মন্দার মধ্যেও ব্যাংকগুলো এত মুনাফা কীভাবে করল

খতিয়ে দেখা দরকার– প্রকৃত আয় ছাড়া তারা কাগুজে আয় দিয়ে মুনাফা বাড়িয়েছে কিনা। কাগুজে মুনাফা দেখালে তা থেকে সরকারকে কর দিতে হবে, শেয়ারধারীদেরও লভ্যাংশ দিতে হবে। এতে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬, ২১: ৩২
সামগ্রিক অর্থনীতিতে ২০২৫ সালে মন্দাভাব থাকলেও ব্যাংকিং খাতে উল্টো চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ২০২৫ সালে মন্দাভাব থাকলেও ব্যাংকিং খাতে উল্টো চিত্র। বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিট মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশের ইতিহাসে ব্র্যাক ব্যাংক প্রথমবারের মতো কোনো দেশীয় ব্যাংক হিসেবে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকার নিট মুনাফার রেকর্ড গড়েছে।

একইভাবে সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফার ক্লাবে নাম লিখিয়েছে। অথচ সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্যে এখনো মন্দা কাটেনি। অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমেছে, কেউ কেউ লোকসানে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর এই উচ্চ মুনাফা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কীভাবে এত মুনাফা

আর্থিক কর্মকর্তাদের মতে, এই মুনাফা মূলত ব্যবসার প্রকৃত উন্নতির চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু বিশেষ সুবিধার ফল। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া নীতি ছাড় বড় ভূমিকা রেখেছে। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার বেশি থাকায় ব্যাংকগুলো সেখানে বিনিয়োগ করে নিশ্চিত আয় করেছে। প্রকৃতপক্ষে ঋণের আদায় সেভাবে বাড়েনি। বরং পুনঃতফসিলকরণ ও পুনর্গঠন সুবিধার কারণে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমেছে। এতে মুনাফা বেড়েছে।

কোন ম্যাজিকে কমেছে খেলাপি ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর শেষে তা ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়। খেলাপি ঋণ ৩৫ দশমিক ৭৩ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে খেলাপি ঋণ কমেছে। এস আলম, বেক্সিমকো বা নাসা গ্রুপের মতো বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারির প্রভাবে খেলাপি ঋণের যে পাহাড় তৈরি হয়েছিল, বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে তা আড়ালের চেষ্টা চলছে।

মুনাফায় শীর্ষে পাঁচ ব্যাংক

দেশীয় ব্যাংক হিসেবে মুনাফায় সর্বোচ্চ স্থান ব্র্যাক ব্যাংকের। ব্যাংকটি ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে ব্র্যাক ব্যাংকে মুনাফা ছিল ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৮১৯ কোটি টাকা বা ৫৭ শতাংশ।

সিটি ব্যাংক ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা রেকর্ড মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ১ হাজার ১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৩১০ কোটি টাকা বা প্রায় ৩১ শতাংশ।

পূবালী ব্যাংক প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে যোগ দিয়েছে। ব্যাংকটির মুনাফা ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তাদের মুনাফা ছিল ৭৮০ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে মুনাফা বেড়েছে ৩১১ কোটি টাকা বা ৪০ শতাংশ।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯৬৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১০৪ শতাংশ বা প্রায় ২ দশমিক ০৪ গুণ বেশি। প্রাইম ব্যাংকের মুনাফা ২০২৪ সালে ছিল ৭৩২ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৯১০ কোটি হয়েছে।

অন্যদের মুনাফা কত বাড়ল

এনসিসি ব্যাংক ৪৭৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা ২০২৪ সালের ২৩২ কোটি টাকার তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সাউথইস্ট ব্যাংকের মুনাফায় বিশাল প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪ সালে মুনাফা ছিল মাত্র ৪৩ কোটি টাকা, যা গত বছরে হয়েছে ৩৩৬। যমুনা ব্যাংকের মুনাফা ২৭৯ থেকে বেড়ে ৫৫৬ কোটি টাকা হয়েছে।

উত্তরা ব্যাংক ২০২৪ সালের ৪৭৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল, যা গত বছর হয়েছে ৫৯০ কোটি। ব্যাংক এশিয়া গত বছর ৪০৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছর ছিল ২৫০। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মুনাফা ৩১৭ থেকে বেড়ে ৩৪০ কোটি টাকা হয়েছে। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক গত বছর শেষে ৩৬৮ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১৯৯ কোটি টাকা বা প্রায় ১১৮ শতাংশ বেশি।

ইসলামী ব্যাংক বিশেষ ছাড় নিয়ে ১৩৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছর ছিল ১০৯ কোটি। ব্যাংকটি এই মুনাফা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে বিশেষ ছাড় নিয়ে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে এস আলম গ্রুপের লুটপাটে ব্যাংকটির ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর ফলে গত বছরের মতো এবারও শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ব্যাংকটি। এ কারণে ব্যাংকটিকে শেয়ারবাজারে দুর্বল মানের জেড শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। তবে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা কিছুটা কমেছে; ২০২৪ সালে ৮৩ কোটি টাকা থাকলেও গত বছর তা কমে ৮০ কোটি টাকা হয়েছে।

খতিয়ে দেখার তাগিদ

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা মুনাফা বাড়ার পেছনে নানা যুক্তি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। এছাড়া অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় ও বিল-বন্ডের সুদ আয় বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানান তারা।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, ব্যাংকগুলো বিভিন্নভাবে আয় করে। তাই মুনাফা বাড়তেই পারে। তবে খতিয়ে দেখা দরকার– প্রকৃত আয় ছাড়া তারা কাগুজে আয় দিয়ে মুনাফা বাড়িয়েছে কিনা। কাগুজে মুনাফা দেখালে তা থেকে সরকারকে কর দিতে হবে, শেয়ারধারীদেরও লভ্যাংশ দিতে হবে। এতে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এজন্য ব্যাংকগুলোর মুনাফার প্রকৃত হিসাবায়ন হওয়া জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত