
কৃষির সার নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি খবর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কোথাও কৃষক সার পাচ্ছেন না। কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কোথাও ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষক সার নিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও প্রশাসন অবৈধ মজুদ উদ্ধার করছে। আবার সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশে মোট সার মজুদ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। এই আপাত-বিরোধই আসল সংকেত। সমস্যা শুধু সারের পরিমাণে নয়; সমস্যা সারের অবস্থান, সময়, বণ্টন এবং প্রবাহে।
২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রাসায়নিক সারের চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৬৭.৭ লাখ টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬.২২ লাখ, টিএসপি ৯.০২ লাখ, ডিএপি ১৩.৫৬ লাখ এবং এমওপি ৯.৭ লাখ টন। ৩১ আগস্টে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মজুদ ছিল প্রায় ১২.৮৬ লাখ টন। এক বছর আগের তুলনায় মজুদ প্রায় ৮৬ হাজার টন বেশি। সংখ্যাটি আশ্বস্ত করার মতো। কিন্তু কৃষকের অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলছে।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকেরা নির্ধারিত সময়ে সার না পেয়ে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেছেন। অন্যত্র ডিএপি সরকারি দামে ১,০৫০ টাকা হলেও কৃষকদের ১,৬০০ থেকে ১,৭০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। আগস্ট মাসে বিভিন্ন জেলায় অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা হাজার হাজার কেজি সার উদ্ধার হয়েছে। যশোরে ১৩.৫৫ টন এবং ঈশ্বরগঞ্জে প্রায় ৩২ টন অবৈধ মজুদের ঘটনাও ধরা পড়েছে।
এখানে একটি মৌলিক শিক্ষা আছে। জাতীয় মজুদ আর কৃষকের প্রাপ্যতা এক জিনিস নয়। গুদামে ১০ লাখ টন সার থাকতে পারে। কিন্তু কৃষকের জমিতে যদি প্রয়োজনের দিনে এক বস্তা সারও না পৌঁছায়, তাহলে সেই মজুদের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় শূন্য।
এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সার নেই’ কিংবা ‘কোনো সংকট নেই’—এই দুই সরল সিদ্ধান্তের কোনোটিতেই আটকে থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে আছে, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ-সংকট দ্রুত মূল্যসংকট এবং পরে উৎপাদন-সংকটে রূপ নিতে পারে।
উৎপাদনের দুর্বলতা আরও বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা দেশীয় উৎপাদনে। দেশের সাতটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানার সম্মিলিত স্থাপিত সক্ষমতা বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি। কিন্তু ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এগুলো উৎপাদন করেছে মাত্র ১১.০৬ লাখ টন। একই সময়ে দেশের সার চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। অর্থাৎ মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশেরও কম এসেছে রাষ্ট্রীয় দেশীয় উৎপাদন থেকে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, সাতটি রাষ্ট্রীয় কারখানার মধ্যে মাত্র দুটি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে চালু রয়েছে। অন্যগুলো গ্যাস ও কাঁচামালের সংকটে বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়েছে। কেবল গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে গত অর্থবছরে আরও ২২ থেকে ২৫ লাখ টন উৎপাদন সম্ভব হতো বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অর্থাৎ সার-সংকট আসলে শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়। এটি জ্বালানি মন্ত্রণালয়েরও সমস্যা। এটি বৈদেশিক মুদ্রার সমস্যা। এটি বন্দর ও নৌপরিবহনের সমস্যা। এটি শিল্পনীতি এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সমস্যাও।
ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য গ্যাস অপরিহার্য। অথচ রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর প্রয়োজনীয় গ্যাসের প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিকের বিপরীতে অনেক সময় এক-তৃতীয়াংশের মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কারখানা চালু রাখার অর্থনৈতিক যুক্তি দুর্বল হচ্ছে।
ডিএপির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সহজ নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ডিএপি কারখানা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ফসফরিক অ্যাসিড সংগ্রহে সমস্যায় পড়ে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অর্থাৎ ইউরিয়ায় গ্যাসনির্ভরতা এবং ডিএপিতে কাঁচামালনির্ভরতা—দুই ক্ষেত্রেই দেশের আমদানিনির্ভরতা প্রকট।
পাইপলাইনে থাকা সারও নিরাপত্তা নয়
সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উৎস থেকে সার আমদানি করছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ১২ লাখ টনের একটি আমদানি চুক্তির কথাও জানা গেছে। মরক্কো, কানাডা ও রাশিয়া থেকেও সরবরাহ আসছে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কিছু চালান বিলম্বিত হয়েছে।
এখানেই ‘পাইপলাইন’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ বোঝা দরকার। কাগজে অর্ডার করা সার আর বন্দরে পৌঁছানো সার এক নয়। জাহাজে ওঠা সার আর দেশের গুদামে পৌঁছানো সারও এক নয়। গুদামে পৌঁছানো সার আর কৃষকের ডিলারের কাছে পৌঁছানো সারও এক নয়। বাংলাদেশের সার-নিরাপত্তা মাপতে হলে শুধু মজুদ দেখলে চলবে না, দেখতে হবে পাইপলাইন, আনলোডিং, গুদাম, ডিলার পর্যায়ে বরাদ্দ, কৃষক পর্যায়ে বন্টন ও বিতরণ পুরো শৃঙ্খল।
আন্তর্জাতিক বাজারও এখন স্বাভাবিক নয়
বিশ্বের সারবাজারও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সার সরবরাহকে প্রভাবিত করেছে। পরিবহন ব্যয়, বীমা ব্যয় এবং জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। ভারতের সংসদীয় উত্তরের তথ্যেও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সার ও কাঁচামালের বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খল ব্যাহত করেছে এবং জাহাজ ভাড়া ও বীমা ব্যয় বাড়িয়েছে।
বিশ্ব খাদ্যবাজারও চাপের মধ্যে। আগস্ট ২০২৬-এ এফএও খাদ্যমূল্য সূচকের বড় উল্লম্ফনের কথা জানিয়েছে। ভূরাজনীতি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বাণিজ্যপথের অনিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করছে। অতএব বাংলাদেশের জন্য সার আমদানি এখন নিছক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেশী দুই দেশের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত চলতি মৌসুমে শুধু মজুদ বাড়ায়নি। মৌসুম শুরুর আগেই বিপুল পরিমাণ সার সংগ্রহ করেছে। ২০২৬ সালের খরিফ মৌসুমে মোট চাহিদার প্রায় ৫১ শতাংশ সমপরিমাণ সার আগাম মজুদ ছিল। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য বছরে ৩১ লাখ টন ডিএপি/এনপিকে সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হয়েছে। ভারত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।
সংকট দেখা দেওয়ার পর কেনাকাটা নয়; সংকটের আগে কেনাকাটা
গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়েও ইউরিয়া উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানও মজুদ, উৎপাদন, মূল্য ও বিতরণকে একই পর্যবেক্ষণ কাঠামোর মধ্যে আনছে। সরকার উৎপাদনকারী, আমদানিকারক এবং প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষকে নিয়ে নিয়মিত সার পর্যালোচনা করছে। কৃত্রিম সংকট, মজুদদারি ও অতিরিক্ত দাম ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা এখানেই।
এখন কী করতে হবে?
প্রথম কাজ জাতীয় সার নিরাপত্তা সূচক তৈরি করতে হবে। প্রতিটি সারের জন্য আলাদা করে দৈনিক ব্যবহার, মাসিক চাহিদা, হাতে থাকা মজুদ এবং পাইপলাইনে থাকা আমদানি প্রকাশ করতে হবে। শুধু জাতীয় সংখ্যা নয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের তথ্যও প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয় কাজ ন্যূনতম কৌশলগত মজুদ নির্ধারণ। মৌসুমভেদে অন্তত কয়েক মাসের নিরাপদ মজুদ থাকতে হবে। তবে জাতীয় মজুদ যথেষ্ট হলেই হবে না। উত্তরাঞ্চল, হাওর, উপকূল ও প্রধান ধান উৎপাদন অঞ্চলে আঞ্চলিক বাফার মজুদ থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয় কাজ ডিলার ব্যবস্থার সংস্কার। একজন ডিলারের গুদামে কত সার আছে, কত পেয়েছেন, কত বিক্রি করেছেন এবং কত অবশিষ্ট আছে, সব তথ্য ডিজিটাল হতে হবে। প্রতিটি বস্তার চলাচল শনাক্তযোগ্য করা সম্ভব। কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নয়, বরং কৃষক নিবন্ধন ও জমির ফসলভিত্তিক চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের তথ্য যুক্ত করা যেতে পারে।
চতুর্থ কাজ পাইপলাইনকে সরকারি নজরদারির আওতায় আনা। কোন জাহাজ কোথায়। কত টন সার। কোন দেশ থেকে আসছে। কখন বন্দরে পৌঁছাবে। কোন বন্দরে খালাস হবে। কোন গুদামে যাবে। কোন জেলায় যাবে। এই তথ্য একটি জাতীয় ড্যাশবোর্ডে থাকতে হবে।
পঞ্চম কাজ দেশীয় উৎপাদনকে জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা। যে সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকে, সেখানে নতুন বিনিয়োগের আগে গ্যাসের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পুরোনো কারখানার পুনর্বাসন করতে হবে। কিন্তু অকার্যকর কারখানাকে অনন্তকাল ভর্তুকি দিয়ে চালানোও সমাধান নয়।
ষষ্ঠ কাজ আমদানির উৎস বহুমুখী করা। একটি দেশ বা একটি বাণিজ্যপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিপজ্জনক। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। একই সঙ্গে স্পট মার্কেটের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। সপ্তম কাজ কালোবাজারি দমনে প্রশাসনিক অভিযানকে বাজার-সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা।
গুদাম ভাঙা কোনো সমাধান নয়। কিন্তু কৃষক কেন গুদাম ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন—এই প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। যখন সরকারি মজুদ আছে, কিন্তু কৃষকের কাছে নেই, তখন মাঝখানে কোথায় সরবরাহ আটকে যাচ্ছে সেটিই তদন্তের বিষয়।
সংকট এখন কোথায়?
বাংলাদেশ এখনো জাতীয় পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ সার-সংকটে পড়েনি। বরং সরকারি তথ্য অনুযায়ী অনেক এলাকায় মজুদ যথেষ্ট। রাজশাহীতে ৮ সেপ্টেম্বর প্রশাসন জানিয়েছে, বিভিন্ন সরকারি গুদামে স্থানীয় মাসিক চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ সার রয়েছে।
কিন্তু এই তথ্যই বিপদকে ছোট করে দেখার কারণ হতে পারে না। কারণ সংকটের প্রথম স্তর হলো সরবরাহের অসমতা। দ্বিতীয় স্তর মূল্যবৃদ্ধি। তৃতীয় স্তর কৃষকের সার ব্যবহারে কাটছাঁট। চতুর্থ স্তর ফসলের ফলন কমে যাওয়া। পঞ্চম স্তর খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। ষষ্ঠ স্তর খাদ্য আমদানির ওপর বাড়তি চাপ। বাংলাদেশ এখন প্রথম দুই স্তরের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে পরের স্তরগুলো দ্রুত আসতে পারে।
তাই গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। এটি একটি বাজার-সংকেত। কৃষক যখন মনে করেন আগামীকাল সার পাবেন না, তখন আজই সার সংগ্রহ করতে চান। সেই আতঙ্কই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আতঙ্ক দূর করা। তার জন্য আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ তথ্য, আগাম আমদানি, আঞ্চলিক মজুদ, নির্ভরযোগ্য পাইপলাইন, দেশীয় উৎপাদনের নিশ্চয়তা এবং কঠোর বাজার তদারকি।
সার কৃষকের একটি উপকরণ মাত্র নয়। এটি খাদ্যনিরাপত্তার অবকাঠামো। এক বস্তা সার সময়মতো না পৌঁছানোর অর্থ কখনো কখনো এক বিঘা জমির উৎপাদন কমে যাওয়া। লাখ লাখ কৃষকের ক্ষেত্রে সেই ছোট ক্ষতি জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে বড় ঘাটতিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের এখন তাই একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমাদের গুদামে কত সার আছে, এটি নয়। প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনের দিনে কৃষকের হাতে কত সার থাকবে? নীতির সাফল্য মাপতে হবে সেই সংখ্যায়।
- এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
.png)




-7410ee.jpg)






