন বিকল ও বিকল্প ব্যবস্থায় যাত্রী পরিবহনের ঘটনায় কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাঁদের দাবি, আন্তনগর ট্রেনের টিকিট কেটে মাঝপথে শাটল ট্রেনে যাতায়াত করতে বাধ্য হওয়া কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত সেবা নয়।

যাত্রীরা বলছেন, দীর্ঘ আন্দোলনের পর পাওয়া কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস কুড়িগ্রামবাসীর জন্য শুধু একটি আন্তনগর ট্রেন নয়, এটি রাজধানীর সঙ্গে জেলার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা। ট্রেনটির নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় মানুষের পরীক্ষা, চাকরি, চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে আসা কিংবা কুড়িগ্রাম থেকে রাজধানীতে যাওয়া—দুই ক্ষেত্রেই ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ে চলবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা এখন যাত্রীদের বড় উদ্বেগ।

যাত্রী অমিত চন্দ্র জানান, কুড়িগ্রাম থেকে অনেক যাত্রী এই ট্রেনে রংপুরে যাতায়াত করেন। বিভিন্ন ব্যবসায়িক কাজে তাঁরা সকালে এসে এই ট্রেনে অল্প খরচে রংপুরে পৌঁছান। রেল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে সময়মতো ট্রেন না পেয়ে তাঁরা আবার মেইন রোডে চলে আসেন বাসের জন্য।

যাত্রীদের অভিযোগ, বাস মালিক সমিতির সঙ্গে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের যোগসাজশ রয়েছে। এ কারণেই প্রতিনিয়ত এ ধরনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে বলে তাঁরা মনে করেন।

কুড়িগ্রাম রেলস্টেশনের ইনচার্জ কণিকা আক্তার বলেন, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের শিডিউল বিপর্যয়ের পেছনে মূলত ইঞ্জিন সংকট ও যান্ত্রিক সমস্যাই প্রধান কারণ। ইঞ্জিনের সক্ষমতা কমে যাওয়া বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে একটি ট্রেনের বিলম্ব পরবর্তী ট্রেনগুলোর সময়সূচির ওপরও প্রভাব ফেলে।

তিনি জানান, একটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে গেলে সেটিকে আবার সময়সূচিতে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে। বিশেষ করে দীর্ঘ রুটে চলাচলকারী ট্রেনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টেশনে ক্রসিং, যাত্রী ওঠানামা এবং কারিগরি বিষয়গুলোও বিলম্ব বাড়িয়ে দেয়।

বাসমালিকদের সঙ্গে রেলওয়ের আঁতাতের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। মূল সংকট হচ্ছে ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা।

লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ধীমান ভৌমিক বলেন, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসসহ লালমনিরহাট, বুড়িমারী ও রংপুর এক্সপ্রেসে ব্যবহৃত ইঞ্জিন ঢাকা থেকে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ব্যবহারযোগ্য ইঞ্জিনের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় বিভিন্ন রুটে ট্রেন পরিচালনায় চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, একসময় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ব্যবহারযোগ্য ইঞ্জিনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২০টি। বর্তমানে সেটি কমে প্রায় ৭০টিতে নেমে এসেছে। ফলে একই ইঞ্জিন দিয়ে একাধিক রুটের ট্রেন পরিচালনা করতে গিয়ে সময়সূচি স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ধীমান ভৌমিক আরও বলেন, কুড়িগ্রাম অঞ্চলের ট্রেনগুলো মিটারগেজ লাইনে চলাচল করে। মিটারগেজ ট্রেনের সীমিত সক্ষমতা, একক লাইন এবং বিভিন্ন ট্রেনের ক্রসিংয়ের কারণে সময়সূচিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে কোনো ইঞ্জিন বিকল হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি নাহিদ হাসান জানান, কুড়িগ্রাম দেশের দরিদ্র জেলা হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। সব জেলার ট্রেন ছাড়ার পর কুড়িগ্রামের ট্রেন ছাড়বে। তারপর কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস কুড়িগ্রাম পৌঁছানোর বদলে রংপুরে গিয়ে থাকবে। রংপুরে গিয়ে যাত্রীদের কুড়িগ্রাম থেকে আসা শাটলের অপেক্ষায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে হয়েছে। চার-পাঁচ বছর ধরে কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী সেকশনের লাইনের সংস্কারও হয় না, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস চিলমারীও যায় না।

রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) ফেরদৌস জানান, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের শিডিউল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও ইঞ্জিনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। নতুন ও অধিক সক্ষম ইঞ্জিন যুক্ত হলে এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তবে কবে নাগাদ নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।

প্রসঙ্গত, ৯০ এর দশকের পর পর্যন্ত কুড়িগ্রাম রুটে চারটি ট্রেন চলেছে। পরে স্থানীদের দাবিতেই রেললাইন তুলে ফেলা হয়। এতে জেলার পুরান কুড়িগ্রাম, টগরাইহাট ও বালাবাড়িহাট স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়। এই সুযোগে বেদখল হতে শুরু করে রেললাইনের জায়গা। পরে সরাসরি আন্তনগর ট্রেন চালুর দাবিতে ২০০৯ সাল থেকে প্রায় এক দশক ধরে আন্দোলন করে আসছিল বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা ট্রেন ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত