‘পথের কাঁটা’ হকার তোলার চ্যালেঞ্জে ডিএসসিসি

ফুটপাত। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকার ফুটপাত বহুদিন ধরেই পথচারীদের বদলে দখল, উচ্ছেদ আর পুনর্দখলের এক অবিরাম চক্রে আটকে আছে। হাঁটার জায়গা দখল করে নিয়েছে হকার, আবার সেই হকারদের পেছনে আছে হাজারো মানুষের জীবিকার কঠিন বাস্তবতা। ফলে একদিকে পথচারীদের অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে হকারদের জন্য সুশৃঙ্খল বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি—এই দ্বন্দ্বের মাঝেই নতুন নীতি নিয়ে বড় এক চ্যালেঞ্জে নেমেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বহুদিনের অনিয়ন্ত্রিত দখল, উচ্ছেদ আর পুনর্দখলের চক্র ভেঙে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়াই এখন এই উদ্যোগের মূল চ্যালেঞ্জ।

পথচারীদের জন্য রাজধানীর ফুটপাত উন্মুক্ত রাখতে এবং হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল নিয়ে চলমান সংকট নিরসনে সংস্থাটি ‘জিরো টলারেন্স’ বা ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি, পরীক্ষামূলক সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প এবং নতুন হকার ব্যবস্থাপনা নীতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।

‘ঢাকা সিটি হকার ব্যবস্থাপনা নীতি-২০২৬’-এর আওতায় গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) নগর ভবন মিলনায়তনে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গুলিস্তান এলাকার ১০০ জন হকারের হাতে ডিজিটাল পরিচয়পত্র তুলে দেওয়া হয়। এসব হকারকে রমনা ভবনের পাশের লিংক রোড এলাকায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নতুন নীতিতে কী আছে

নতুন নীতিমালায় হকারদের জন্য ডিজিটাল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধিত হকারদের কিউআর কোডসংবলিত স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে, যা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বৈধ থাকবে এবং হস্তান্তরযোগ্য নয়। একজন পরিবারের জন্য একটি লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং নিবন্ধিত হকারদের তালিকা প্রকাশ করা হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, ‘হকারদের ফুটপাতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা পথচারীদের জন্য খালি রাখতে হবে। কোনো স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা যাবে না এবং প্রতিদিন বিক্রি শেষে পণ্য সরিয়ে নিতে হবে। খেলার মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ বা ধর্মীয় স্থানের আশপাশে হকার বসানো যাবে না।’ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মোড় ও পরিবহন কেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার শর্তও রাখা হয়েছে নীতিমালায়।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘পথচারীদের চলাচল সহজ করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। হকাররা এই নীতির আওতায় ব্যবসা করবেন। এই কর্মসূচি মানবিক ও রূপান্তরমূলক উদ্যোগ, যা একদিকে পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকাও সুরক্ষিত করবে।’

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং ট্রাফিক পুলিশ সহজেই হকারদের বৈধতা যাচাই করতে পারবে। এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত হবে, পথচারীদের চলাচল সহজ হবে এবং একই সঙ্গে হকারদের জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে সরকারের এমন একটি উদ্যোগের বিষয়ে জানেন না খোদ হকারেরাই। গুলিস্তানে গিয়ে কয়েকজন হকারদের এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলেন, তারা এখনও এই বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না। তারা শুধু শুনেছেন যে বৃহস্পতিবার কয়েকজনকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। আবার কয়েকজন বলেন, তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে।

জাহাঙ্গীর নামের এক হকার স্ট্রিমকে বলেন, ‘মাত্র তো বৃহস্পতিবার উদ্বোধন হল। আমাদের কাছে আসতে আসতে আরও বহু সময় লাগবে।’

আরেক হকার বলেন, ‘শুনেছি কোরবানির ঈদের পর পুরোদমে শুরু হবে।’

জসিম নামের আরেক হকার বলেন, ‘এসব আগেও কয়েকবার দেখেছি, কিন্তু পরে আর কিছুই হয়নি।’

চাঁদাবাজ চক্র ভাঙা ও বিকল্প কর্মসংস্থানে জোর

ডিএসসিসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর সফল বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা। তাদের মতে, শুধু উচ্ছেদ বা নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর মধ্যেই সমস্যার সমাধান সীমাবদ্ধ নয়; বরং চাঁদাবাজ চক্র ভাঙা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিএসসিসির নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো উচ্ছেদের পর পুনরায় দখলের ঝুঁকি। গুলিস্তানের মতো এলাকায় অতীতে দেখা গেছে, অভিযান শেষে কিছুদিনের মধ্যেই আবার ফুটপাত দখল হয়ে যায়।

এ ছাড়া সব হকারকে পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকায় অনেকেই বিকল্পহীন অবস্থায় পড়তে পারেন। এতে জীবিকা সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর সমন্বয়। নগর পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী ফল দিতে পারবে না।

নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘দেশে প্রথমবারের মতো হকার নীতি প্রণয়ন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। আগেও ক্ষুদ্র পরিসরে এমন উদ্যোগ দেখা গেছে কিন্তু সেগুলো ব্যর্থ হয়। এজন্য একটি সামগ্রিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সব হকারকে যেহেতু পুনর্বাসন করা যাবে না, সুতরাং জীবিকা হারানো হকারদের নতুন অর্থনৈতিক জোন তৈরি করে কর্মসংস্থান করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপও জরুরি। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই চক্র ভাঙা না গেলে হকারদের আইন-শৃঙ্খলার আওতায় আনা সম্ভব নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক মাহা মির্জাসহ আরও অনেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে মত দিয়েছেন, হকারদের উচ্ছেদ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। অনেক সময় উচ্ছেদকে দ্রুত সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু এটি বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করার শামিল। সামগ্রিক পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ কার্যকর সমাধান নয়।

এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমরা চাঁদাবাজি ও পুনর্দখল বন্ধ করার জন্যই তো সবকিছু একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসছি। প্রধানমন্ত্রীও চান সবকিছু একটা জবাবদিহির মধ্য দিয়েই চলুক। হকারদের জন্য কার্ড ও নিয়ম করে দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং চাঁদাবাজি আর থাকবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যাদের পুনর্বাসন করা যাবে না, তাদের ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমরা বিকল্প সমাধান খুঁজছি, যাতে কেউ সম্পূর্ণভাবে জীবিকাহীন না হয়। আমরা চেষ্টা করছি যাতে পর্যায়ক্রমে আরও বিকল্প জায়গা তৈরি করা যায় এবং তাদের একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনা যায়।’

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত