leadT1ad

মাকামের প্রতিবেদন

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৪ মাজারে হামলা, প্রশাসন ছিল নীরব

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ৫০
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলের আস্তানায় হামলা করেছিল উত্তেজিত জনতা। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে মাজার বা সুফি সাধকদের দরবারে অন্তত ৬৪টি হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং জমি দখলের উদ্দেশ্যে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে এসব হামলা চালানো হয়। এসব ঘটনায় নারীসহ দুই শতাধিক মানুষ আহত এবং দুজন নিহত হন।

‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, সারা দেশে মাজারকেন্দ্রিক যত হামলার ঘটনা ঘটেছে (আনুমানিক ১৫০টি), তার ৫৩ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।

মাকামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ২০২৪-২০২৫ সালে মাজারসংক্রান্ত মোট ৫০টি ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩৭টি হামলার ঘটনা সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বাকিগুলোর মধ্যে গুজব ও হুমকির ঘটনাও রয়েছে। জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে নরসিংদীতে (১১টি)। এছাড়া ঢাকা জেলায় ৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৫টি, কিশোরগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে ৩টি করে এবং শরীয়তপুর ও গাজীপুরে ২টি করে হামলার ঘটনা ঘটে।

মোট হামলার ৩৩ শতাংশই ঘটেছে এই ঢাকা বিভাগে। হামলার ধরণ ও সময়কাল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ঘটনার ৭০ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে ঘটেছে। হামলার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অন্তত ১৫টি মাজারের বাৎসরিক ওরসের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। হামলার সময় মাজার সংশ্লিষ্ট অন্তত ৪টি মসজিদেও হামলা করা হয়েছে।

মাকাম বলছে, একই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগে মাজার হামলার ২৭টি নিশ্চিত ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কুমিল্লা জেলায় একাই ১৭টি মাজারে হামলা হয়েছে, যা এই বিভাগের মোট ঘটনার ৫২ শতাংশ। এছাড়া চট্টগ্রামে ৪টি, নোয়াখালীতে ৩টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২টি হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার ব্যাপকতায় চট্টগ্রাম বিভাগ জাতীয় পরিসংখ্যানের ২০ শতাংশ দখল করে আছে।

হামলার পর এই অঞ্চলে অন্তত ১২টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অন্তত ১৫টি মাজারের বাৎসরিক ওরসের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। এসব হামলায় নারীসহ অন্তত ৩১জন আহত হয়েছে।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে লেখক ও চিন্তক মোহাম্মদ রোমেল বলেন, ‘মাজার নিয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর পরই এখানে ধারাবাহিকভাবে অনেক হামলা হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই প্রতিবাদ করছিলাম এবং সরকারকে বলছিলাম যে—এই বিষয়ে শক্ত প্রশাসনিক অবস্থান নিতে। কিন্তু সরকার এটা নেয় নাই। একই সঙ্গে আমাদের পলিটিক্যাল পার্টিগুলো যেমন বিএনপি, জামাত বা এনসিপি—এরা কেউ এই বিষয়ে পরিষ্কার বা শক্ত পজিশন নেয় নাই। এটার সমালোচনাও আমরা করেছিলাম তখন।’

তিনি আরও বলেন, সরকার তো দুর্বল ছিল, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত ভালো ছিল না। কিন্তু তারপরও যদি পলিটিক্যাল পার্টি এবং সিভিল সোসাইটির দিক থেকে শক্ত পজিশন থাকতো, তাইলে হয়তো এখনও যে মাজারে হামলা অব্যাহত আছে, এটা হতো না।

হামলার নেপথ্য কারণ ও কৌশল

মাকাম থেকে জানা যায়, উভয় বিভাগের হামলার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামলাগুলোর প্রধান কারণ ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ। হামলাকারীরা মাজার সংস্কৃতিকে ‘শিরক ও বিদআত’ আখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং হামলার বৈধতা তৈরির চেষ্টা করে। ঢাকায় ৬৫ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় অভিযোগকে হাতিয়ার করা হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে স্থানীয় বিরোধ, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং মাজারের জমি দখল। এছাড়া রাজনৈতিক পালাবদলের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট বা অনুসারীদের পরিচালনাধীন মাজারগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। হামলাকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় যুবকদের চারিত্রিক স্খলনের অজুহাত দিয়ে ওরস, মেলা বা সুফি গানের আসর বন্ধ করে দেয়। হামলাকারীদের বড় অংশই বহিরাগত, বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসার ছাত্র বা চরমোনাইপন্থী ও জামায়াতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যারা স্থানীয় ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে সংগঠিত হয়।

মাকাম জানায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামে হামলার ঘটনায় নারীসহ অন্তত ২১১ জন আহত হয়েছেন (ঢাকায় ১৮০-এর অধিক, চট্টগ্রামে ৩১)। ঢাকা বিভাগে নিহত হয়েছেন ২ জন।

হামলা ও সহিংসতার এতবড় চিত্র থাকার পরেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। মাকামের তথ্যে দেখা যায়, বেশিরভাগ ঘটনায় পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা বিভাগে ৮০ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিল।

চট্টগ্রামে ২৫টিরও বেশি ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত হয়নি। কেবল হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনায় (যেমন: রাজবাড়ীর নুরাল পাগলার দরবার, নরসিংদীর হকসাব শাহের মাজার, কুমিল্লার হোমনা ও সীতাকুণ্ডের ঘটনা) প্রশাসন সক্রিয়তা দেখিয়েছে এবং মামলা বা গ্রেপ্তার করেছে। প্রশাসনের এই নির্লিপ্ততা হামলাকারীদের পরোক্ষভাবে আরও উৎসাহিত করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের প্রশাসনিক শূন্যতার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ওরস ও মিলাদুন্নবী উপলক্ষে হামলার ঘটনা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য এক অশনিসংকেত।

মাজারে হামলার ঘটনাগুলোতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা তা জানার জন্য স্ট্রিম থেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার একাক্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে কল করা হলে তাঁর নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত