leadT1ad

কাদের-সাদ্দামসহ পলাতক সাত নেতার বিচার শুরু, ‘উসকানি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে’ হত্যাযজ্ঞের অভিযোগ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৩৭
ওবায়দুল কাদের ও সাদ্দাম হোসেন। সংগৃহীত ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ও ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনসহ সাত পলাতক নেতার বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রমের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মামলার এজাহারভুক্ত সাতজন আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

অভিযোগ গঠনের আদেশের পর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলার মূল ভিত্তি এবং আসামিদের সুনির্দিষ্ট দায় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।

শুনানি শেষে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম জানান, এই হত্যাযজ্ঞের মূল সূত্রপাত হয়েছিল তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অভিযোগের মূল ভিত্তি হলো ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে উসকানিমূলক বক্তব্য। সেই বক্তব্যকে সমর্থন করে ওবায়দুল কাদের সারা দেশের ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে আন্দোলন দমনের নির্দেশনা দেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট’।

এই নির্দেশনার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা শুরু হয়, এমনকি নারী শিক্ষার্থী ও আহতদের ওপরও আক্রমণ চালানো হয় বলেও উল্লেখ করেন প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় পরদিন রংপুরে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ সারা দেশে ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হন।

প্রসিকিউশনের দাবি, একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে নির্বিচারে এই গণহত্যা চালানো হয়।

আরেক আসামি সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধেও আন্দোলনকারীদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য ও সহিংসতায় প্ররোচনা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রসিকিউটর তামিম বলেন, ‘আসামি আরাফাত প্রকাশ্যে বলেছিলেন, সরকারের কাছে যত গুলি আছে, পাঁচ বছর ধরে ছাত্রদের ওপর গুলি চালালেও শেষ হবে না। তিনি আন্দোলনকারীদের মাদকাসক্তসহ বিভিন্ন অবমাননাকর ভাষায় আক্রমণ করেন, যা অপরাধ সংঘটনে সহায়তা ও উসকানি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।’

প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না বরং একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন। প্রসিকিউটরের ভাষায়, ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব নির্দেশনার ভিত্তিতে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করেছেন।’

যেহেতু সাতজন আসামিই বর্তমানে পলাতক, তাই প্রথা অনুযায়ী কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাঠ করে শোনানো সম্ভব হয়নি। তবে প্রসিকিউশন জানিয়েছে, এসব অভিযোগ প্রমাণের জন্য তাদের হাতে যথেষ্ট দালিলিক ও ডিজিটাল প্রমাণ রয়েছে। গাজী এম এইচ তামিম বলেন, ‘ডকুমেন্টারি এভিডেন্স, ভিডিও ও অডিও প্রমাণ এবং মৌখিক সাক্ষ্য আমাদের হাতে রয়েছে, যা নির্ধারিত দিনে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে।’ আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হবে।

বিচার শুরুর আদেশ দেওয়ার আগে গত ১৮ জানুয়ারি প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের (রাষ্ট্রনিযুক্ত) দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই শুনানিতে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামিম ট্রাইব্যুনালের সামনে আসামিদের ইনডিভিজুয়াল ক্রিমিনাল রেস্পন্সিবিলিটি এবং ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি দায়ের আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

অন্যদিকে, পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান শুনানিতে অংশ নিয়ে দাবি করেন, তাদের মক্কেলদের সঙ্গে অভিযোগগুলোর প্রত্যক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যথাযথ তথ্য–প্রমাণের অভাবের যুক্তি দেখিয়ে তারা আসামিদের অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছিলেন। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা শেষে আজ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালেন।

আইনি প্রক্রিয়ার ধাপগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন। এরপর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং সবশেষ গত ৮ জানুয়ারি আসামিদের আত্মসমর্পণের সময়সীমা পার হওয়ার পর তাদের ‘পলাতক’ ঘোষণা করা হয়। পলাতক হিসেবেই (ট্রায়াল ইন অ্যাবসেনশিয়া) তাদের বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় আজ বিচারিক কার্যক্রমের মূল পর্ব শুরু হলো।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত